ট্রেনটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল দিগন্তের দিকে, যেন আর কখনো ফিরবে না। কামরায় বসে থাকা মানুষগুলো কেউ নামেনি এই স্টেশনে-শুধু রাশেদ, একা। পায়ের নিচে মাটি যেন কেঁপে উঠেছিল একমুহূর্ত আগে। এখন চারদিক নিস্তব্ধ, শোনা যায় শুধু ঝিঁঝি পোকার সুর।
স্টেশন বললেই চোখে ভেসে ওঠে চায়ের দোকান, গেটম্যানের বাঁশি, ছোট ছোট ছেলেদের দৌড়। কিন্তু এখানে... এসবের কিছুই নেই। চারদিকে মাঠ, ধান গাছ মাথা দোলাচ্ছে হালকা হাওয়ায়। পশ্চিম দিকে একটা সরু কাঁচা রাস্তা দেখা যায়, কিন্তু সেটা কোথায় যায়, তা আন্দাজ করা শক্ত।
রাশেদ ব্যাগটা কাঁধে তোলে, নেমে আসে প্ল্যাটফর্মের একমাত্র সিমেন্টের বেঞ্চ থেকে। সামনে একটা ছোট ইটের ঘর-সম্ভবত টিকিট অফিস। অদ্ভুত লাগছে তার-এমন জায়গায় কেউ বসে থাকবেই বা কেন? যেতে যেতে সে ভাবে, আধুনিকতার এত উন্নতির পরও এমন স্টেশন রয়ে গেছে, যেগুলোর মানচিত্রেই যেন ভুল করে রাখা হয়েছে। ঘরের ভিতর একটা মৃদু আলো। সেঁটে রাখা মশারি সরিয়ে মুখ বের করেন একজন-চুলে পাক ধরেছে, চোখে চশমা। ভদ্রলোক তাকিয়ে থাকেন রাশেদের দিকে কিছুক্ষণ, তারপর হেসে বলেন, আপনি নতুন, তাই না?
রাশেদ কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে জিজ্ঞেস করে, এই স্টেশন থেকে বাইরে বের হওয়ার পথ কোথায়? কোনো পাকা রাস্তা আছে কাছাকাছি?
ভদ্রলোক জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ।
তারপর উত্তর দেন। পথ আছে... কিন্তু আপনি কি ঠিক জানেন, আপনি কোথায় এসেছেন?
রাশেদ থমকে যায়। ঘড়ি দেখে। বিকাল প্রায় সাড়ে ৪টা বাজে। আকাশে মেঘ জমেছে হালকা, তবে আলো এখনো বেশ রয়ে গেছে। টিকিটঘরের ভিতরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা যেন একমুহূর্তে ভিন্ন হয়ে গেল-তার চোখের দৃষ্টি নরম নয়, প্রশ্নবিদ্ধ।
‘আমি এসেছি একটা প্রোজেক্টের কাজে’, রাশেদ শান্তভাবে বলে, ‘জায়গাটার নাম মদনপুর। শুনেছি স্টেশনটা নেমে পশ্চিমে পায়ে হেঁটে মিনিট বিশেক গেলেই পাড়া।’
ভদ্রলোক একচুলও নড়েন না। শুধু জিজ্ঞেস করেন, আপনাকে কি কেউ নাম বলেছে? মানে-কে বলেছে আপনি এখান দিয়ে যাবেন?
রাশেদ একটু বিরক্ত হয়।
একজন লোক। গুগল ম্যাপে দেখেও মিলেছে। আর আপনি এত প্রশ্ন করছেন কেন? আমি কি কাউকে খুঁজে নিচ্ছি নাকি?
ভদ্রলোক এবার বসে পড়েন কাঠের চেয়ারে। চশমা খুলে পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে কপাল মুছে নেন।
মাফ করবেন। এমনিতে কেউ এখানে নামে না। যারা নামে, তারা... বেশিক্ষণ থাকে না। আর হ্যাঁ, গুগল ম্যাপে সব জায়গা পাওয়া যায়, কিন্তু সব তথ্য মেলে না।
রাশেদ একটু অবাক হয় এবার।
আপনার কথার মানে কী? ভয় দেখাচ্ছেন?
ভদ্রলোক হালকা হাসেন।
ভয়? না। ভয় দেখিয়ে কী হবে? ভয় তো আগে দেখানো যেত। এখন আপনি নেমেই গেছেন... সব শুরু হয়ে গেছে।
রাশেদ ধমক দেওয়ার মতো করে বলে, দেখুন, আমি একটাও ভূতের গল্পে বিশ্বাস করি না।
ভূতের কথা বললাম কই?
ভদ্রলোক হঠাৎ হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ান।
আপনার নামটা বলুন তো?
রাশেদ। রাশেদ হায়দার।
লোকটা মুহূর্তে থেমে যায়। মুখটা যেন ফ্যাকাশে হয়ে ওঠে।
হায়দার... আপনি কি-ড. শহীদ হায়দারের ছেলে?
রাশেদের বুকটা কেমন ধক করে ওঠে।
হ্যাঁ... আপনি চিনেন আমার বাবাকে?
ভদ্রলোক ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে যান। তারপর নিচু গলায় বলেন, আপনার বাবাকে নিয়ে এই জায়গায় অনেক কথা আছে, মিস্টার রাশেদ। উনি একবার এখানে এসেছিলেন। তারপর... এক মাস নিখোঁজ ছিলেন। ফিরে গিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু যিনি ফিরে গিয়েছিলেন, তিনি আর আগের মানুষ ছিলেন না।
রাশেদ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
কিন্তু... বাবা তো কিছু বলেননি... কিছুই না...
বলবেন না। উনি পারতেন না। এটা এমন এক জায়গা, যেখানে মানুষের স্মৃতি ঝাপসা হয়ে যায়। সময়টা বদলে যায়, মানুষ বদলে যায়। আপনি কী জানেন, মদনপুর নামের কোনো গ্রাম সরকারি নথিতে নেই?
রাশেদ যেন হঠাৎই বুঝতে পারে, কিছু একটা ঠিকঠাক চলছে না। তবু সাহস করে বলে, তাই বলে জায়গাটা নেই, এটা বিশ্বাস করব কেন? আমি তো নিজেই যাচ্ছি ওখানে। কাজের লোকজন অপেক্ষা করছে।
ভদ্রলোক এবার সত্যিকারের দুঃখিত চোখে বলে, আপনারা সবই ভাবেন পরিকল্পনার মতো চলবে। কিন্তু এই মাঠ, এই জমি, এই বাতাস-সব যেন নিজের নিয়মে চলে। এখানে সময় দাঁড়িয়ে থাকে, আবার ছুটেও যায়। আপনার বাবার মতো আপনিও যদি...
হঠাৎই একটা কর্কশ আওয়াজে থেমে যায় কথাগুলো। স্টেশনের ঠিক পেছনের দিক থেকে আসে শব্দটা। যেন কোনো ভারী কিছু ঘষটে চলেছে মাটির গায়ে।
‘এই আওয়াজটা কী?’ রাশেদ জিজ্ঞেস করে।
ভদ্রলোক আর কিছু না বলে ঘরের জানালা থেকে ইশারা করেন, দ্রুত চলে যান। ওই সরু রাস্তা দিয়ে পশ্চিমে সোজা হেঁটে যান। যতক্ষণ না লোকালয়ের আলো দেখতে পাচ্ছেন, পেছন ফিরে তাকাবেন না। আমি প্রার্থনা করি, আপনি সময়মতো পৌঁছান।
কিন্তু আপনি কে? আপনি কি এই স্টেশনের কিপার?
ভদ্রলোক একমুহূর্ত চুপ করে থেকে বলেন, এই স্টেশনের কিপার বহু বছর আগে মারা গেছেন। আমি শুধু তার জায়গা ধরে বসে আছি, যেন যারা আসে, তাদের একটু সাবধান করতে পারি।
রাশেদের পা ঠান্ডা হয়ে আসে। গলা শুকিয়ে যায়। সে আর কোনো প্রশ্ন না করে ব্যাগটা কাঁধে ফেলে ছোটো রাস্তার দিকে পা বাড়ায়। পেছনে তাকায় না। দিগন্তে সূর্য ডুবে যাচ্ছে। আর চারপাশে শুরু হচ্ছে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। যেন বাতাসও থেমে গেছে।
রাশেদ হাঁটছে। খেতের আল ধরে, একফালি সরু কাঁচা রাস্তা বেয়ে। মাথার ওপর গাঢ় মেঘ জমে উঠছে। পথের দুপাশে ঝোপঝাড়, মাঝে মাঝে হিজল গাছ। পায়ের তলায় কাদামাটির কসরত। আশপাশে কোথাও মানুষের শব্দ নেই। কিছুদূর গিয়ে সে দেখতে পায়, একটা পুরোনো কাঠের সাঁকো। নড়বড়ে, ভিজে। ওপারে মাটির উঁচু ঢিবির গা বেয়ে একটা ছায়াময় পল্লি-মদনপুর। ঠিক যেমন বাবার পুরোনো ডায়েরিতে ছিল।
রাশেদ থমকে দাঁড়ায়। বুকের ভিতর যেন হঠাৎ হিমেল হাওয়া লাগে।
‘ঘোড়ার টগবগ শব্দে ঘুম ভাঙল। বারান্দায় গিয়ে দেখি-কেউ নেই। অথচ গোটা মদনপুরে আজ তিন দিন কেউ বাইরে বেরোয় না। আলোর নিচে দাঁড়িয়ে সেই মুখটা আবার দেখলাম। জানি না মানুষ, না ছায়া।’
বাবার লেখা, ১৯৮৬ সালের মার্চ মাস।
সাঁকো পার হতেই বদলে যেতে থাকে চারপাশ। বাতাস ভারী, আলো কমে আসে। মাটি থেকে ধোঁয়ার মতো কিছু উঠে আসছে। রাশেদ দৌড়ায়। তার মোবাইল আর কাজ করছে না। নেট নেই, জিপিএস নেই, ঘড়ি থেমে গেছে ঠিক ৫টা ৪৭-এ।
একটা পুরোনো দোতলা পাকা বাড়ি-পড়ে আছে মাটির ঢালে। পাশেই একটা পোড়া গাছ। বাড়িটার গায়ে শালবর্ণের ছোপ, এক পাশ ভেঙে পড়েছে। এক বৃদ্ধ বসে আছেন উঠোনে। গায়ে ময়লা লুঙ্গি, গলা অবধি ছেঁড়া কম্বল। চোখে চশমা। সামনে খোলা একটা বই-দেখে মনে হয় ডায়েরি। রাশেদ এগিয়ে যায়।
‘মাফ করবেন’ বলে সে, ‘আপনি কি জানেন এখান থেকে বড় রাস্তা কোন দিকে?’
বৃদ্ধ তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ বলেন, তোর বাবার মতো চেহারা তো। শহীদ হায়দারের ছেলে?
রাশেদ ঘাড় নাড়ে। বুকটা দপ করে ওঠে আবার।
হ্যাঁ... আপনি চিনতেন তাঁকে?
বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ান। শরীর কাঁপে।
চিনতাম না, এখনো চিনি। উনি এখানেই আছেন।
মানে?
ওই দোতলায় ওঠো। বাঁ-দিকের ঘর। চাবি দরজার ওপরেই থাকে।
রাশেদ কিছু না বুঝেই উঠে যায়। সিঁড়িটা ভাঙাচোরা। ঘরের দরজাটা খুলতেই ধুলোয় ঢেকে থাকা একটা ড্রেসিং টেবিল, এক জোড়া চশমা, এক জোড়া পাঁজির মতো মোজা, আর খাটের ওপর একগাদা কাগজ। হাতের কাঁপুনি থামিয়ে সে একেকটা তুলে দেখে।
‘তাকে আমি ফিরিয়ে আনতে পারিনি। কিন্তু সে আমাকে রেখে গেছে কিছু মুখ, কিছু ছায়া। আজ ২৪ মার্চ। আমি এখানেই থেকে যাচ্ছি। কারণ ওরা চায় আমি থেকেই যাই।’
শেষের লেখাটা বাবার হাতের লেখা। হুবহু। রাশেদ দৌড়ে নিচে নেমে আসে।
আপনি বলতে চান, বাবা এখানে এসেছিলেন? এই ঘরেই ছিলেন?
বৃদ্ধ হাসেন।
উনি ছিলেন না, এখনো আছেন। শুধু রূপ বদলে গেছে। এখানকার নিয়ম ভিন্ন। সময় এখানে বাঁক নেয়।
‘আপনি কে?’ রাশেদ শ্বাস নিতে পারছে না।
আমি? আমি ওই স্টেশনকিপার। যে মারা গেছে, কিন্তু কাজ এখনো শেষ হয়নি। সময় এসেছে আমার জায়গা ছেড়ে দেওয়ার। তুমি এখন বুঝবে, কেন ফিরতে পারে না কেউ।
একটা সাদা আলো ঝলসে ওঠে চারপাশে। ধোঁয়া। ঠান্ডা বাতাস। রাশেদ চোখ মেলে দেখে-সে বসে আছে টিকিটঘরে। সামনে একটা চেয়ার। কাচের জানালা। বাইরের মাঠে ঝরছে টিপটিপ বৃষ্টি। হঠাৎ দরজায় কেউ ঢোকে। একটা যুবক। আধা ভেজা জামা, হাতে ব্যাগ।
এই জায়গাটা মদনপুর যেতে হয় তো? আমি গুগলে দেখলাম এখান দিয়েই যেতে হয়।
রাশেদ দাঁড়িয়ে পড়ে। তার চোখে এখন ওই ভদ্রলোকের দৃষ্টি। ধীর, ভারী। সে চশমা খুলে বলে, আপনার নামটা বলবেন?