Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৫ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৪ অক্টোবর, ২০১৯ ২১:২৭

ক্যাম্পাসে আলীমের ডিজিটাল শপ

ইকবাল হোসাইন রুদ্র

ক্যাম্পাসে আলীমের ডিজিটাল শপ

নিজের রান্নার দক্ষতা আর বিভিন্ন জায়গা থেকে ধার করে মাত্র ১০ হাজার টাকাকে পুঁজি করে এ বছরের মার্চে শুরু হয়েছিল তার এ কঠিন পথের যাত্রা। প্রথম দিকে শুধু নানান রকমের শরবত বানাতেন

 

স্বপ্ন গড়ার প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়। তবে যে কোনো স্বপ্নকে এই প্রতিষ্ঠান থেকে বাস্তব রূপ দান করা যায় সেটি প্রমাণ করলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এক শিক্ষার্থী। নাম আবদুল আলীম। পড়ছেন ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে ক্যাম্পাসে গড়ে তুলেছেন ‘ডিজিটাল শপ’। সব হীনমন্যতাকে জয় করেছেন আবদুল আলীম। পড়ালেখার পাশাপাশি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নে বিভোর তিনি। সূর্য তখন পশ্চিম কোণে বেশ খানিকটা হেলে পড়েছে। গোধূলি লগ্ন হাতছানি দিয়ে ডাকছে মায়াবী সন্ধ্যাকে। খেলার মাঠে কেউ খেলছে ফুটবল কেউবা ক্রিকেট। কিন্তু একটি   ছেলে মাঠের কোনায় ছোট্ট দুটি টেবিলে নানা ধরনের খাবারের পসরা সাজিয়ে বসে আছেন। কারও হাতে তুলে দিচ্ছেন নুডলস কাউকেবা ছোলা বুট, চিকেন ফ্রাই প্রভৃতি। আবার কেউ নিচ্ছেন ঢাকাইয়্যা লাচ্ছি বা শরবত। তার সহযোগী হিসেবে আছেন আবার তারই বন্ধু মনিরুল।

কাজের ফাঁকেই আলীমের অস্থায়ী দোকানে কথা হলো তার সঙ্গে। জানা গেল তার দৈনন্দিন পথচলার পঞ্জিকা। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে ক্লাসে যায় সে। ক্লাস শেষেই চলে আসেন ক্যাম্পাসের জিয়া মোড়ে তার ছোট্ট ‘ডিজিটাল শপে’। শুরু হয় তার কর্মব্যস্ততা। বিভিন্ন মুখরোচক খাবার ও নানান ধরনের শরবত নিজ হাতে তৈরি করেন। বিকাল থেকে রাত ৯টা অবধি চলে তার এ কর্মকান্ড । জীবনযুদ্ধে লড়াই করা সৈনিক আলীমের প্রতিদিনের গল্পটা এমনই।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকেই শুরু হয়নি তার এ লড়াই। বাবা খোরশেদ আলী পেশায় একজন কৃষক। পড়াশোনার খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হতো তাকে। দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা আলীম প্রথম বর্ষে কুষ্টিয়া শহরে টিউশনি করাতেন। তবে প্রায় ২৪ কি.মি পথ পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াতে প্রচুর সময় নষ্ট ও শারীরিক পরিশ্রম হতো তার। বিকল্প হিসেবে এ বছর নতুন এই পথ বেছে নিয়েছেন তিনি। নিজের রান্নার দক্ষতা আর বিভিন্ন জায়গা থেকে ধার করে মাত্র ১০ হাজার টাকাকে পুঁজি করে এ বছরের মার্চে শুরু হয়েছিল তার এ কঠিন পথের যাত্রা। প্রথম দিকে শুধু নানান রকমের শরবত বানাতেন। প্রায় এক মাস একা কাজ করার পর সঙ্গী হিসেবে পান ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহপাঠী মনিরুল ইসলামকে। এরপর দুজন মিলে কলেবর বৃদ্ধি করে ‘ডিজিটাল শপ’ নাম দিয়ে নতুন করে যাত্রা শুরু করেন।

ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের মনেও তাদের জন্য ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেছেন। সন্ধ্যায় আলীমের দোকানে আসা আইন বিভাগের শিক্ষার্থী রায়হান মাহবুব বলেন, ‘আমরা প্রতিনিয়তই আলীমের দোকানে আসি। বন্ধুরা আড্ডার পাশাপাশি হালকা নাস্তাও সেরে নিই। এ ধরনের সাহসী উদ্যোগ সত্যিই দৃষ্টান্ত।’

সারা দিন এতাব্যস্ততার মাঝেও পড়াশোনাতেও সফলতা রয়েছে আলীমের। বর্তমানে সে ইংরেজি বিভাগে তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত। বিভাগে পঞ্চম স্থান অধিকারী। প্রতিদিন কাজের শেষে রুমে ফিরে বিভাগের পড়াশোনায় মনোযোগ দেয় সে। এ বিষয়ে আবদুল আলীম জানান, ‘ছোটবেলা থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখি। কিন্তু অর্থ ও সাহসের অভাবে এতদিন তা হয়ে ওঠেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পেয়েছি। শরবতের গ্লাসের মিষ্টি যাত্রা থেকে ভবিষ্যতে দেশের একজন সফল উদ্যোক্তা হতে চাই। এই বিশ্বাস থেকেই এখন পর্যন্ত সব বাধা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি।’ আবদুল আলীমের এই কর্মকান্ডে ক্যাম্পাসের অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। ঢাকা শহরে এমন দৃশ্যের দেখা মিললেও ঢাকার বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন দৃশ্য খুব একটা দেখা যায় না। আলীমের কাজে মুগ্ধ হয়ে তারই বিভাগের শিক্ষার্থী হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘দেশে শিক্ষিতদের সংখ্যা বাড়ছে একইসঙ্গে বেকারত্বও বাড়ছে। এর মূলে রয়েছে আমাদের হীনমন্যতা। সেই জায়গা থেকে আলীম বের হয়ে এসে ‘ডিজিটাল শপ’ গড়ে তুলেছে। যা ক্যাম্পাসের অন্য শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।’ সহপাঠী মনিরুল ইসলাম জানান, আলীম শুধু রান্নাই পারে তা কিন্তু নয়। সে অবসরে কবিতা লেখে আবার নানা ধরনের কারুশিল্প তৈরিতেও পটু। সমানতালে পারদর্শিতা রয়েছে অভিনয়ে। তার শখ বিভিন্ন দেশের ভাষা শেখা। এ পর্যন্ত সে চাইনিজ, কোরিয়ানসহ প্রায় ৭টি ভাষা রপ্ত করেছে।

ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক আজগর হোসাইন জানান, আমি নিজেও মাঝে মাঝে তার দোকানে গিয়ে বসি। সে যত্ন করে আমাদের খাওয়ায়। তার কর্মকান্ড সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। তার প্রতি আমাদের ভালোবাসা, সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। আমি আশা করি ভবিষ্যতে সে আরও ভালো কিছু করবে।

 ছোট্ট দোকানের আয় থেকে নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারকেও সহায়তা করেন আবদুল আলীম। তার ছোট্ট সহযোগিতা হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তার আশপাশের দুস্থ মানুষের মাঝেও। বগুড়ার ছেলে আলীম নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বলেন, আমি কারও অধীনস্থ হয়ে চাকরিতে বিশ্বাসী নই। আমি সফল উদ্যোক্তাদের কাতারে পৌঁছতে চাই। আমার স্বপ্ন বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নিজ এলাকার অসহায় মানুষের জন্য কিছু করা।’


আপনার মন্তব্য