গল্প
মাঝরাত। ঘুমন্ত স্ত্রীর মুখের দিকে বেশ কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার পর উঠে বসে রঞ্জুু। এলোমেলো চুল। গলায় মাংসল ভাঁজ। মুখে অনেক তিল। চোখের নিচে গাঢ় কালি পড়েছে। কী জোরে নাক ডেকে ঘুমুচ্ছে! রঞ্জুর এসব সহ্য হয়ে গেছে। এ রকম শব্দের ভিতরই নিশ্চিন্তে ঘুমুতে পারে। আজ অবশ্য ঘুম আসছে না। মাঝে মাঝে এ রকম হয়। আর ঘুম না এলেই নীলা চলে আসে ভাবনায়।
তার মতো নীলাও কি মাঝেমধ্যে সাঁইত্রিশ বছর আগের কথা ভাবে এরকম?
জাগজুর গ্রাম। গ্রামের পাশে ডাকাতিয়া নদী। নদীর ওপর বাঁশের সাঁকো। একদিন কলেজ ছুটির পর রঞ্জুর পিছু নেয় নীলা। সাঁকো পার হওয়ার সময় থমকে দাঁড়ায়। নীলাকে আগাগোড়া দেখে। নীলা লজ্জা পায়। ঝোপের আড়ালে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। চারদিক সুনসান। কোথাও কেউ নেই। রঞ্জু নিচু গলায় বলে, নীলা তুঁই আর হিছন হিছন আইতাছো কিল্লাই? তোঁর গ্রাম তো নদীর এপাড়।
নীলা কিছু বলে না। গত এক বছর কনকাপৈত কলেজে পড়ছে তারা। সুন্দরী নীলার পেছনে কলেজের অনেক ছেলেই ঘুরঘুর করে। তার মধ্যে রঞ্জুর দু-একজন বন্ধুও রয়েছে। নীলাকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন অনেকের। রঞ্জুর অবশ্য মেয়েদের নিয়ে ভাবার সময় নেই। রাতদিন পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকে। ভালো রেজাল্ট করে বিসিএস দেবে। নিজের পায়ে দাঁড়াবে। নীলা কিছু বলছে না দেখে রঞ্জু আবারও বলল
- কী কতা, কও? কারেন্টের খাম্বার মতো খাড়াই থাইকলে অইব?
- আঁই তোঁরে ভালোবাসি। নীলার শরীর কাঁপে, স্পষ্ট বুঝতে পারে রঞ্জুু। রঞ্জু অবাক হয়। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর শব্দ করে হাসে। তার হাসি দেখে নীলা ভয় পায়। রঞ্জু হাসি থামিয়ে বলে
-দুইন্নাইতে এত পোলা থুই আঁরেনে তোঁর মনে ধরছে? হিছা মার আঁর কোয়ালে, হিছা মার। মাইনষ্যের বাইত জাগির মাস্টার থাই লেহাপড়া করি। বাপ নাই। ঘরে বিধবা মা, মেম্বার বাইত ঝিয়ের কাজ করে।
-সব সময় কি দিন এমন থাইকব? দিন বদলাইব না? নীলা মাথা উঁচু করে।
- ঠিক আছে, তুঁই যাও।
নীলা চলে যায়। সে নীলার চলে যাওয়া দেখে। সে নদী পার হয়ে খেতের আঁকাবাঁকা পথ ধরে হাঁটে। তার গ্রাম একদিকে আর হাঁটে আরেক দিকে।
সে রাতে এক ফোটাও ঘুমুতে পারেনি রঞ্জুু। তার মতো হতদরিদ্র কাউকে যেকোনো মেয়ে ভালোবাসতে পারে, এটা কিছুতেই তার মাথায় আসছে না। এও কি সম্ভব? পুরো ব্যাপারটা কল্পনা মনে হয়। গভীর রাতে কাছারি ঘর ছেড়ে বের হয়। বাইরে চমৎকার জোছনা। ফুরফুরে বাতাস বইছে। গ্রামের এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত হাঁটে। শেষ রাতের দিকে যখন ঘুমুতে যায়, তখন ফজরের আজান পড়ে।
পরদিন কলেজে গিয়ে চুপচাপ ক্লাস করে। নীলাও নির্বিকার। একবারও তার দিকে তাকায়নি। কিন্তু কলেজ ছুটির পর আজও নীলা তার পিছু নেয়। সাঁকোর কাছাকাছি এসে থমকে দাঁড়ায় দুজন। রঞ্জু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আঁই অনেক ভাবছি। কোনাই তোন্ডা আর কোনাই আন্ডা। তুঁই কফিল মোড়লের মাইয়া।
- তোঁর সাহস এত কম কিল্লাই? মনে অয় বুকের মইধ্যে ইগগা লোমও নাই। নীলা মুখ টিপে হাসে।
- তুঁই তো আঁর বেক হিস্ট্রি জানো। রঞ্জুর গলায় একরাশ হতাশা।
-জানি। আইচ্ছা আইজ যাই। মনদি লেহাপড়া কর। ভাইগ্যে যা আছে তাই অইব।
নীলা চলে যায়। যতক্ষণ নীলাকে দেখা যায়, চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে দেখে রঞ্জুু। নদী পার হয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনুভব করে সেও নীলাকে ভালোবেসে ফেলেছে।
তারপর থেকে প্রায় রোজই কলেজ ছুটির পর সাঁকোর কাছে গল্প করে দুজন। স্বপ্নের কথা প্রায় ভুলে যায় রঞ্জুু। পড়ালেখায় মন নেই বললেই চলে। রাতদিন নীলাকে ভাবে। একপর্যায়ে মানুষের চোখে ধরা পড়ে যায়। একান-ওকান করে খবর ছড়ায় পুরো গ্রাম, এলাকায়।
এদিকে দেখতে দেখতে ফাইনাল পরীক্ষা এসে গেল। দুজনের কারও প্রস্তুতি ভালো না। পরীক্ষা হলো। রেজাল্ট হলো। রঞ্জু মোটামুটি ফল করলেও নীলা করল ফেল। রেজাল্টের দিন নীলার সে কী কান্না!
তারও কিছুদিন পর নীলার বিয়ে ঠিক হয়। রঞ্জুু দিশাহারা। কী করবে? তার পক্ষে নীলাকে ছেড়ে থাকা অসম্ভব। একবার সিদ্ধান্ত নেয় নীলার বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু কফিল মোড়ল যা রাগী আর দেমাগি লোক, তার সাথে মেয়ের বিয়ে দিতে কিছুতেই রাজি হবেন না। তার তো কিছুই নেই। এক টুকরো ভিটে, তার মধ্যে ছোট্ট একটা কুঁড়েঘর। সারা দিন মেম্বার বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে সে ঘরে ঘুমায় বিধবা মা। বাতের ব্যথায় ঠিকমতো ঘুমুতে পারে না। টাকা নেই যে মায়ের ভালো চিকিৎসা করাবে। এসব ভেবেই নীলাকে নিয়ে পালাতে সাহস পায় না।
নীলা বিয়ের রাতে পালিয়ে রঞ্জুর কাছারি ঘরে ঢুকে হাউমাউ করে কাঁদে। শরীরে হলুদের গন্ধ। মাথায় উশকোখুশকো চুল। দুই পায়ে কাদা। গা ভর্তি গহনা। রঞ্জুু সান্ত্বনা দেয়। কিন্তু নীলার কান্না থামে না। সে একনাগাড়ে কেঁদে চলে। তার কান্না শুনে এগিয়ে আসে গৃহস্থ পরিবার। সব শুনে গৃহকর্তা বললেন,
-সব কতাই তো বুঝলাম। কফিল মোড়ল লোক ভালো না। তাও, দুজন দুজনকে যেহেতু ভালোবাসো, সেহেতু একটা রিস্ক নিলাম।
রাতেই হুজুর ডেকে বিয়ে পড়ানো হয়। গৃহকর্ত্রী নীলাকে নিজের ঘরে নিয়ে যান। রঞ্জুর মা খবর পেয়ে ছুটে আসে। কিন্তু নির্বাক। কারও সাথে কোনো কথা বলে না। পরদিন সারা দিন বৃষ্টির পর শেষ বিকেলে পশ্চিম আকাশে বিশাল সূর্য ওঠে। গৃহকর্তার বছরঠিকা কামলা কুদ্দুস দৌড়ে বাড়িতে ঢোকে। উঠোনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে, রঞ্জুু ভাইছা তাড়াতাড়ি হলাই যান। কফিল মোড়ল পুলিশ লই আইতাছে।
রঞ্জু দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এ অবস্থায় তার কী করা উচিত? সে বিভ্রান্তের মতো পায়চারি করে। তার কিছুক্ষণ পর কফিল মোড়ল সত্যিই পুলিশ নিয়ে উঠোনে ঢুকে চিৎকার চেঁচামেচি হইচই করতে থাকেন। প্রচুর লোকজন জড়ো হয়। নীলা আছড়ি-পিছড়ি কাঁদে। একপর্যায়ে কফিল মোড়ল নীলাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যান। কারও কিছু করার থাকে না। ধীরে ধীরে লোকজনের ভিড় কমতে থাকে। রঞ্জু শূন্য দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে। তার বিধবা মা কপাল চাপড়ে আহাজারি করে ওঠে
-ইচ্ছা কইরা সাপের লেইংজায় ঠ্যাং দিছস। এহন বুঝবি বিষের জ্বালা কারে কয়!
নীলার চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়ে রঞ্জু। নাওয়া-খাওয়া প্রায় ছেড়েই দেয়। মাত্র কয়েক দিনেই শরীর শুকিয়ে কাঠ। চোখের নিচে গাঢ় কালি। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। সারা দিন কাছারি ঘরে শুয়ে বসে থাকে। এদিকে কুদ্দুস প্রতিদিন একটা না একটা দুঃসংবাদ নিয়ে আসে। নীলা বিষ খেয়েছে, জঙ্গলে ফাঁস দিতে গিয়ে ধরা পড়েছে। গভীর রাতে পালাতে গিয়েও ধরা পড়েছে। এসব খবর শুনে তার মাথা ঠিক থাকে না।
তারও তিন মাস পর ডাকপিয়ন এসে একটা রেজিস্ট্রি চিঠি দিয়ে যায়। সে চিঠি পড়ে হাসে। বুক ভাঙা বেদনার হাসি। নীলা তাকে ডিভোর্স দিয়েছে। গভীর রাতে ঘর ছেড়ে বের হয়। পাঁচ মাইল পথ পায়ে হেঁটে হাসানপুর স্টেশনে আসে। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। প্রচণ্ড বৃষ্টি। বিকট শব্দে বাজ পড়ে। ভোর রাতে একটা ট্রেনে চেপে ঢাকায় আসে। কমলাপুর স্টেশনে নেমে একজন লোকের সাথে পরিচয় হয়। লোকটা তাকে কলাবাগান লেক সার্কাস গলিতে একটা মেস ঠিক করে দেয়।
আলতাফ টিনশেড মেস। পাশে একতলা বিল্ডিং। বিল্ডিংয়ের ছাদের ওপর বিশাল আম গাছ ঝুঁকে আছে। রোজ বিকেলে সে ছাদের রেলিংয়ে বসে একটা মেয়ে। দীঘল কালো চুল। নীল পদ্মের শীতল মায়াবী চোখ। অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে সন্ধ্যের ঠিক আগ মুহূর্তে চলে যায়। মেসের জানালায় দাঁড়িয়ে মাঝেমধ্যে মেয়েটাকে দেখে রঞ্জুু। আবার মাঝেমধ্যে মেয়েটিকে নিয়ে ভাবেও। কিছুক্ষণ ভাবার পর মনটা বিষিয়ে ওঠে। নীলার কথা মনে পড়ে। নীলার বাবা তাকে পছন্দের পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন। তার একটা মেয়েও হয়েছে।
বছরখানিক পর একদিন ভোরবেলা মেসে একজন বয়স্ক লোক এসে রঞ্জুর খোঁজ করেন। রঞ্জু ঘুম থেকে উঠে লোকটার সামনে দাঁড়ায়। লোকটা রঞ্জুর মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখেন। রঞ্জুু দুই চোখ কপালে তুলে বলে, কে আফনে?
- আমি জামশেদ খান। পাশের একতলা বিল্ডিং আমার। সুকন্যার বিয়ে ঠিক হয়েছে। কিন্তু সে বিয়ে করবে না।
- কোন সুকন্যা? রঞ্জুু একটা চেয়ার টেনে বসতে দেয় ভদ্রলোককে।
-যে রোজ বিকেলে ঐ একতলা বিল্ডিংয়ের ছাদে উঠে রেলিংয়ের ওপর বসে থাকে।
- ও আইচ্ছা। কিন্তু হে বিয়া করব না কিল্লাই?
-তার সাফ কথা, সে বিয়ে করলে তোমাকে করবে। এখন বাবা বলত, তুমি কী কর? তোমার বৃত্তান্ত...
জামশেদ খান পাঞ্জাবির পকেট থেকে তসবিহ বের করে দোয়া পড়েন।
জামশেদ খানের কথা শুনে রঞ্জু আকাশ থেকে পড়ে। সে ভ্রু-কুঁচকে বলে- সর্বনাশ! হের লগে তো আঁর হরিচয়ও নাই। আর অ্যাঁই মাস্টার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ি। তিনটা টিউশনি করি নিজের খরচ চালাই।
- আমরা তাকে অনেক বুঝিয়েছি। কিন্তু সে তার সিদ্ধান্তে অটল। নাছোড়বান্দা। বড় আদরের মেয়ে আমার!
- অ্যাঁর সম্পর্কে না জানি এ রকম সিদ্ধান্ত নিছে। বেক কিছু জানলে হয়তো...
-যাই হোক, সন্ধ্যার পর আমার গরিবখানায় একবার ঢুঁ মেরে যেও। তোমার চাচি তোমাকে দেখতে চায়।
জামশেদ খান দোয়া দরুদ পড়তে পড়তে চলে যান। রুমমেটরা ছুটে আসে।
একজন বলে- তোমার তো রাজভাগ্য ভাই।
সন্ধের পর রঞ্জু ভদ্রতার খাতিরেই ওই বাসায় গিয়ে দেখে সুকন্যা সেজেগুজে বসে আছে। তাকে দেখে উঠে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ পর ধপ করে বসে। সে ইতস্তত বোধ করে। সুকন্যা নিচু গলায় বলে, আমি সব জানি।
- কী জানেন? সেও চমকে উঠে প্রশ্ন করে।
- নীলা। আপনের নীলা। এখন নীলাকে ভুলে যান। সুকন্যা মুচকি হাসে।
- এতকিছু জানলেন ক্যামনে?
- জানার ইচ্ছে থাকলে জানা যায়। আজ রাতের ট্রেনে আপনার মা ঢাকা আসছেন। তৈরি হন। বলেই সুকন্যা চলে যায়।
সবকিছু স্বপ্নের মতো মনে হয়। কেউ একজন চা-নাশতা দিয়ে যায়। পরদিনই বিয়ে হয় রঞ্জু-সুকন্যার।
সাঁইত্রিশ বছর পর রাত জেগে এসব ভেবে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। রঞ্জু খাট থেকে নামতে যাবে, এমন সময় সুকন্যার ঘুম ভেঙে যায়। সুকন্যা আড়মোড়া ভেঙে বিছানায় উঠে বসে। একবার দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকায়, আরেকবার রঞ্জুর দিকে। রঞ্জু মুচকি হাসে। সুকন্যা পানের বাটা নিয়ে বসে বলল, তোমার ছেলেমেয়ে দুটোত ফোন করা ছেড়েই দিয়েছে। আমেরিকায় কী এমন ব্যস্ত, তারাই জানে।
-হুঁ। রঞ্জুু দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
- যাও না, কয়েক মাস ওদের কাছে থেকে এসো।
- না। বিদেশ আমার ভালো লাগে না
- তাহলে গ্রামে গিয়ে মাসখানেক থেকে আসো।
ভাগ্য ভালো হলে তোমার নীলার সাথে দেখাও হয়ে যেতে পারে।
রঞ্জু শব্দ করে হাসে। সুকন্যা সুপারি কাটতে কাটতে রঞ্জুকেও কটাক্ষে কাটে। আড়চোখে চেয়ে বলে- খুব মনে পড়ে, না? আসলে প্রথম প্রেমতো!
রঞ্জু ভাবে সুকন্যাও তো তাকে পাগলের মতো ভালোবাসে। তার সামান্য কিছু হলে অস্থির হয়ে পড়ে। অথচ নীলাকে আজও ভুলতে পারে না সে। হয়তো সুকন্যার কথাই ঠিক- প্রথম প্রেম তো!