শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২০ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ মার্চ, ২০২১ ২২:০৯

অদম্য কামরুলের লড়াই

একটি দুর্ঘটনায় দুই হাত হারান ফরিদপুরের গেরদা ইউনিয়নের পূর্ব কাফুরা গ্রামের কামরুল হাসান (৩৫)। দুই হাত হারালেও থেমে থাকেননি তিনি। কারও কাছে হাত পাতবেন না কিংবা ভিক্ষা করে সংসার চালাবেন না এমন জেদ করেই তিনি এখন কম্পিউটার চালানোসহ নিত্যনৈমিত্তিক সব কাজ করছেন। দুই হাত হারালেও দুই পায়ের ওপর ভরসা করে জীবন- জীবিকার যুদ্ধে নেমেছেন তিনি।

কামরুজ্জামান সোহেল, ফরিদপুর

অদম্য কামরুলের লড়াই

ফরিদপুর সদর উপজেলার গেরদা ইউনিয়নের পূর্ব কাফুরা গ্রামের রিকশাচালক শেখ আইয়ুব আলীর চার ছেলে- মেয়ের মধ্যে কামরুল হাসান সবার বড়। অভাবের কারণে পড়ালেখা করতে পারেননি বেশি। দুই হাত না থাকলেও পা দিয়েই চলছে অদম্য কামরুলের পথচলা। বিভিন্ন সময় অন্যের জমিতে কাজ করেই বাবা-মায়ের সংসারের খরচ মেটাতেন। একসময় ইলেকট্রিক মিস্ত্রির কাজ শিখে নেন। এলাকায় তখন তাঁর বেশ নামডাক। বিদ্যুতের কোনো কাজ হলেই ডাক পড়ত কামরুলের। ফলে অল্প দিনেই কামরুল সবার পরিচিত হয়ে ওঠেন। যার কারণে বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কামরুলের সম্পর্ক তৈরি হয়। সেই সুবাদে এলাকায় বিদ্যুতের সমস্যা হলে কামরুল অফিসের পরামর্শে তা দেখাশোনা করতেন। এমনি একটি কাজ করতে গিয়ে পাঁচ বছর আগে বাখুন্ডা খালেক বাজারের আতা মেম্বারের বাড়ির সামনে দুর্ঘটনায় পতিত হন তিনি। সেদিনের ভয়াবহ ঘটনার বর্ণনায় কামরুল জানান, পাঁচ বছর ধরে বিদ্যুতের কাজ করে বেশ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। ২০১৮ সালের ১৫ আগস্ট বিকালে এলাকার বৈদ্যুতিক লাইন খারাপ হলে অফিস থেকে তা চেক করার কথা বলা হয়। অফিসের কথামতো তিনি ১১ কেভি লাইনের ওপর মই নিয়ে উঠেন। অফিস থেকে বারবার তাঁকে বলা হয় ‘লাইন অফ’ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ লাইনের তার পরীক্ষা করার সময় কামরুল বুঝতে পারেন তিনি বিদ্যুতায়িত হয়েছেন। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাঁর দুই হাত পুড়তে থাকে। কিছুক্ষণ পর মাটিতে পড়ে যান। এরপর তাঁর আর কিছু মনে নেই। পরে স্থানীয়রা ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। কেটে ফেলা হয় দুই হাত। ১ মাস ১৪ দিন হাসপাতালে থাকার পর কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। বাড়িতে তিন মাস চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন। চিকিৎসা করাতে গিয়ে ব্যয় হয় অনেক টাকা। সেই টাকা জোগাড় হয় বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ ও কয়েক জনের কাছ থেকে ধার নিয়ে। ঋণের টাকা শোধ এবং সংসারের খরচ মেটাতে কামরুল নেমে পড়েন কিছু একটা করতে। দুই হাত হারিয়ে একেবারেই দমে যাননি কামরুল। গ্রামের অনেকেই কামরুলকে টাকা দিয়ে সাহায্য করতে চেয়েছেন। কিন্তু কারও কাছে হাত পেতে ভিক্ষা করে নয়, নিজের যোগ্যতায় কিছু করার পণ নিয়ে মুদি দোকান দেন। শিখেন কম্পিউটার। পায়ের ওপর ভরসা করেই কম্পিউটার ও মোবাইল চালানোর কাজ করছেন। শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়লেও কারও অনুকম্পা চাননি কামরুল। এখন তিনি পা দিয়েই সব কাজ করছেন। দোকানের মালামাল বিক্রি করা থেকে শুরু করে মোবাইল ফোনে রিচার্জ করা, সিম বিক্রি, বিকাশ করার কাজ করছেন দক্ষতার সঙ্গে। কামরুল হাসান জানান, তাঁর মুদি দোকানটিতে তিনি নিজেই বেশির ভাগ সময় বসেন। সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দোকান করেন তিনি। মাঝেমধ্যে তাঁর স্ত্রী তাঁকে সাহায্য করেন। বর্তমানে দোকানের আয় দিয়েই চলছে সংসার।  তাঁর মেয়েটি প্রতিবন্ধী। বিত্তবানদের কাছে সাহায্যের আর্তি জানান কামরুল।


আপনার মন্তব্য