প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৩ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২২ মার্চ, ২০২১ ২১:৫৩

ক্যান্সার শনাক্তকরণ যন্ত্র

জুবায়ের মাহমুদ, শাবি প্রতিনিধি

ক্যান্সার শনাক্তকরণ যন্ত্র
Google News

বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ হচ্ছে ক্যান্সার। প্রধানত নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখের ওপর মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত। ক্যান্সার চিকিৎসা ও মানুষের শরীরে ক্যান্সার শনাক্তকরণের প্রচলিত পদ্ধতি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের মানুষের জন্য ব্যয়বহুল হিসেবে পরিচিত। তবে আশার কথা, ক্যান্সার শনাক্তকরণে খুব শিগগিরই স্বল্প খরচের একটি যন্ত্র তৈরি করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) একদল গবেষক। তারা ননলিনিয়ার অপটিকস ব্যবহার করে রক্তে ক্যান্সারের উপস্থিতি শনাক্ত করার প্রক্রিয়া উন্নয়ন করতে সমর্থ হয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় একটি যন্ত্র তৈরি করা হবে, যা দিয়ে অতি সহজে ও স্বল্প খরচে শরীরে ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে কি না এর পূর্বাভাস জানা যাবে।

যেভাবে আবিষ্কৃত হলো

উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের প্রকল্প হেকেপের আওতায় ২০১৬ সালের মার্চ মাসে ‘ননলিনিয়ার অপটিকস ব্যবহার করে বায়োমার্কার নির্ণয়’ শীর্ষক একটি প্রকল্প হাতে নেন শাবিপ্রবির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের একদল গবেষক। গবেষক দলের প্রধান ইয়াসমিন হক জানান, ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর রক্তের সিরাম ও আক্রান্ত নয় এমন ব্যক্তির রক্তের সিরামের ননলিনিয়ার অপটিক্যাল রেসপন্স ভিন্ন। গবেষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ননলিনিয়ার বায়ো-অপটিকস রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষের রক্তের সিরামে এবং সাধারণ মানুষের রক্তের সিরামে শক্তিশালী লেজার রশ্মি পাঠিয়ে ননলিনিয়ার সূচক পরিমাপ করেন। এতে দুটি নমুনার দুটি ভিন্ন ফল পাওয়া যায়। ড. ইয়াসমিন হক বলেন, ‘ক্যান্সার শনাক্তকরণের এই পদ্ধতি নিয়ে প্রথমে ১০ জন সাধারণ এবং ৬০ জন ক্যান্সার রোগীর নমুনা রক্তের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়।’ এরই পরিপ্রেক্ষিতে রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে ক্যান্সার শনাক্তকরণ যন্ত্র আবিষ্কার করা যাবে। এ ব্যাপারে গবেষক দলের অন্যতম সদস্য ড. শরিফ মোহাম্মদ শরাফউদ্দিন বলেন, ‘রক্ত থেকে লাল অংশ বাদ দিয়ে কেবল সিরাম ভবিষ্যতের তৈরিকৃত যন্ত্রটিতে দিলে প্যারামিটারে মান জানা যাবে। আর সেটা থেকেই বোঝা যাবে শরীরে ক্যান্সার আছে কী নেই।’

যারা আবিষ্কার করলেন

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হকের নেতৃত্বে একটি গবেষক দল মাত্র আড়াই বছরের মধ্যে এই অনন্য বিষয়টি আবিষ্কার করতে সক্ষম হন। গবেষক দলটি এমবেডেড সিস্টেম ডিজাইন, কম্পিউটেশন, সিস্টেম অ্যান্ড ইন্টারফেসিং ডিজাইন ও ননলিনিয়ার অপটিকস এই চারটি গ্রুপে বিভক্ত ছিল। টিমে অধ্যাপক সুশান্ত কুমার দাস, অধ্যাপক সৈয়দ বদিউজ্জামান ফারুক, অধ্যাপক ড. শরীফ মো. শরাফুদ্দিন, মানস কান্তি বিশ্বাস, এনামুল হকসহ ২৫ জনের মতো ছিলেন, যারা সবাই শাবিপ্রবির শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীদের মধ্যে পিএইচডি ফেলো, এমফিল, মাস্টার্স, এমনকি আন্ডারগ্র্যাজুয়েটের শিক্ষার্থীরা রয়েছেন।

কী এই ননলিনিয়ার অপটিকস

কোনো পদার্থের মধ্য দিয়ে যদি সাধারণ আলো যায় তাহলে কিছু আলো আমরা আউটপুট হিসেবে পাই, কিছু আলো প্রতিফলিত হয়, আবার কিছু শোষিত হয়। তবে তীব্র আলো, যেমন লেজার, কোনো পদার্থের মধ্য দিয়ে গেলে সেই পদার্থের ম্যাটেরিয়াল বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হয়। সেই সঙ্গে আলোরও পরিবর্তন দেখা যায়। সহজভাবে বলতে গেলে এটাই ননলিনিয়ার অপটিকস।

কেমন হবে ক্যান্সার শনাক্তকরণের সেই যন্ত্র

এক বছরের মধ্যে তারা সেই প্রোটোটাইপ তৈরি করে ফেলবেন। কেমন হবে সেই যন্ত্র জানতে চাইলে বলা হয়, যন্ত্রটি হবে টেবিলটপ টাইপের। অর্থাৎ টেবিলের মধ্যে সেট করা থাকবে। এর সঙ্গে ইলেকট্রনিকস, ননলিনিয়ার অপটিকস, মেকানিক্যাল ইন্টারফেসিংসহ অনেক কিছুই যুক্ত থাকবে।

সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় এই যন্ত্রের নির্দিষ্ট স্থানে গবেষকদের তৈরি নমুনার ধারকে রক্তের নমুনা দিয়ে একটা বাটনে চাপ দিলেই বাকি কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হবে এবং ফলাফলের প্রিন্ট আউট নেওয়া যাবে।