সকাল থেকেই উত্তর কলকাতার আকাশটা কেমন ঘোলাটে হয়ে আছে। বাতাসের ভারি গুমোট ভাবটা কাচের জানালা ভেদ করে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ছে। অনির্বাণ তার টেবিলের ওপর ছড়ানো স্থাপত্যের নকশাগুলো গুছিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল। এই নীল রঙের নকশাগুলো আসলে আধুনিক কাচের টাওয়ারের, যা এই শহরের পুরোনো আকাশটাকে গিলে খেতে চায়। অথচ সে নিজে বসে আছে এক শ্যাওলা ধরা পুরোনো বাড়িতে, যার জানালার পাল্লাগুলো খুললে এখনো নোনা ধরা আভিজাত্যের এক ধরনের দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়। অনির্বাণের জীবনটাও এখন এই পুরোনো বাড়ির ইটের মতোই খসে পড়ছে। মাসের মাঝামাঝি পেরোতেই ব্যাংক ব্যালেন্সের দিকে তাকালে, তার ভিতরে এক ধরনের হিমশীতল অস্বস্তি শুরু হয়। প্রমোটাররা প্রায়ই এসে হানা দেয়, তারা চায় এই ধুলোমাখা স্মৃতি মুছে সেখানে একটা ঝকঝকে কাচের আকাশচুম্বী দালান তুলতে। অনির্বাণ জানে, একদিন তাকেও এই শেকড় ছেড়ে হার মানতে হবে।
দরজায় কড়া নাড়ার শব্দটা খুব মৃদু ছিল। অনির্বাণ দরজা খুলে দেখল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির চোখে এক আকাশ ক্লান্তি। পরনে সাধারণ একটা সুতির কামিজ, হাতে একটা নীল রঙের প্লাস্টিকের ফাইল। মেয়েটি কিছুক্ষণ অনির্বাণের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, আমি তনিমা। বাংলাদেশ থেকে আসছি। আব্বা এই বাড়ির ঠিকানা দিয়েছিলেন।
অনির্বাণ দরজাটা একটু বেশি করে খুলে দিল। ঠাকুরদা অশ্বিনী দত্ত মারা গেছেন মাস তিনেক হলো, অথচ এই খবরটা ওপারের মানুষগুলোর কাছে পৌঁছাতে এক জীবন সময় লেগে গেল। তনিমা ইতস্তত করে পা রাখল ঘরের ভিতর। মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা ম্যাপ আর ড্রয়িং ইনস্ট্রুমেন্টগুলো দেখে সে একটা ম্লান হাসি হাসল। অনির্বাণ গ্লাসে করে জল এনে টেবিলের ওপর রাখল। তনিমা জলের গ্লাসটার দিকে তাকিয়ে রইল, কাচের গায়ে আঙুলের ছাপ লেগে আছে। সে জলটা এক নিঃশ্বাসে খেয়ে নিল। অনির্বাণ খেয়াল করল, তনিমার ফর্সা হাতের আঙুলগুলো একটু কাঁপছে। এক অতল নিস্তব্ধতা গ্রাস করল পুরো ঘরটাকে। শুধু বাইরে একটা জরাজীর্ণ ট্যাক্সির হর্ন আর জানালার ধারে বসে থাকা তৃষ্ণার্ত কাকের ডাক শোনা যাচ্ছিল।
তনিমা বসল জানলার ধারের সেই পুরোনো চেয়ারটায়। সে ব্যাগ থেকে একটা রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছল, তারপর খুব নিচু স্বরে বলল, বাগবাজারের গলিগুলো বড় গোলমেলে, তবে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল আমি কোনো অচেনা জায়গায় আসিনি। আমাদের ওখানের পুরোনো গলিগুলো ঠিক এইরকমই, তফাত শুধু ধুলোর রঙে আর বাতাসের ঘ্রাণে। অনির্বাণ মুগ্ধ হয়ে মেয়েটির কথা বলা দেখছিল, তার কণ্ঠস্বরে এক ধরনের বিষণ্ন মাধুর্য আছে, যা এই মৃতপ্রায় ঘরটাকে হঠাৎ করেই প্রাণবন্ত করে তুলেছে। চা খেতে খেতে তনিমা বলল, আব্বার শরীরটা ভালো না অনির্বাণ বাবু। ডাক্তার দেখাতেই এদিকে আসা। হাসপাতালের সেই বীভৎস সাদা দেওয়াল আর ওষুধের গন্ধের মাঝে বসে যখন তিনি হাঁপিয়ে ওঠেন, তখন শুধু পুরোনো মানুষের কথা বলেন। অশ্বিনী দাদাকে যদি একবার খবর দিতে পারতি, এই কথাটাই তাঁর জপমালা।
অনির্বাণ আলমারি থেকে ঠাকুরদার একটা চশমা আর পুরনো ফ্রেমে বাঁধানো ছবি বের করল। ঠাকুরদা নেই শুনে তনিমার মুখে কোনো আকস্মিক বিস্ময় ফুটে উঠল না, যেন এই অমোঘ সত্যটা শোনার জন্য সে অনেকদিন ধরেই নিজেকে পাথর করে রেখেছে। সে জানালার দিকে তাকিয়ে আনমনে বলল, কাঁটাতারের ওপারে আমাদের বাড়িটা এখনো ঠিক তেমনই আছে জানেন? বৃষ্টির দিনে টিনের চালে শব্দ হলে আব্বা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতেন, কলকাতায় অশ্বিনীদের ছাদেও কি এখন জল জমেছে রে মা? ওপারের জল এপারে এসে গড়াতে পারে না, অথচ মেঘগুলো তো একই। অনির্বাণ দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না। তার বুকের ভিতর একটা সূক্ষ্ম চিনচিনে ব্যথা অনুভব করল সে। সে জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে বলল, আমাদের এই বাড়িটাও আর থাকবে না তনিমা। প্রমোটাররা এসেছিল গত মাসে, আগামীতে এখানে বড় কাচের বিল্ডিং হবে। বাইরে থেকে সব চকচক করবে ঠিকই, কিন্তু ভিতরের মানুষগুলোকে আর বাইরে থেকে চেনা যাবে না। মানুষ এখন আর পুরোনো ইট-কাঠের গন্ধ সইতে পারে না, সবাই চায় এক ধরনের স্বচ্ছ কাচের জীবন, যেখানে ব্যক্তিগত দুঃখগুলো বড় বেশি ব্রাত্য।
তনিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে ব্যাগ থেকে একটা ছেঁড়া ডায়েরি আর কয়েকটা কুঁচকানো টাকার নোট বের করে টেবিলে রাখল। খুব সন্তর্পণে হিসাব মেলাচ্ছিল বোধহয় সে। তারপর ম্লান হেসে বলল, মাসের যা ইনকাম, তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি খরচ। আব্বার ওষুধের দোকানের বিলটা প্রতিদিন বাড়ছে, বাজারে গেলে এখন ব্যাগ ভর্তি করে সবজি আনাও দায় হয়ে পড়েছে। মনে হয় জীবনটা বুঝি ওই জ্যামে আটকে পড়া রিকশাটার মতো থমকে আছে, যেখান থেকে নামার কোনো উপায় নেই, আবার গন্তব্যে পৌঁছানোর ঠিকানাও ঝাপসা। অনির্বাণ আলতো করে তনিমার আঙুলের কাছে রাখা চায়ের কাপটা সরিয়ে নিল। তার হাতটা যখন তনিমার হাতের খুব কাছে ছিল, তখন সে এক ধরনের অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করল। অভাবের গল্প বলতে বলতেও তারা যেন একে অপরের অস্তিত্বের খুব কাছে চলে আসছিল। এই মধ্যবিত্ত লড়াইয়ের যে একই ভাষা, তা তাদের দুজনের চোখেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
বিকেলের মরা আলোটা এখন অনির্বাণের ঘরের মেঝেতে লম্বা ছায়া ফেলেছে। বাইরে গলির মোড়ে রিকশার ঘণ্টি আর ফেরিওয়ালার ডাক শোনা যাচ্ছে। তনিমা ফাইল থেকে একটা ভাঁজ করা পুরোনো হলদেটে কাগজ বের করল। অনির্বাণের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, এটা আব্বার লেখা চিঠি, দেখুন তো অশ্বিনী দাদুর চশমা দিয়ে এটা পড়া যায় কি না। অনির্বাণ চিঠিটা হাতে নিল। কাঁপা কাঁপা হাতের লেখায় সেই বহু বছর আগের ঢাকার সূত্রাপুর আর আরমানিটোলার কিছু গলির বর্ণনা, যেখানে কোনো এক হারানো বিকেলের আড্ডার কথা পরম মমতায় লেখা আছে। অনির্বাণ চশমাটা চোখের সামনে ধরল। সে ফিসফিস করে বলল, এই যে এখানে লেখা আছে বুড়িগঙ্গার পাড়ের সেই বিশেষ চা আর বিস্কুটের কথা। অথচ দেখুন তনিমা, এখন আমাদের এখানেও গঙ্গার ধারের সেই ছোট দোকানগুলো সব উচ্ছেদ করা হচ্ছে। আমরা চেনা শহরগুলো কেমন অচেনা করে ফেলছি নিজেদের হাতেই।
তনিমা একটু মাথা ঝোঁকাল। সে জানলার বাইরে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর আলতো করে নিজের শাড়ির আঁচলটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে বলল, আব্বা যখন অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালের সংকীর্ণ বিছানায় শুয়ে থাকেন, তখন শুধু ঢাকার সেই অসহ্য জ্যাম আর মানুষের চিৎকার মিস করেন। মানুষের বোধহয় সব হারিয়ে গেলেই মায়া বাড়ে। হাসপাতালের চড়া বিল আর ওষুধের টাকা জোগাতে গিয়ে যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখন স্মৃতির এই পুরোনো অলিগলিগুলোই আমাদের একমাত্র অক্সিজেন হয়ে দাঁড়ায়। মাঝে মাঝে মনে হয় আমরা সবাই যেন এক একটা ভাঙা আয়না, যেখানে প্রতিচ্ছবি দেখা যায় কিন্তু নিজেকে চেনা যায় না। কথা বলতে বলতে তনিমা হাসল। অনির্বাণের মনে হলো, এই হাসির পেছনে কত হাজার রাত জাগার হাহাকার লুকিয়ে আছে। সে ধীরে ধীরে বলল, তনিমা, আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমার মনে হচ্ছে, আমি আপনাকে অনেক জনম ধরে চিনি। তনিমা চুপ করে রইল।
জানলার বাইরের ম্লান আলো তার মুখে এক অদ্ভুত রহস্য তৈরি করেছে। সে শুধু নিচু স্বরে বলল, মাঝে মাঝে চেনা মানুষের চেয়ে অচেনা মানুষই বেশি আপন হয়ে ওঠে অনির্বাণ বাবু। আপনি কি কখনো মাঝরাতে একা বৃষ্টির শব্দ শুনেছেন? আমার মনে হয় সেই শব্দটা আমাদের দুজনের জন্যই একই বিষণ্ণতার কথা বলে। অনির্বাণ অনুভব করল, তনিমার কথার ভেতরে যে শূন্যতা আছে, তা আসলে তার নিজেরই হাহাকার।
পরদিন বৃষ্টিটা একটু ধরেছে, কিন্তু শহর জুড়ে একটা স্যাঁতস্যাঁতে অস্বস্তি রয়ে গেছে। তনিমা তার ফাইল থেকে বাবার নতুন কিছু প্রেসক্রিপশন বের করে মেলাচ্ছিল। অনির্বাণ দেখল তনিমার কপালে একটা সূক্ষ্ম চিন্তার ভাঁজ, যা তাকে আরও বেশি করুণ করে তুলেছে। সে জানত না তনিমার পকেটে আর কতটুকুই বা সম্বল অবশিষ্ট আছে। তনিমা এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, কাল রাতে যখন ইনসুলিন কিনতে গেলাম, ওষুধের দোকানের লোকটা বড় নির্লিপ্তভাবে বলল দাম আরও বেড়েছে।
আমি কিছুক্ষণ গুম মেরে দাঁড়িয়ে রইলাম। পাশে এক বৃদ্ধ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে করুণ স্বরে বললেন, মা রে, সব কিছুর দাম বাড়ে, শুধু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের দামটাই দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। অনির্বাণ কোনো উত্তর দিল না। সে জানালার কাচের গায়ে আঙুল দিয়ে একটা অদৃশ্য দাগ কাটল। সে বলল, তনিমা, এই যে কাচের ওপারে পৃথিবীটা দেখছেন, আমরা সবাই সেখানে কেবল আগন্তুক। যখন বড় কোনো বিপর্যয় আসে, তখন মানুষ একে অপরের পাশে দাঁড়ায় পরিচয়ের নাম না জেনেই। আমার মা যখন গত মাসে অসুস্থ হলেন, এক অচেনা মানুষ নিজের পকেট থেকে ট্যাক্সি ভাড়া দিয়ে আমাদের পৌঁছে দিয়েছিলেন। তিনি কোন্ দেশের মানুষ ছিলেন, তা আমি আজও জানি না। শুধু জানি তাঁর হাতটা যখন আমার কাঁধে ছিল, তখন মনে হয়েছিল আমার নিজের কোনো আপনজন পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
তনিমা উঠে দাঁড়াল। ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট মাটির ভাঁড় বের করল সে। বলল, এতে আমাদের ওখানকার সরিষা ফুলের মধু আছে। আব্বা বলেছিলেন অশ্বিনী দাদুকে দিতে। তিনি যখন ছোট ছিলেন, ঢাকার শাঁখারীবাজারের এক পুরোনো দোকান থেকে এই মধু নিয়ে খেতেন। অনির্বাণ ভাঁড়টা হাতে নিল। মাটির সেই সোঁদা গন্ধটা তার নাকে লাগল। তার মনে হলো, কোনো এক অদৃশ্য নাড়ির টানে এই মাটির ঘর আর ওপারের টিনের চালগুলো আজও সমান্তরালভাবে বেঁচে আছে। তনিমা দরজার দিকে পা বাড়িয়ে বলল, আজ আসি অনির্বাণ বাবু। কাল হয়তো রিপোর্টগুলো নিয়ে আবার ছুটতে হবে সেই হাসপাতালের করিডোরে। অনির্বাণ হঠাৎ করেই তনিমার হাতটা হালকা করে ছুঁল। তনিমা থামল না, কিন্তু তার শিরদাঁড়াটা এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। অনির্বাণ খুব নিচু গলায় বলল, সাবধানে যাবেন। দরকার হলে আমাকে একটা ফোন করবেন, আমি কিন্তু অপেক্ষায় থাকব। তনিমা কোনো কথা না বলে সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নেমে গেল। অনির্বাণ জানলার ধারে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, দুই তীরের দীর্ঘশ্বাসগুলো যেন এক বিষণ্ন সন্ধ্যায় এসে গঙ্গার শান্ত জলের ওপর আছড়ে পড়ছে।
পরদিন সকালে এসএসকেএম হাসপাতালের সেই উৎকট সাদাটে গন্ধ আর অগণিত মানুষের ভিড়ের মাঝে অনির্বাণকে বেশি সময় খুঁজতে হলো না। তনিমা করিডোরের এক কোণে সিঁড়িতে বসে ছিল। অনির্বাণ দেখল তনিমার মুখটা কালকের চেয়েও বেশি পাংশুটে। তনিমা খুব নিচু স্বরে বলল, আব্বা বলছিলেন আপনার সঙ্গে দেখা হলে একটা কথা বলতে। ওপারের মাটির আর এপারের মাটির গন্ধে নাকি কোনো তফাত নেই, শুধু আমাদের নাকগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভোঁতা হয়ে গেছে। অনির্বাণ হাসল। সে পকেট থেকে ঠাকুরদার সেই পুরোনো চশমাটা বের করে তনিমার হাতে দিল। এটা আপনার বাবার জন্য। তিনি যখন ওপারের কথা মনে করবেন, তখন এই চশমাটা দিয়ে একবার আকাশটা দেখতে বলবেন। হয়তো সবটা ঝাপসা থেকে একটু পরিষ্কার হবে। তনিমা চশমাটা হাতে নিল। তার আঙুল আর অনির্বাণের আঙুল এক মুহূর্তের জন্য আবার ছুঁয়ে গেল। কাচের ফ্রেমের সেই শীতলতা দুজনের হৃৎপিণ্ডের তপ্ত স্পন্দন যেন এক করে দিল। এটা কেবল শারীরিক স্পর্শ ছিল না, ছিল দুই ভিন্ন দেশের দুটি মানুষের একে অন্যকে নিঃশব্দে আগলে রাখার এক গোপন শপথ।
হাসপাতালের সেই ভিড়ের মাঝে অনির্বাণ এক মুহূর্তের জন্য তনিমার বাবার দিকে তাকাল। রোগা পাণ্ডুর হাত দুটো চাদরের বাইরে ঝুলে আছে। মানুষটি ঘুমোচ্ছেন, কিন্তু তার কপালে এক অসীম তৃপ্তি। অনির্বাণ বুঝল, এই মানুষটি কোনো দেশ বা ধর্মের নন, তিনি এক চিরন্তন শিকড়হীন পিতার প্রতিচ্ছবি। তনিমার চোখে তখন জলের একটা পাতলা আস্তরণ। সে অপরাধীর মতো অনির্বাণের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার অনেক সময় নষ্ট করলাম অনির্বাণ বাবু। অনির্বাণ শুধু মাথা নেড়ে জানাল, এই সময়টুকুই তার জীবনের সবচেয়ে দামি বিনিয়োগ। হাসপাতালের গেট পর্যন্ত অনির্বাণ সঙ্গে এলো। বিদায়ের মুহূর্তটা বড় নিষ্ঠুর। তনিমা ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে বলল, আসি অনির্বাণ বাবু। আমাদের মতো মানুষদের মাসকাবারির হিসাবে হয়তো আবার কোনোদিন কাটাকুটি হবে। হয়তো আবার কোনো এক মেঘলা বিকেলে গঙ্গার ঘাট বা বুড়িগঙ্গার পাড়ে দেখা হবে। তনিমার গলায় একটা সূক্ষ্ম কম্পন ছিল যা অনির্বাণের বুকের ভেতর গিয়ে বিঁধল।
অনির্বাণ দেখল তনিমা জনসমুদ্রের মধ্যে ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছে। তার নীল কামিজটা ভিড়ের মধ্যে ক্রমশ ঝাপসা হয়ে এলো। অনির্বাণ ট্যাক্সি ধরল না। সে হাঁটতে শুরু করল শহরের ব্যস্ত রাজপথ দিয়ে। তার মনে হলো, তনিমা আর সে-দুজনেই যেন এই নির্দয় সময়ের এক জোড়া জলকাচ। স্বচ্ছ, সমান্তরাল কিন্তু মাঝখানে এক অলঙ্ঘ্য অদৃশ্য ব্যবধান। তবে সেই কাচের দেয়াল ভেদ করে ঠিকই একে অপরের আর্তনাদ ওপাশে পৌঁছায়। অনির্বাণ পকেটে হাত দিয়ে দেখল মধুর সেই ছোট্ট ভাঁড়টা। সে জানে, এই মধুর আদিম স্বাদটার কোনো মানচিত্র নেই। মানুষের হাহাকার আর ভালোবাসার কোনো পাসপোর্ট লাগে না। বৃষ্টির পশলা মেখে অনির্বাণ তার সেই নোনা ধরা ভাঙা বাড়ির দিকে পা বাড়াল। তার মনে মনে এক ধরনের মধুর যন্ত্রণা গুঞ্জরিত হতে লাগল, যেখানে কোনো সীমান্ত নেই, কেবল দুটি হৃদয়ের নীরব কথোপকথনই শেষ পর্যন্ত সত্য হয়ে বেঁচে থাকে। জানালার কাচে তখন বৃষ্টির জলের দাগ, দেখতে ঠিক জমাট বাঁধা চোখের জলের মতো।