► উচ্চতা মাত্র দুই ফুট। বয়স ৪২। জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সঙ্গী। তবুও থেমে যাননি সিজার। তার ভিতর লুকিয়ে আছে অদম্য এক মন, যা প্রতিদিন নতুন করে জীবনযুদ্ধের সাহস জোগায়।
► তার একমাত্র চাওয়া, একটি ব্যাটারিচালিত হুইলচেয়ার। এই একটি সহায়তাই তার চলাচলকে করবে নিরাপদ, জীবনকে করবে অনেকটাই সহজ
মেহেরপুর সদর উপজেলার পিরোজপুর গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে সিজার। চলাচলের জন্য তার সম্বল একটি ছোট বিয়ারিং লাগানো ঠেলাগাড়ি। এক হাতে গাড়ি ঠেলে, অন্য হাতে ভারসাম্য রেখে গ্রামের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত করেন তিনি। এই দৃশ্য গ্রামের মানুষের কাছে পরিচিত, আবার বেদনাবিধুরও। প্রতিদিনের জীবনযাপন নিজ দায়িত্বেই সামলান সিজার। মসজিদে গিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়, হাটেবাজারে যাতায়াত, কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে ওষুধ আনা কিংবা বিকালে চায়ের দোকানে বসে সবার সঙ্গে আড্ডা সবই করেন নিজ চেষ্টায়। প্রতিবন্ধকতা তাকে কারও বোঝা করে তুলতে পারেনি। ঘরের কাজেও তিনি স্বনির্ভর। রান্নাঘর গোছানোসহ ব্যক্তিগত সব কাজ নিজেই করেন। তার জীবন যেন নীরবে বলে দেয় মানুষ বড় হয় শরীরের উচ্চতায় নয়, বড় হয় মানসিক শক্তিতে। তবে এই শক্ত জীবনের আড়ালে জমে আছে প্রতিদিনের কষ্ট। ঠেলাগাড়ি ঠেলতে গিয়ে প্রায়ই হাতে ক্ষত হয়। রাস্তায় পড়ে থাকা ময়লা শরীরে লেগে যায়। বর্ষায় কাদা, শীতে ঠান্ডা সবকিছু সহ্য করেই এগিয়ে চলতে হয় তাকে। সিজারের কোনো অভিযোগ নেই। নেই ভাগ্যের প্রতি কোনো ক্ষোভও। তার একমাত্র চাওয়া, একটি ব্যাটারিচালিত হুইলচেয়ার। এই একটি সহায়তাই তার চলাচলকে করবে নিরাপদ, জীবনকে করবে অনেকটাই সহজ। প্রতিবেশী রমজান হোসেন বলেন, ‘সিজার নিজের সব কাজ নিজেই করে। শুধু চলাফেরার সময় খুব কষ্ট হয়। একটি ব্যাটারিচালিত হুইলচেয়ার পেলে তার জীবন অনেক সহজ হয়ে যাবে।’ নিজের কথা বলতে গিয়ে সিজার বলেন, ‘আল্লাহ আমাকে যেভাবে বানিয়েছেন, আমি তা মেনে নিয়েছি। আমার কোনো কষ্ট নেই। শুধু চলাচলে সমস্যা হয়। তবে নিজের কাজ নিজেই সব করার চেষ্টা করি।’ সিজারের বাবা শহিদুল ইসলাম জানান, জন্মের পর থেকেই ছেলের শারীরিক জটিলতা ধরা পড়ে। উন্নত চিকিৎসার আশায় দেশবিদেশের চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হলেও কোনো স্থায়ী সমাধান মেলেনি। অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি থাকায় আর সে পথে এগোননি। গ্রামের সব বয়সি মানুষের কাছে সিজার ভালোবাসার মানুষ। তার হাসিমুখ, বিনয়ী আচরণ আর অদম্য মানসিকতা তাকে করেছে মানবিক অনুপ্রেরণার প্রতীক। তবে একটাই উদ্বেগ, বাবা-মা না থাকলে কে দেখবে তাকে? একটি ব্যাটারিচালিত হুইলচেয়ার এই সামান্য সহায়তাই বদলে দিতে পারে সিজারের প্রতিদিনের জীবনসংগ্রাম। সমাজের সহানুভূতিশীল মানুষের একটু সহযোগিতাই পারে এই সাহসী মানুষটির চলার পথকে সহজ করে দিতে।