Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper

শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১ নভেম্বর, ২০১৯ ২০:৫৩

সিন্ধুকন্যা গোয়া

জয়শ্রী ভাদুড়ী, গোয়া (ভারত) থেকে ফিরে

সিন্ধুকন্যা গোয়া

আরব সাগরের আরেক নাম সিন্ধু সাগর। এই সাগর ঘেঁষে পাহাড়ের ঢাল ছুঁয়ে গড়ে উঠেছে গোয়া শহর। একসময় সমুদ্রপথে জাহাজ ভাসিয়ে আসে পর্তুগিজরা। সওদা করতে এসে এই জনপদে বসতি স্থাপন করে তারা। এরপর প্রায় ৪০০ বছর ধরে এই স্বর্গরাজ্য শাসন করে।

 

এবার প্রথমবারের মতো গোয়ার এই সমুদ্র সৈকতে টিভিএস কোম্পানি আয়োজন করেছিল টিভিএস রেসিং মটোসোল ২০১৯। বাইকপ্রেমীদের এই আসর ছিল আমার গন্তব্য। কাকডাকা ভোরে ঢাকার হজরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যাত্রা শুরু করলাম। উড়োজাহাজের ছোট্ট জানালার কাচ গলে ঠিকরে পড়ল প্রথম আলোকরশ্মি। ৩৫ মিনিট পরেই পৌঁছে গেলাম কলকাতা নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। এরপর অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট ধরে রওনা হলাম গোয়ার পথে। প্রায় ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট পরে পৌঁছলাম গোয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। আমাদের জন্য গাড়ি ঠিক করে রেখেছিলেন টিভিএস মটোসোলের আয়োজকরা। বিমানবন্দর থেকে হোটেলের পথে অভ্যর্থনা জানাল সবুজ পাহাড়। লাল মাটির বুক চিরে আকাশ ফুঁড়তে চাওয়া নারিকেলের শাখা দিল মৃদু বাতাস। কিন্তু দুচোখ তৃষিত হয়ে আছে সমুদ্র দর্শনের অপেক্ষায়। পর দিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে হোটেলের বেলকুনিতে দাঁড়াতেই চোখ জুড়িয়ে দিল দূর পাহাড় থেকে উড়ে আসা সফেদ বকের সারি। ঢাকাতেও আমার ঘুম ভাঙে পাখির কিচিরমিচিরে। আকস্মিক এই দৃশ্যপট যেন সুন্দর দিনের বার্তা দিয়ে গেল। শহরের অদূরে সমুদ্র আর পাহাড়ের ঠিক মাঝখানে তাঁবু টাঙিয়ে বাহারি পতাকা উড়িয়ে তৈরি করা হয়েছে টিভিএস মটোসোল ২০১৯-এর ভেন্যু। বিশাল কর্মযজ্ঞ দেখে চোখ কপালে ওঠার অবস্থা। শত শত মোটরসাইকেল। বাইক রেসারদের এ যেন স্বর্গরাজ্য। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছে বাইকাররা। বাংলাদেশ থেকেও অংশ নিয়েছে বাইকারদের একটি দল। ভাগাতোরের নিরিবিলি জায়গা হিলটপজুড়ে তখন শুধু বাইকের ভ্রুম ভ্রুম আওয়াজ।

 

অনুষ্ঠানে টিভিএস মোটর কোম্পানির সহব্যবস্থাপনা পরিচালক সুদর্শন বেনু বলেন, ‘মোটরসাইকেলপ্রেমীদের জন্য ১৯৮২ সাল থেকে টিভিএস রেসিং ব্র্যান্ডটি চালু করা হয়েছে। এরপর থেকে আমরা ব্যাপক সাড়া পেয়েছি।  এ জন্য বাইকের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অনন্য অনুষঙ্গও রেখেছি আমরা এই আয়োজনে।’ কথার মাঝেই ভেসে আসছে রেসিং বাইকের হুঙ্কার। এগিয়ে গিয়ে দেখা যায় পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বাইক নিয়ে নেমে আসছেন গতি মানবেরা। চলছে দারুণ প্রতিযোগিতা।

 

অনুষ্ঠানের বিরতিতে সমুদ্র খুঁজতে রওনা হলাম আমরা তিন গণমাধ্যমকর্মী। চারদিকে ছোট-বড় গাছ, অচেনা পাখি, লজ্জাবতীর শাখা-প্রশাখা। পথের ধারে ভাঙা বাড়ির ছাদে দেখা মিলল এক জোড়া ময়ূর-ময়ূরীর। আরেকটু এগিয়ে যেতেই কানে ভেসে আসছে সমুদ্রের গর্জন। কিন্তু কাছে পিঠে নামার রাস্তা খুঁজে পাচ্ছি না। সমুদ্র মানুষকে ডাকে জানি কিন্তু এ ডাক এড়িয়ে যাওয়া সত্যিই অসম্ভব। অবশেষে সিঁড়িপথের মুখে দাঁড়াতেই ঝড়ো বাতাস আর উছলে ওঠা ঢেউ মন ভিজিয়ে দেয়। খাড়া পথ ভেঙে বালিতে নামতেই পায়ের পাতা চুমে যায় আরব সাগরের শীতল জলরাশি। হাত বাড়িয়ে আমিও এগিয়ে গেলাম সমুদ্র পানে। ফলশ্রুতিতে আধাভেজা জামাকাপড়ে ফিরতে হলো অনুষ্ঠান স্থলে। আমরা যে সৈকতে গিয়েছিলাম তা বেশ নিরিবিলি। ‘লাকি বিচ’ নামের এই সৈকতটি দেখলে মনে হবে পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে আড়মোড়া ভাঙছে সমুদ্র। এই বামপাশের রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলে রয়েছে নাম না জানা অসংখ্য সৈকত। পরের দিন অনুষ্ঠানের ফাঁকে সমুদ্র খুঁজতে গিয়ে দেখা মিলল গির্জার। গোয়ায় কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই গির্জাগুলো। পাশ দিয়ে নেমে যাওয়া গলিপথে গিয়ে পেলাম ‘ভাগাতোর বিচ’। দুপুরের খাওয়া সেরে আমরা বের হলাম গোয়ার দর্শনীয় স্থান আর অসাধারণ সমুদ্র সৈকত ঘুরে দেখতে। গোয়া ঘুরে দেখতে সবচেয়ে সস্তা এবং সহজলভ্য বাহন হলো স্কুটার। ১২ ঘণ্টায় ২৫০ রুপি দিয়ে ভাড়া নেওয়া যায় স্কুটার। তেল কিনে নিয়ে ইচ্ছামতো ঘুরে বেড়ানো যায়। ট্যাক্সি ভাড়া অনেক বেশি গোয়ায়। গোয়াকে বলা যায় সৈকতের শহর। প্রতিটি সৈকত চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে রেখেছে। গোয়ার অন্যতম ব্যস্ত সমুদ্র সৈকত বাগা বিচ। এখানে চাইলেই উপভোগ করা যায় ওয়াটার স্কি, জেট-স্কি, প্যারাসাইক্লিং, বোট রাইড, ওয়াটার স্কুটার-রাইডসহ আরও অনেক কিছু। সৈকতের পাশে আছে অসংখ্য সি ফুড রেস্টুরেন্ট। বাতাসে ভেসে আসা সামুদ্রিক মাছের বাহারি পদের গন্ধ নাক দিয়ে ঢুকলে আপনার ক্ষুধার উদ্রেক হবেই। কালাংকুট বিচেও প্রচুর খাবারের দোকান রয়েছে। কয়লায় পোড়ানো ভুট্টার ওপরে মসলা আর লেবুর স্বাদ এখনো জিহ্বায় লেগে রয়েছে। তবে এখানে খাবার থেকে শুরু করে কাজুবাদাম সবকিছুরই দাম অনেক বেশি। গোয়ার মানুষ আন্তরিক হলেও ব্যবসাটা ভালোই বোঝে। তাই দাম দর না করলে ছোট্ট কানের দুল কিনেও ঠকতে হবে।

 

বাগাবিচ ঘুরে এবার গেলাম কোকোবিচে। এখানে নৌকায় চড়ে সাগরের কিছুটা ভিতরে গেলে নাকি ডলফিন দেখা যায়। ডলফিন দেখার আশায় মাথাপিছু ১৫০ রুপি দিয়ে টিকিট কেটে উঠে বসলাম নৌকায়। যেতে যেতে নৌকার মাঝি আমাদের দেখাচ্ছিলেন এক আন্ডারওয়ার্ল্ড ডনের বাড়ি। সঙ্গে আওড়ে যাচ্ছিলেন আশপাশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। নৌকার বাঁক ঘুরতেই দেখা মেলে গোয়ার মাটির নিচের জেলখানার। এখানে অবশ্য আর কয়েদি রাখা হয় না। তবে অনেক বিখ্যাত ছবির শুটিং হয়েছে এই জেলখানায়। কান খোলা রেখে মাঝির গল্প গিললেও চোখ শুধু খুঁজছে ডলফিনকে। এদিকে আকাশে ঘনমেঘ দানা বেঁধে উঠছে। এই দুদিনেই গোয়ার বৃষ্টি সম্বন্ধে আমাদের অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে। যখন-তখন এসে আপনাকে ভিজিয়ে দিতে কার্পণ্য করবে না। যমুনা পাড়ের মানুষ হলেও আরব সাগরের উত্তাল ঢেউ বুকে কাঁপন জাগায়। চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছে। কিন্তু ডলফিনের দেখা না পাওয়ায় মনে হচ্ছে আমার এই গোয়া ভ্রমণই যেন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। মনের কথা কীভাবে সমুদ্রের গভীরে পৌঁছাল জানি না। তবে ভাবনায় চির ধরে সবার চিৎকার। সামনে লাফিয়ে চলছে ডলফিন। সাগরের নীল পানির কালচে ডলফিনকে ক্যামেরায় ধারণ করা জটিল হলেও মন ভরে উপভোগ করে দেখলাম তাদের ছোটাছুটি করার দৃশ্য। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলাম ‘গোয়া ভ্রমণ কিছুটা হলেও স্বার্থক হলো।’


আপনার মন্তব্য