বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা দক্ষিণ ডুমুরিয়া গ্রাম। এ গ্রামের একটি পাঠশালায় দোয়াতে ভরা কয়লার কালি, বাঁশের কঞ্চির কলম আর তালপাতার মাধ্যমে শিশুদের শিক্ষার হাতেখড়ি হয়। আধুনিক ডিজিটাল ইন্টারনেট প্রযুক্তির এই যুগে অলিক কল্পনা ভাবা হলেও ‘শিশু শিক্ষা নিকেতন’ নামের এই পাঠশালাটিতে শিশুরা গত ২১ বছর ধরে তালপাতায় অক্ষরচর্চা করছে। বর্তমানে ৫০ জন শিশু নিয়মিত এই পাঠশালায় পড়াশোনা করছে। আশপাশের অন্তত পাঁচটি গ্রাম থেকে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত এই পাঠশালায় পড়াশোনা করে। পাঠশালাটির একমাত্র শিক্ষক পন্ডিত কালিপদ বিশ্বাস।
তাঁর বয়স ৮০ বছর। এই বয়োবৃদ্ধ শিক্ষক এখনো নিজ হাতে ধরে শিশুদের তালপাতায় অক্ষর লেখার কৌশল শেখান। পন্ডিত কালিপদ বিশ্বাস বলেন, ‘স্থানীয়রা তাদের শিশুদের হাতের লেখা সুন্দর করাসহ গ্রামীণ ঐতিহ্য ধরে রাখতে ২০০৫ সালে এই পাঠশালাটি প্রতিষ্ঠা করি। শুরুতে কয়েকজন শিশু নিয়ে কার্যক্রম শুরু হলেও এখন অর্ধশতাধিক শিশু লেখাপড়া করছে। আমাদের সময় এভাবেই শিশুদের লেখাপড়া শুরু হতো। তালপাতায় লেখার চর্চা করলে হাতের লেখা সুন্দর ও পরিষ্কার হয়। শিশুরা মনোযোগী হয় এবং অক্ষর সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পায়। এখানে শিশুদের প্রথমে স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ শেখানো হয়। এরপর বানান, যুক্তাক্ষর, শতকিয়া, নামতা এবং ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়া হয়। দুই বছর এখানে পড়াশোনা শেষে শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির উপযোগী করে তোলা হয়।’ স্থানীয় বাসিন্দা সুকুমার মণ্ডল বলেন, ‘ডিজিটাল যুগে যখন শিশুরা স্মার্টফোন ও ট্যাবের মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করছে তখন আমাদের এই ছোট্ট গ্রামে তালপাতায় অক্ষরচর্চার মাধ্যমে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন এক প্রবীণ শিক্ষক। নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতার মাঝেও ঐতিহ্য ধরে রেখে শিক্ষার বীজ বপন করে চলেছে ‘শিশু শিক্ষা নিকেতন’।’ গ্রামীণ বাংলার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ শুধু শিক্ষারই নয়, বরং সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। স্থানীয় অভিভাবক সীতা রানী বলেন, ‘কালিপদ স্যার খুব যত্ন নিয়ে পড়ান। তিনি শুধু অক্ষর শেখান না, নৈতিক শিক্ষাও দেন। আমাদের সন্তানদের শৃঙ্খলা ও ভদ্রতা শেখান। তাই আমরা আনন্দের সঙ্গে সন্তানদের এখানে ভর্তি করি। প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মাসে ১৫০ টাকা নেওয়া হয়। এই সামান্য অর্থ দিয়েই তালপাতা সংগ্রহ, দোয়াতের কালি তৈরি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনা হয়।’ বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, ‘চিতলমারী উপজেলার ডুমুরিয়া দক্ষিণপাড়ার এই পাঠশালাটি আমাদের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। তালপাতায় শিক্ষা কার্যক্রম বর্তমান প্রজন্মকে আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। পাঠশালাটির অবকাঠামোগত উন্নয়নে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হবে।’