বাঙালি চেতনায় উদ্ভাসিত এক আলোকবর্তিকার নাম- জহির রায়হান। ছাত্রাবস্থায় তিনি অগ্রজ শহীদুল্লাহ কায়সারের হাত ধরে বাম রাজনীতির সংস্পর্শে আসেন। তিনি ১৯৫৩-৫৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন এবং কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম নেতা মণি সিংহের দেওয়া নাম ‘রায়হান’ গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ‘জহির রায়হান’ নামেই সমধিক পরিচিত হয়ে ওঠেন। তাঁর পারিবারিক নাম মো. জহির উল্লাহ।
গবেষকগণ জহির রায়হানকে বাংলাদেশের সাহিত্য ও চলচ্চিত্র জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র বলে থাকেন। তবে তিনি ভাষা সংগ্রামেরও এক অনিবার্য প্রতীক। তাঁর সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের প্রতিটি স্তরে প্রতিফলিত হয়েছে শোষক ও শোষিতের দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার নগ্নতা এবং মানুষের মুক্তির আকাক্সক্ষা। যদিও তিনি কোনো তাত্ত্বিক জটিলতায় আবদ্ধ ছিলেন না। তবে তাঁর ক্ষুরধার কলম ও গতিশীল ক্যামেরা একই সঙ্গে ইতিহাসের সাক্ষ্য এবং প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল।
জহির রায়হান এমন একসময়ে জন্মগ্রহণ করেন- যখন তাঁর জন্মস্থান ঔপনিবেশিক শাসন, দেশভাগ ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে আবদ্ধ ছিল। পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অধিকার যখন পদদলিত, তখন তাঁর শিল্পচেতনা স্বাভাবিকভাবেই প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। তিনি ছিলেন ভাষা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। তাঁর এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাঁর সৃষ্টিকে দিয়েছে বাস্তবতার কঠিন স্পর্শ। আর এখানেই তাঁর সৃষ্টি হয়ে ওঠে এক অনন্য শিল্পদর্শনের শক্তি।
আমরা যদি তাঁর ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাস রচনার প্রেক্ষাপট ভালোভাবে জানতে চেষ্টা করি, তবে তাঁকে একটু পেছন ফিরে দেখতে হবে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি একজন সাহসী ও সক্রিয় কর্মী হিসেবে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক গঠিত সংগ্রাম কমিটির দায়িত্ব পালন করেন।
২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরে মিছিল, মিটিং, সমাবেশ প্রভৃতি নিষিদ্ধ করে তৎকালীন পাকিস্তানি সরকার ১৪৪ ধারা জারি করলে ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভেঙে খণ্ড-খণ্ড মিছিল বের হলে প্রথম গ্রেপ্তার হওয়া ১০ জনের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। ১৯৫৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পালনের আন্দোলনের সময়েও তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। অতএব বলা যায়, তিনি ভাষা আন্দোলন ও এর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের একজন নির্ভীক সৈনিক। আর এমন ঐতিহাসিক বাস্তবতার আগুন সাক্ষী হয়ে ১৯৬৮ সালে লিখলেন এক অমর আখ্যান ‘আরেক ফাল্গুন’।
এ উপন্যাসে তিনি দেখিয়েছেন জাতিসত্তার আত্মপ্রকাশ ও ভাষা আন্দোলনের চেতনা। অর্থাৎ ভাষা আন্দোলন কেবল সাংস্কৃতিক সংগ্রাম নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও নিপীড়িত জনগণের মধ্যকার দ্বন্দ্বের প্রকাশ। এখানে রাষ্ট্র শাসক শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে, আর ভাষার জন্য লড়াইরত তরুণরা প্রতিনিধিত্ব করে নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর। ব্যক্তিগত প্রেম ও আত্মত্যাগ এখানে শ্রেণিসংগ্রামের অংশ হয়ে ওঠে।
উপন্যাসটির প্রথম পৃষ্ঠায় লেখক ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের সময়ে লালবাগ কেল্লায় অবস্থানরত নিরীহ সৈনিকদের ব্রিটিশ মেরিন সেনারা গভীর রাতে অতর্কিত আক্রমণ করে নৃশংসভাবে হত্যা এবং বন্দি সৈনিকদের আন্ডারগোরা (ভিক্টোরিয়া পার্ক) ময়দানের গাছে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেওয়ার দৃশ্য তুলে ধরে। পরক্ষণেই তিনি লিখলেন- “সকালে কুয়াশায় ঢাকা পড়েছিল পুরো আকাশটা। আকাশের অনেক নিচু দিয়ে মন্থরগতিতে ভেসে চলেছিল এক টুকরো মেঘ। উত্তর থেকে দক্ষিণ- রং তার অনেকটা জমাট কুয়াশার মতো দেখতে। ভিক্টোরিয়া পার্কের পাশ দিয়ে ঠিক সেই মেঘের মতো একটি ছেলেকে হেঁটে যেতে দেখা গেল নবাবপুরের দিকে। দক্ষিণ থেকে উত্তরে। পরনে তার সদ্য ধোয়ান সাদা শার্ট, সাদা প্যান্ট, পা-জোড়া খালি। জুতো নেই।”
মূলত এই ছেলেটিই ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মুনিম। মুনিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা। চরিত্রটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে আর বুঝতে অসুবিধা হবে না যে, মুনিম চরিত্রের মধ্যে লেখক নিজেই নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন। আমরা বলতেই পারি- উপন্যাসের সূচনালগ্নে সিপাহি বিদ্রোহের স্মৃতিময়তা উপন্যাসটির অসাধারণ তাৎপর্য বহন করে। তা ছাড়া ‘মেঘের গতি উত্তর থেকে দক্ষিণে আর মুনিমের গতি দক্ষিণ থেকে উত্তরে’ এই বর্ণনার সংকেতময় শৈল্পিকতায় যে কোনো পাঠক দেশাত্মবোধে উজ্জীবিত হয়ে উঠবে। তবে উপন্যাসটির শেষ বাক্যে লেখক যখন লিখলেন- ‘আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হব’ তখন তা হয়ে ওঠে সংগ্রামের এক রক্তিম স্লোগান কিংবা মুক্তির মন্ত্রে ঝলসে ওঠা এক বৈশাখী নিশান। মূলত এই বাক্যটিই ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাসের প্রধান বীর্যবয়ান। এই কণ্ঠস্বরের ভিতরেই ধ্বনিত হয়েছে সম্মিলিত কণ্ঠধ্বনি। নতুন বসন্তের বার্তা।
উপন্যাসটি ১৯৫৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষাশহীদ দিবস পালনকে কেন্দ্র করে রচিত হলেও বিভিন্নজনের স্মৃতিতে শ্রদ্ধাভরে উঠে এসেছে ১৯৫২ সালের ভাষা সংগ্রামের কথা। শহীদ বরকতসহ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিলে অংশগ্রহণকারী দুঃসাহসী ছাত্র-জনতার কথা।
‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাসটি ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রচিত প্রথম উপন্যাস। ফলে এর ঐতিহাসিক গুরুত্বও অনেক।
উপন্যাসটির মধ্যে আমরা যেমন- মুনিম, রওশন, সালমা, কবি রসুল, আসাদের মতো বেশ কয়েকজন ভাষাসংগ্রামীর স্বদেশ প্রেমের অনন্য দৃষ্টান্ত দেখতে পাই, তেমনি গোয়েন্দা অফিসার মাহমুদ, কবি বজলে, পুলিশের সোর্স সবুরসহ বেশ কিছু সুবিধাবাদী চরিত্রেরও দেখা পাই।
উপন্যাসটির নামকরণের দিকে দৃষ্টি দিলে আমরা জহির রায়হানের বলিষ্ঠ চিন্তাশক্তি ও প্রাজ্ঞতার পরিচয় পাই।
‘ফাল্গুন’ মূলত বাংলা ষড়ঋতুর একটি মাসের নাম। কিন্তু উপন্যাসটিতে ‘ফাল্গুন’ বাংলা সংস্কৃতির নবজাগরণের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ জহির রায়হানের ‘ফাল্গুন’ কেবল প্রকৃতির ঋতু নয়, বরং এটি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে বাঙালি জাতির রক্তাক্ত ইতিহাসের প্রতীক। ফাল্গুনেই মাতৃভাষার দাবিতে বাংলার রাজপথ উত্তাল হয়ে উঠেছিল। অতঃপর সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও অনেকের রক্তের বিনিময়ে আমাদের মাতৃভাষা মর্যাদা ফিরে পেয়েছিল। সেই অর্থে ‘ফাল্গুন’ এখানে রক্ত, আত্মত্যাগ ও সংগ্রাম।
‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো ‘আরেক’। অর্থাৎ আরেকটি গণজাগরণ, আরেকটি বিপ্লব।
সেই বিপ্লবের মধ্যেই বাঙালি ফিরে পাবে তার রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি। জহির রায়হান তাঁর ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাসটিতে অসম্পূর্ণ মুক্তির বোধকে সামনে আনেন। আন্দোলনের রক্তক্ষয়ী অধ্যায় শেষ হলেও শোষণ, দমন ও বৈষম্য রয়ে যায়। অর্থাৎ একটি আন্দোলন শেষ মানেই ইতিহাসের সমাপ্তি নয়। বরং প্রকৃত মুক্তির জন্য ধারাবাহিক সংগ্রাম অপরিহার্য।
জহির রায়হান যেহেতু বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সেক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি- তিনি এ উপন্যাসটিতে মার্কসবাদী শ্রেণিচেতনার সফল প্রয়োগ করেছেন। এখানে রাষ্ট্রযন্ত্র, শাসকগোষ্ঠী এবং পেটি বুর্জোয়া, বুর্জোয়া ক্ষমতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ ফুটে উঠেছে। জহির রায়হান শোষিত মানুষের পক্ষ অবলম্বন করে দেখিয়েছেন যে, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন মূলত শ্রেণিস্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার। এই দৃষ্টিভঙ্গি উপন্যাসটিকে কেবল ঐতিহাসিক নয়, রাজনৈতিকভাবে প্রগতিশীল করে তোলে।
পরিশেষে বলা যায়- জহির রায়হানের ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাসটি কেবল ভাষা আন্দোলনভিত্তিক কোনো গল্প নয়, বরং এটি অসম্পূর্ণ বিপ্লবের বোধ, একটি জাতির আত্মপরিচয় সন্ধানের দলিল এবং শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়। অর্থাৎ যতদিন শোষণ ও বৈষম্য থাকবে, ততদিন নতুন নতুন ‘ফাল্গুন’-এর প্রয়োজন হবে।