পাখি
তোমরা মানুষেরাই পাখি হতে চেয়েছিলে।
কিন্তু পাখিরা কি কখনো মানুষ হতে চেয়েছিল?
কখনো কি বলেছে,
আমি গান গেয়েছি, পেমেন্টটা দিন!
অথবা খাঁচার মধ্যে বন্দী পাখিটি কি কখনো ভেবেছে,
মানুষকেও সে সুযোগ পেলে বন্দী করবে?
এইসব ভালোবাসি
জ্বলন্ত সিগারেটের মতোন ফুরিয়ে যাচ্ছে উদ্বাস্তু জীবন।
আমরাও ফুরিয়ে যাচ্ছি, উড়িয়ে যাচ্ছি নিজেকে।
আমাদের রোজ রোজ পকেটের টানাটানি,
ফুটপাত ধরে এদিক সেদিক ছোটা।
একটু যদি চা খাব,
তাও টং ঘরে,
দুই কাপ চায়ে তিনজন,
একটা সিগারেটই ভাগ করে খাওয়া।
আবার পুলিশের লাঠির বাড়ি উপেক্ষা করে মিছিল যাওয়া,
অথবা রোজ রোজ বাড়ি ছাড়ার ওয়ার্নিং পাওয়া,
এইসব অস্থিরতার দিনগুলো যেন কিছুতেই শেষ হয় না।
তবু সময় বদলে যায়, সাথে মানুষও।
এই নদী, বাড়ির পথ, ভাঙা রাস্তা,
সিগারেটের ছাই উড়ে এসে গায়ে পড়া,
জীবনের অসীম অনটন,
সব একই থাকে।
এই কদমের গন্ধ, এই নীল নীল আকাশ, রাস্তার ধুলো,
এই রোজ রোজ আমাদের দেখা হওয়া, ভাগ করে খাওয়া,
এই বৃষ্টিভেজা পথঘাটে কাদাজলে মাখামাখি,
এই বামে যাওয়া, প্রতিবাদ করা,
এইসব ভালোবাসি।
আমাদেরই দেখি না!
আমাদের খুচরো স্বপ্ন,
রঙিন স্মৃতির বায়স্কোপ,
ভুলে যেতে পারলাম না কিছুই!
শহরের কিনারে কীর্তনখোলার বাতাস,
ছাতিমের গন্ধ বুকে নিয়ে
ফুটপাত ধরে হেঁটে চলা।
শহরের বুকে চালতা তলায়
এখনো সন্ধ্যা নামে কোলাহলে।
বিজনের চায়ের টেবিলে এখনো তর্ক জমে,
আড্ডায় ঘিরে থাকে কত মুখ!
কত গান, কত কথা আর কবিতা
ভিড় করে সব অনামি লেনের পাশে,
রাখাল বাবুর পাড়ে।
কত মুখ দেখি, কত ছবি দেখি,
শুধু আমাদেরই দেখি না!
স্বাধীনতা
আমাকে গ্রেফতার করা হলো,
কথা বলার অপরাধে।
অপরাধীদের মতো হ্যান্ডকাফ
পরানো হলো।
এরপর গারদে পুরলো, আরও
অনেকের মতো।
একথাল ভাত আর মাংসের প্লেট
আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে কনস্টেবল
বললেন, “স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা।”
আমি বললাম,
বড়ই উপকার করলেন।
আপনি না বললে হয়তো এই কৌতুকটি
আমার জানাই হতো না কোনোদিন!
হারানো বিজ্ঞপ্তি
প্রিয় গাছ হারানোর শোক ভুলে যাওয়ার
আগেই দেখি,
আমার হাতের কলমটা হারিয়ে গেছে।
এরপর একদিন সকালে উঠে দেখলাম,
আমার কোনো দেশ নেই।
বুঝলাম, আসলে আমি একটা পাখি।
একদিন পত্রিকা অফিসে গেলাম
বিজ্ঞপ্তি দিতে,
আমার হাসিটাকে খুঁজে পাচ্ছি না।
কোথাও পাচ্ছি না, কোথাও না।
পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ছাপলো,
একদিন পত্রিকা খুলে দেখি,
সেই বিজ্ঞাপনটাও হারিয়ে গেছে!
হারাতে হারাতে এরপর যখন
আমার বাকশক্তি হারিয়ে ফেললাম,
তখন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া
আর কিছুই করার ছিল না।
এরও পরে একদিন আবিষ্কার করলাম,
আমাদের যৌথতার স্বপ্ন লুট হয়ে গেছে।
শুনেছি যারা লুট করেছে,
তারা নাকি মানুষের মতোই দেখতে!
এসব ভাবতে ভাবতে প্রিয় বন্ধুর
হাত, সময়,
এবং শহর জুড়ে রাস্তায় ছোটাছুটি,
একে একে হারিয়ে ফেললাম সবকিছু।
প্রথমে একদিন আমার কবিতা হারালো,
আরেকদিন হারালো আমার প্রিয় মানুষ।
এরপর একদিন দেখি,
আমাকেই আমি হারিয়ে ফেলেছি!