শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৫ নভেম্বর, ২০১৯ ২১:২০

আমির হোসেনের যত উদ্ভাবন

আবদুর রহমান টুলু, বগুড়া

আমির হোসেনের যত উদ্ভাবন

বয়স বাড়ছে আর বাড়ছে আমির হোসেনের উদ্ভাবনী ভাবনা। যেন বিজ্ঞানের শাখা-প্রশাখায় আরও মজবুত আসন গেড়ে চলেছেন। বগুড়ার কৃষিকাজে ব্যবহৃত এমন অনেক কিছুই তিনি উদ্ভাবন করেছেন। রাতদিন কামারশালায় মত্ত থেকে তিনি এই উদ্ভাবনী করে চলেছেন। এ পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন গবেষণা করে অর্ধশতাধিক যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বগুড়া শহরে আবদুল জোব্বারের পরিচিতি ছিল ‘ধলু মেকার’ নামে। কামারশালায় গরম লোহা পিটিয়ে বিকল যন্ত্র সারাতেন তিনি। প্রয়োজনমতো ছোট ছোট যন্ত্রাংশ তৈরিও করতেন। যন্ত্র সারাইয়ে আবদুল জোব্বারের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। গত শতকের চল্লিশের দশকে তিনিই বগুড়া শহরের নিউমার্কেট এলাকায় হস্তচালিত একটি লেদ মেশিন স্থাপন করেন। সেখানেই তৈরি করতে থাকেন কৃষিকাজের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। বাবা আবদুল জোব্বারের সেই কারখানায়ই হাতেখড়ি হয়েছিল ছেলে আমির হোসেনের। কে জানত, কামারশালায় গরম লোহা পিটিয়ে যন্ত্র তৈরি করা শেখা সেই আমির হোসেনই একদিন উদ্ভাবক হবেন। ৫৯ বছর বয়সে এসেও আমির হোসেন নবতর উদ্ভাবনে মত্ত আছেন।

বগুড়া শহরের কাটনারপাড়া এলাকার যন্ত্র উদ্ভাবক আমির হোসেন জানান, তিনি বাবা আবদুল জোব্বারের সঙ্গে কাজ শুরু করেছিলেন ১৯৬৭ সালে। স্কুলে সবে পা রেখেছেন। বাড়ির পাশে করোনেশন ইনস্টিটিউশনে ক্লাস শেষে ছুটতেন বাবার সারাই কারখানায়। বাবার কাজে সহযোগিতা করতেন। ১৯৭৮ সালে এসএসসি পাস করেন। ভর্তি হন বগুড়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে। ততদিনে তার বাবার কারখানায় কাজের চাপ বেড়ে গেছে। পরিবারের আর্থিক অবস্থার কথা চিন্তা করে পড়াশোনা ছাড়তে হয় আমির হোসেনকে। সারাই কারখানাই তখন তার ধ্যানজ্ঞান হয়ে যায় তখন। তিনি দাবি করেন বলেন, বাবার কামারশালায় বসেই গরম লোহা পিটিয়ে শ্যালোযন্ত্রের পিস্টন, লাইনার, বুশ ভাল্বসহ নানা কৃষি যন্ত্রাংশ বানাতে থাকেন আমির হোসেন। ততদিনে বগুড়ায় বিদ্যুৎচালিত লেদ মেশিন এসেছে। কৃষি যন্ত্রাংশের পাশাপাশি পানি তোলার জন্য সেন্ট্রিফিউগাল পাম্প তৈরি করেন আমির হোসেন।

আমির হোসেন বলছিলেন, ‘১৯৮২ সালে বিয়ে করেন আলম আরা বেগমকে। বিয়ের পর স্ত্রীর সহযোগিতায় শুরু করেন কৃষি যন্ত্রাংশের ব্যবসা।’ দুটি ঢালাই কারখানা এবং দুটি লেদ ওয়ার্কশপের সঙ্গে চুক্তি করলেন। বাকিতে কৃষি যন্ত্রাংশ কিনে সারা দেশে সরবরাহ শুরু করলেন। ছয় মাস পর নিজেই পাম্প তৈরির কারখানা দিলেন।

আমির হোসেনের কারখানা থেকে একে একে তৈরি হলো চিকন সেমাই ও নুডলস তৈরির যন্ত্র, ইট ও পাথর ভাঙার যন্ত্র, ইট তৈরির অত্যাধুনিক যন্ত্র, মাছের ও মুরগির খাদ্য তৈরির যন্ত্র, ভুট্টা ভাঙা ও মাড়াইয়ের যন্ত্র, প্লাস্টিক পাইপ তৈরির যন্ত্র, গো-খাদ্যের যন্ত্র, পাটের ছাল ছাড়ানোর যন্ত্র, জ্বালানিবিহীন মোটরযান এবং উড়ন্ত গাড়ি, বিনোদন পার্কের রাইড, ডিশ অ্যান্টেনা, ধান-আখ-গম মাড়াই যন্ত্র, বীজ বপন যন্ত্র, খোয়া-সিমেন্ট-বালু মেশানোর যন্ত্র, ধান কাটার যন্ত্র, বিস্কুট বানানোর যন্ত্র, অটোরিকশা, ভটভটি, গুটি ইউরিয়ার যন্ত্র, আলু উত্তোলন ও গ্রেডিং যন্ত্র, চাল গ্রেডিং যন্ত্র, রাইস পলিসার, অটোক্র্যাশার, অটো মিক্সচার, চিঁড়া-মুড়ি ভাজার যন্ত্র, ধানের খড় ও শুকনা ভুট্টার গাছ থেকে গো-খাদ্য তৈরির স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রসহ লেদ কারখানায় ব্যবহারযোগ্য অর্ধশতাধিক যন্ত্র। আমির হোসেন বললেন, ‘চীনের তৈরি অত্যাধুনিক ইটভাঙা যন্ত্রের আদলে ঘণ্টায় ২ হাজার ইট ভাঙার ক্ষমতাসম্পন্ন একটি যন্ত্র উদ্ভাবন করেন তিনি। এসব তৈরি করার জন্য ২০০৪ সালে তাকে ‘রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং’ ডিগ্রি প্রদান করেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। এছাড়াও বেশকিছু প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিকভাবে তাকে সম্মাননা প্রদান করে।

২০০৬ সালে আমির হোসেনের উদ্ভাবিত একটি প্রচলিত জ্বালানিবিহীন গাড়ির খবর ছাপা হয়েছিল দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে। ২০০৮ সালে চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র) আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি মেলায় আমিরের সেই গাড়িটি প্রদর্শন করা হয়। সেবার সরকারিভাবে তিনি পুরস্কার অর্জন করেন।

যন্ত্র উদ্ভাবনকারী আমির হোসেন বলেন, এ দেশের মাটিতে বছরের পর বছর ধরে এত কষ্টে উদ্ভাবন করেছি, সেই যন্ত্রের কৃতিত্ব নেবে অন্য দেশ, সেটা মানতে পারিনি। সে কারণে দেশের বাইরে কোনো উদ্ভাবন বিক্রি করেননি। দেশের মানুষের উপকারে আসে বিশেষ করে কৃষিকাজের জন্য তিনি সবসময় উদ্ভাবনীমূলক কাজ করে যাবেন।


আপনার মন্তব্য