সমাজ, দেশকে অগ্রগামী করতে দেশের অর্ধেক জনগণ তথা নারীকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার পাশাপাশি তার কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি।
সাম্যের গান গাই-
আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নেই!
বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
আজ থেকে ১৬৯ বছর আগে নারী দিবসের শুরুটা ছিল নারীর সমঅধিকার, মর্যাদা ও অসম মজুরির প্রতিবাদে। ১৮৫৭ সালে নিউইয়র্কের সুতা কারখানার কর্মজীবী নারীদের শিল্পকারখানায় শ্রম সময় কমানো, মানবিক আচরণবিধির প্রয়োগ, মজুরির বৈষম্য দূরীকরণসহ আরও অন্য ধরনের স্বাধীনতা প্রদানকে কেন্দ্র করে নারী শ্রমিকরা রাজপথে নেমে আসেন। সেদিন অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে এই ঐক্যবদ্ধ মিছিলে সরকারি বাহিনীর দমনপীড়ন সারা বিশ্বকে হতবাক করে দেয়। প্রকাশিত হয় নারীর প্রতি অমানবিক আচরণ ও অধিকার হরণের করুণ ইতিহাস। নারীর এই ন্যায্য দাবি ও বঞ্চনার ইতিহাসে বিক্ষুব্ধ হন বিভিন্ন দেশের নেতারা। নারীর প্রতি এই অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সবাই ঐক্যবদ্ধ হতে থাকেন। বিশ্বের অসংখ্য নারী শ্রমিক অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। ১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়। ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। সেই সম্মেলনে ১৭টি দেশ থেকে ১০০ নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনে ক্লারা প্রতি বছর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। সিদ্ধান্ত হয় ১৯১১ সাল থেকে নারীদের সমঅধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে। ১৯৭৫ সালে ৮ মার্চকে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করে। বিশ্বের কয়েকটি দেশ ৮ মার্চকে সরকারি ছুটি হিসেবে ঘোষণা করেছে। তবে দিবসটির তাৎপর্য কোনো নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি সমাজের উন্নতি হয় যখন নারী ও পুরুষ উভয়ে সেই সমাজে অর্থনৈতিক কাজে সমমর্যাদায় অংশগ্রহণ করতে পারে। উভয়ের জন্য সমতার সুযোগ উন্মুক্ত থাকে।
উন্নয়নের গতিধারায় আজকের বাংলাদেশে নারী অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রারও চালিকাশক্তি। কৃষি, শিল্পকারখানা, অবকাঠামোগত নির্মাণ, অফিস-আদালতসহ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেভাবে নারীর শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মক্ষমতা স্পষ্ট, তাতে নির্দ্বিধায় বলা যায় শ্রমবাজারে নারীরা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। তারপরও শ্রমজীবী নারীরা আজও সম্মান অধিকার থেকে অনেক দূরে। দেশের পোশাকশিল্প, যা দেশের অর্থনীতির সম্ভাবনার নিয়ন্ত্রক, সেক্ষেত্রে নারীদের যুগান্তকারী ভূমিকাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। বর্তমানে আমাদের দেশে যদিও সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্য নেই বললেই চলে। কিন্তু ব্যক্তিমালিকানাধীন কৃষি ও শিল্পের উৎপাদনশীলতায় নারীর প্রতি যে বৈষম্য তা আন্তর্জাতিক শ্রম আইনেরও চরম লঙ্ঘন বলা যায়। দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যেমন রাস্তাঘাট, কালভার্ট, সেতু ও বহুতল ভবন নির্মাণে নারী শ্রমিকের ন্যায্য পাওনাকে কমিয়ে দেওয়া হয়। অবকাঠামো নির্মাণে শত শত নারী শ্রমিকও এ বিভাজন থেকে মুক্ত নয়।
নারী শুধু যে দেশের উৎপাদনশীলতায় কায়িক শ্রম দিচ্ছে তা নয়; গৃহস্থালির যাবতীয় কাজকর্মও আমাদের দেশে একজন গৃহিণীকেই সামলাতে হয়। উপার্জনক্ষম মহিলারা এই গৃহকর্মের দায়বোধ থেকে নিজেকে বাঁচাতেও চায় না। আজকের নারীরা অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার অন্যতম চালিকাশক্তি। বলা হয় মানুষ দুই পায়ে হাঁটলে আগায়। যে সমাজে নারী-পুরুষ একসঙ্গে সমমর্যাদায় অর্থনৈতিক কাজে অংশ নেয় সেই সমাজও অগ্রগামী হয়। তাই সমাজ, দেশকে অগ্রগামী করতে দেশের অর্থেক জনগণ তথা নারীকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার পাশাপাশি তার কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলদেশের নারীরা মানসিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী। তারা যেমন ১৯৫২ বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তেমনি ১৯৭১ সালেও পুরুষের পাশাপাশি সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে এদেশের লাখ লাখ নারীর অসীম ত্যাগ ও বেদনা জড়িয়ে আছে। এত অর্জন এত ত্যাগের পরও দেশের শহরে-গ্রামে নারী নির্যাতন ও হত্যা যেন শেষই হয় না। এখনো দেশে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আইন, আইনের বিভিন্ন ধারা ও উপধারা বিদ্যমান। জাতিসংঘ কর্তৃক প্রণীত সিডও সনদের গুরুত্বপূর্ণ দুটি ধারা থেকে বাংলাদেশ এখনো সংরক্ষণ প্রত্যাহার করেনি। যে কারণে অভিভাবকত্ব ও উত্তরাধিকারের বিষয়গুলো এখনো ধর্মভিত্তিক আইন দ্বারাই নিষ্পন্ন হয়। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের একটা বড় প্রতিবন্ধকতা উগ্রবাদী ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর নারীবিরোধী প্রচারণা। সম্প্রতি এরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রভাব বিস্তার করেছে। তাদের এসব প্রচারণা নারীর শিক্ষা ও চাকরির বিপক্ষে এবং বাল্যবিয়ের পক্ষে মানুষকে প্রভাবিত করে, যা সংবিধানের মূল চেতনাবিরোধী।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসে শুধু একদিনের জন্য না, প্রতিদিনের কর্মযোগে নারীর অর্থনৈতিক অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করবে, তখনই দিবসটির তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে।