নেই বাহারি সাজসজ্জা। নেই আধুনিক দোকানের ঝকঝকে পরিবেশ। জীর্ণ-শীর্ণ ছোট একটি ঘর। সেখানেই প্রায় এক শতাব্দী ধরে চলছে দধি, চিড়া, ঘোল, ছানা আর মাখনের বেচাকেনা। বরিশাল নগরীর হেমায়েতউদ্দিন (গির্জা মহল্লা) রোডের এ দধিঘর শুধু একটি খাবারের দোকান নয়, এটি বরিশালের ঐতিহ্য ও স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতিদিন সকাল থেকেই ক্রেতাদের ভিড় জমতে থাকে। কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে কাঁসার বাটিতে দধি-চিড়া খেতে অপেক্ষা করেন ধৈর্য নিয়ে। দোকানের ভিতরে সারি দিয়ে কয়েকটি চেয়ার, এক পাশে ছোট্ট ক্যাশ কাউন্টার। দেয়ালে ঝুলছে শতবর্ষী রেডিও আর ঘড়ি। কাঠের শোকেসে সাজানো মাটির হাঁড়িতে দধি, টিনের কৌটায় মুড়ি। সামনেই ধান সিদ্ধ করার পুরোনো টিনের পাত্রে রাখা কাঁসার বাটি সেখানেই ধোয়া ও পরিবেশন সব কাজ সম্পন্ন হয়। এই সরল ব্যবস্থাপনাই যেন এ দোকানের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। দোকানের পেছনেই রয়েছে হেঁশেল। চুলার ওপর বড় বড় ডেগে ফুটছে দুধ। নিভু নিভু আগুনে ধীরে ধীরে ঘন হচ্ছে দুধ। তৈরি হচ্ছে দধি, ছানা, ঘি, মাখন আর ঘোল। এই কাজে ব্যস্ত ৬৮ বছর বয়সি কারিগর জাহাঙ্গীর হোসেন। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে তিনি এই দোকানেই তৈরি করছেন দই ও দুগ্ধজাত খাবার। জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, প্রতিদিন ছয় থেকে সাত মণ দুধ দিয়ে দধি ও ছানা তৈরির কাজ শুরু হয়। দুপুর ১২টায় দুধ জ্বাল দেওয়া শুরু করে বিকাল ৫টা পর্যন্ত তা ঘন করা হয়। এরপর দই বীজ দিয়ে ডেগে রেখে পাটের বস্তা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় নিভন্ত চুলার ওপর। রাত পেরিয়ে সকাল হলেই তৈরি হয় জমাট বাঁধা খাঁটি দই। সেই দই দিয়ে বেচাবিক্রি হয় দিনভর। এখানে কোনো বাসি দই রাখা হয় না। প্রতিদিন টাটকা দধি তৈরি করাই এ দোকানের নিয়ম। স্বাদের টানেই ৩০ বছর ধরে নিয়মিত আসেন ক্রেতা জিয়াউল হক। তিনি বলেন, ‘এখানকার দধি-চিড়ার স্বাদ অতুলনীয়। পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। তাই তৃপ্তি নিয়ে খেতে পারি। বরিশালে দধি খেতে হলে প্রথম পছন্দ এই দোকান।’ দধি ঘরের যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রায় ৯৫ বছর আগে। প্রতিষ্ঠাতা বাবা-দাদার হাত ধরে শুরু হওয়া এ ব্যবসা পরবর্তীতে দাদা, বাবা-চাচা পেরিয়ে এখন চতুর্থ প্রজন্মের হাতে। বর্তমান উত্তরসূরি মাহমুদুল হাসান রাহিদ বলেন, ‘৩০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে দধি, চিড়া, মুড়ি, ঘোল, ছানা ও মাখন বিক্রি করা হয়। লাভ আগের মতো না হলেও চার পুরুষের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতে মানের সঙ্গে কোনো আপস করিনি।’ সময়ের সঙ্গে শহর বদলেছে, মানুষের রুচি বদলেছে, আধুনিক খাবারের দোকান গড়ে উঠেছে। তবুও নিজের জায়গায় অবিচল দাঁড়িয়ে আছে বরিশাল দধিঘর। বাহ্যিক চাকচিক্য নেই, কিন্তু রয়েছে শতবর্ষের বিশ্বাস আর স্বাদের ঐতিহ্য।