Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৫ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৪ অক্টোবর, ২০১৯ ২১:৩৭

আরচারির সোনার ছেলে রোমান সানা

রাশেদুর রহমান

আরচারির সোনার ছেলে রোমান সানা

একসময় বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তীর-ধনুক বানিয়ে রবিন হুডের মতো হওয়ার চেষ্টা করতেন তিনি। প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় খেলাধুলায় মেতে থাকতেন দিনমান। মনের অজান্তেই হয়তো বার বার উঁকি দিয়ে যেত পুরনো দিনের কথা। হয়তো ছেলেবেলায় ফেরার ইচ্ছাটা প্রবল হয়ে উঠতে থাকে আনমনে!

রোমান সানা। বাংলাদেশের আরচারিতে সোনার ছেলে। যে খেলার নামটা নবম শ্রেণি পর্যন্তও জানা ছিল না তার। ২০০৮ সালে বিকেএসপির ক্যাম্পে আরচারি খেলার কথা বললে রোমান সানা অবাক হন। এটা আবার কোন খেলা! ফুটবল ক্রিকেটসহ নানান খেলার কথা জানা থাকলেও আরচারির নামটা জানা ছিল না রোমান সানার। কেবল রোমান সানা কেন, ওই সময় আরচারি নামে খেলাটার সঙ্গে বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষেরই পরিচয় ছিল না। তবে ক্যাম্পে গিয়ে অবাক রোমান সানা। ছেলেবেলার সেই আনন্দমুখর দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায় তীর-ধনুক দেখে। সেই ছেলেবেলায় ফিরে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা থেকেই যেন হাতে তুলে নেন তীর-ধনুক। এর পরেরটা ইতিহাস। যা বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষেরই জানা।

তীর-ধনুক ছিল প্রাচীন ও মধ্যযুগে যুদ্ধের প্রধান হাতিয়ার। শত্রুকে দূর থেকে ঘায়েল করতে এর বিকল্প ছিল না। তীরন্দাজ বাহিনীকে যুদ্ধের হাঙ্গামা থেকে রক্ষা করতে বিশেষ ব্যবস্থাও নেওয়া হতো। কিন্তু আধুনিক যুগে বিশেষ করে পনেরো শতকে তুর্কিদের সেই বিশাল কামান আবিষ্কারের পর তীর-ধনুকের কদর কমতে থাকে। যে কামান দিয়ে তুর্কিরা কনস্টান্টিনোপল শহর জয় করেছিল। সতেরো শতকে তীর-ধনুকের কদর শূন্যে নেমে আসে। তবে আঠারো শতকের শেষদিকে আবারও এর কদর বাড়তে থাকে। এই ক্ষেত্রে ইংল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। খেলাধুলার ইতিহাসে সবচেয়ে পুরনো সংগঠনগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দি রয়্যাল কোম্পানি অব আরচার্স। ১৮৭৬ সালে এই ক্রীড়া সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে আঠারো শতকের আগে তীর-ধনুকের এই খেলাটা জনপ্রিয় হয়নি। ১৯০০ সালে প্যারিস অলিম্পিকে ১৫০ জন আরচার অংশ নিয়েছিলেন। এরপর থেকেই অলিম্পিকের অন্যতম ইভেন্ট আরচারি। আর বর্তমানে এর কদর সারা দুনিয়াতে।

বাংলাদেশে আরচারি ফেডারেশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেশ আগে। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোমান সানার আগে খুব বড় কোনো সাফল্য আসেনি। কেবল আরচারিতে কেন, খুব কম ইভেন্টেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য আছে বাংলাদেশের। ক্রিকেটে এশিয়ান গেমসে সোনার পদক আছে। শুটিংয়ে সোনার পদক আছে কমনওয়েলথ গেমসে। দাবায় গ্র্যান্ডমাস্টার আছে আমাদের। এবার আরচারিতেও আন্তর্জাতিক সাফল্য আসছে নিয়মিত। আরচারির সোনার ছেলে এখন রোমান সানা। যার চোখে বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখছে, প্রথম অলিম্পিক পদক জয়ের।

রোমান সানা এখন বাংলাদেশে জাতীয় বীরে পরিণত হয়েছেন। গত কয়েক বছর ধরেই চোখ ধাঁধানো সাফল্য পাচ্ছেন দেশসেরা এই আরচার। খুলনার ছেলে তিনি। কয়রাতে তার গ্রামের বাড়ি। বাবা চাকরিজীবী আবদুল গফুর সানা এবং গৃহিণী মা বিউটি বেগমের ২ ছেলে ও ১ মেয়ের মধ্যে সবার ছোট রোমান। ১৯৯৫ সালের ৮ জুন খুলনায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। খুলনায় শিশু মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় ওই স্কুলের সহ-সভাপতি হাসান স্যারের অনুপ্রেরণায় বিকেএসপির এক যুব প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে অংশগ্রহণ করেন রোমান সানা। এটা ২০০৮ সালের কথা। খুলনায় বিকেএসপির এক সপ্তাহের ক্যাম্প ছিল। হাসান স্যার রোমানকে আরচারি খেলা সম্পর্কে ধারণা দেন এবং সেই ক্যাম্পে ট্রায়াল দিতে উৎসাহিত করেন। তার কথা শুনে ট্রায়াল দেন রোমান এবং প্রথমবারেই টিকে যান! কিন্তু এরপরই হয় ঝামেলা। ট্রায়ালের চূড়ান্ত পর্বে যোগ দেওয়ার আগে বিষয়টি জানতে পেরে বেঁকে বসেন রোমানের মা-বাবা। বিকেএসপিতে যাওয়ার ব্যাপারে তাদের ঘোর আপত্তি। কিছুতেই ছেলেকে সেখানে যেতে দেবেন না। তবে অনেক বোঝানোর পর রাজি হন তারা। সেখান থেকেই ইতিহাসের শুরু। বিকেএসপির প্রশিক্ষণের পর কঠোর সাধনায় একের পর এক সফলতার সিঁড়ি বেয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন রোমান সানা। রোমান সানা এ বছর দুবার বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছেন। গত জুনে ২০২০ সালের টোকিও অলিম্পিকে খেলার যোগ্যতা অর্জনের তিন মাসের মধ্যে আরেকটি সাফল্য পেয়েছেন রোমান। ১৩ সেপ্টেম্বর ফিলিপিন্সের ক্লার্ক সিটিতে এশিয়া কাপ ওয়ার্ল্ড র‌্যাঙ্কিং টুর্নামেন্টের (স্টেজ-৩) রিকার্ভ পুরুষ এককে সোনার পদক জয় করেন তিনি। রিকার্ভ পুরুষ এককের ফাইনালে চীনের সাই  হেংকিকে ৭-৩ সেট পয়েন্টে পরাজিত করেন ২৪ বছর বয়সী রোমান সানা। পাশাপাশি দলীয় ইভেন্টেও সাফল্য পেয়েছেন। ১৯৮৬ সালে সিউল এশিয়ান গেমসে বক্সিংয়ে মোশাররফ হোসেনের ব্রোঞ্জ জয়ের পর এতদিন এশীয় পর্যায়ে আর কোনো ব্যক্তিগত পদক ছিল না বাংলাদেশের। রোমান ব্যর্থতার এই ধারা থেকে বের হয়ে নতুন ইতিহাস গড়ে জিতেছেন সোনার পদক। আগামী বছর জাপানের টোকিওতে বসতে যাচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও মর্যাদার ক্রীড়া আসর অলিম্পিক গেমস। বৃহৎ এই মঞ্চে বাংলাদেশ থেকে দুজন ক্রীড়াবিদ সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। একজন আরচার রোমান সানা। অপরজন গলফার সিদ্দিকুর রহমান। গত জুন মাসে হল্যান্ডে বসেছিল আরচারি বিশ্বকাপ। সেখানে রোমান সানা সেমিফাইনালে খেলেছেন বিশ্বের ৯২টি দেশের ২০০ প্রতিযোগীর সঙ্গে লড়াই করে। সেমিফাইনালে মালয়েশিয়ার খাইরুল আনোয়ারের কাছে হেরে গেলেও গলফার সিদ্দিকুর রহমানের পর সরাসরি টোকিও অলিম্পিকে খেলা নিশ্চিত হয় রোমানের। শেষ চারে হারলেও কোটা প্লেস পেয়ে ২০২০ সালের টোকিও অলিম্পিকে খেলার সুযোগ হয় তার। সেমিতে হারের পর তৃতীয় স্থান অর্থাৎ ব্রোঞ্জের লড়াইয়ে বিশ্বের ছয় নম্বর তারকা ইতালির মাউরো নেসপোলিকে পরাজিত করেন রোমান সানা। এর মধ্য দিয়ে বিশ্ব আরচারিতে দেশকে এনে দেন প্রথম পদক। অবশ্য রোমান সানা বিদেশের মাটিতে এর আগে আরও দুটি সোনার পদক জিতেছেন। ২০১৪ সালে প্রথম এশিয়ান আরচারি গ্রান্ড প্রিক্স ও ২০১৭ সালে কিরগিজস্তানে আন্তর্জাতিক আরচারি টুর্নামেন্টে। লক্ষ্য এবার অলিম্পিকে সোনার পদক জয়। যে ধারাবাহিক খেলাটা খেলে চলেছেন তা ধরে রাখতে পারলে অলিম্পিকেও সফল হওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। রোমান সানা বলেন, ‘এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে অলিম্পিকে পদক জয় করা সম্ভব। আমি এ লক্ষ্যেই নিজেকে প্রস্তুত করব।’ এশিয়া কাপের সোনার পদক দেশের মানুষকে উৎসর্গ করা রোমান সানা ক্যারিয়ারের শুরুর দিকটা স্মরণ করতে গিয়ে বলেন, ‘প্রথম যখন আরচারিতে আসি, তখন ইমদাদুল হক মিলন ভাই, শেখ সজীব ভাইকে দেখে অনুপ্রাণিত হই। জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে তারা যখন সোনার পদক জিততেন, আমিও চাইতাম। পরে তো জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সোনার পদক জিতেছি।’ তবে অলিম্পিকের আগে চলতি বছরের শেষের দিকে নেপালে হতে যাওয়া এসএ গেমসে পাখির চোখ রোমানের, ‘এসএ গেমসে এখনো আমরা সোনার পদক পাইনি। আপাতত মূল লক্ষ্য এখানে সোনার পদক জয় করা।’ তবে আরচারিতে ভালো করা খুব কঠিন। তিনি বলেন, ‘আরচারি এমন একটা খেলা, যেখানে নিজের সেরাটা দেওয়ার পাশাপাশি ভাগ্যের পরশও লাগে। তবেই সফল হওয়া যায়।’ ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৬ সাল। টানা তিন বছর জাতীয় আরচারি চ্যাম্পিয়নশিপে সোনার পদক জয়ের কৃতিত্ব আছে রোমানের। এমন কৃতিত্ব আর কোনো আরচারের নেই। ২০১৪ আসরে রোমান ৩৩৫ পয়েন্ট স্কোর করে ভেঙে দেন ইমদাদুল হক মিলনের ২০১০ সালে গড়া ৩৩৩ পয়েন্টের জাতীয়  রেকর্ড। তার এই রেকর্ড এখনো অটুট আছে।

বাংলাদেশে এখন জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে এক নম্বর খেলা ক্রিকেট। একেকটা ম্যাচ দেখার জন্য লাখো মানুষ টিকিটের পেছনে লাইন ধরে। রোদ-বৃষ্টি-ঝড় উপেক্ষা করেও মাঠে হাজির হয়। তবে ক্রিকেট কেবল দর্শকদের বুকই ভেঙেছে। আশা জাগিয়েও কাঁদিয়েছে। বিপরীত দিকে আরচারিতে রোমান সানা একের পর এক সফলতার সিঁড়ি বেয়ে ওপরের দিকেই উঠছেন।


আপনার মন্তব্য