কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার গুণধর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এক গ্রামের নাম ‘মদন’। কৃষিপ্রধান গ্রামটিকে এখন অনেকেই চেনেন ‘পাটবীজ গ্রাম’ হিসেবে। উদ্যোক্তা আবু হানিফের হাত ধরে এখানে তৈরি হয়েছে শত শত নতুন উদ্যোক্তা। পাটবীজ উৎপাদনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছেন এখানকার কৃষক, সৃষ্টি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান।
অতীতে এই গ্রামে পাট চাষ হলেও মানসম্মত বীজের অভাবে মিলত না কাক্সিক্ষত ফলন। রোগবালাইসহ নানা কারণে হতাশ ছিলেন কৃষক। সেই চিত্র এখন আর নেই। পাটবীজকে ঘিরে নতুন স্বপ্ন দেখছে পুরো এলাকা। যার হাত ধরে এই পরিবর্তন, তার নাম আবু হানিফ। গবেষণালব্ধ এইচসি-৯৫ জাতের বীজ নিয়ে কাজ শুরু করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় গড়ে তুলেছেন সফল বীজ উৎপাদন ব্যবস্থা। এইচসি-৯৫ জাতের বীজে কৃষক বিঘাপ্রতি
পাচ্ছেন ১৬ মণ পাট; যেখানে প্রচলিত আমদানি করা ভারতীয় ভ্যারাইটিতে ফলন হয় ১০ থেকে ১২ মণ।
উদ্যোক্তা আবু হানিফ বলেন, ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি আমাদের বাপ চাচারা গতানুগতিক পাট চাষ করে আসছেন। বড় হয়ে চিন্তা করলাম কীভাবে উন্নত পাটবীজ সংগ্রহ করা যায়। সেই চিন্তা থেকেই তিনি ও তার বড় ভাই আবু নাঈম ২০১২ সালে কিশোরগঞ্জ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে এইচসি-৯৫ জাতটি সংগ্রহ করেন। সেই জাতটিই ছড়িয়ে দিচ্ছেন তারা। এখন গ্রামের পর গ্রাম এই জাতে ছড়িয়ে গেছে। উদ্যোক্তা হিসেবে ২০২৩ সালে জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছেন আবু হানিফ।
তবে আক্ষেপ করে আবু হানিফ বলেন, ১৯৯৫ সালে এইচসি-৯৫ জাতটি উদ্ভাবন হলেও সরকার এই জাতটি কৃষকের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বরং ভারত থেকে প্রতিবছর নিম্নমানের বীজ আমদানি করছে। এতে দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
এই জাতটি তিনি নিজে কীভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে আবু হানিফ বলেন, ২০১২ সালে কিশোরগঞ্জ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে এই জাতটি সংগ্রহ করে তারা দুই ভাই মিলে নিজেদের জমিতে চাষ করে সফলতা পেয়েছেন। পরে স্থানীয় কৃষককে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করে প্রথমে ব্যর্থ হন। পরে চ্যালেঞ্জ করে বিনামূল্যে এই বীজ কৃষককে দিয়েছেন। এভাবে পাশর্^বর্তী বিভিন্ন উপজেলায় নিজে বাইক চালিয়ে গিয়ে কৃষককে উদ্বুদ্ধ করে আসছেন। তার হাত ধরে দুইশত উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, উন্নত জাত থাকার পরও কেন সরকার প্রতি বছর ভারত থেকে নিম্নমানের জাত আমদানি করছে, সেটা বোধগম্য নয়। সরকারি উদ্যোগে এই জাতটি সম্প্রসারণের আওতায় আনা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং উৎপাদনও বাড়বে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
স্থানীয় কৃষক ওমর সিদ্দিক ও জিন্নত আলী বলেন, কেনাফ পাটের বীজ চাষ ধানের চেয়ে বেশি লাভজনক। এতে সেচ, সার ও শ্রমিক কম লাগে। বাজারেও চাহিদা ভালো।
কৃষক মোহাম্মদ সুকায়েত বলেন, আগে বীজ আনতে বা বিক্রি করতে অন্য জায়গায় যেতে হতো। এখন পাইকাররা সরাসরি আমাদের গ্রামে আসছেন। ফলে সময় ও খরচ কম লাগছে, লাভও বেশি হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষিশ্রমিক রতন মিয়া বলেন, আগে কাজের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেতে হতো। কেনাফ পাটবীজ চাষে এখন গ্রামেই কর্মসংস্থান হচ্ছে।
কিশোরগঞ্জ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, আবু হানিফের উৎপাদিত বীজের গুণগতমান খুব ভালো। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক তার বীজ নিচ্ছেন। তিনি সফল উদ্যোক্তা এবং তার মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে নতুন উদ্যোক্তা।
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. সাদিকুর রহমান বলেন, আবু হানিফের গ্রামটিকে এখন সবাই চেনেন পাটবীজ গ্রাম হিসেবে। তার হাত ধরে দুই শতাধিক উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিশোরগঞ্জকে পাটবীজের হাব হিসেবে গড়ে তোলা গেলে সারা দেশে বিশেষ পরিচিতি পাবে এবং পাটের উৎপাদন বাড়বে। এতে দেশের অর্থনীতিতেও অনুকূল প্রভাব পড়বে।