Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৪ এপ্রিল, ২০১৯ ২৩:২৫

পঞ্চপান্ডবকে ঘিরেই স্বপ্ন

মেজবাহ্-উল-হক

পঞ্চপান্ডবকে ঘিরেই স্বপ্ন

ভারত প্রথম চ্যাম্পিয়ন ৮৩-তে, পাকিস্তান শিরোপা জিতেছে ৯২-এ, আর ৯৬-এর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন শ্রীলঙ্কা! উপমহাদেশের তিন বিশ্বচ্যাম্পিয়নের কাছ থেকেই আত্মবিশ্বাস নিতে পারে বাংলাদেশ দল। বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে নিজেদের নতুন করে উদ্দীপ্ত করতে পারেন মাশরাফিরা।

১৯৭৯ সালের বিশ্বকাপে ক্লাইভ লয়েডের পরাক্রমশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজ যখন টানা দ্বিতীয় শিরোপা জিতে সেই আসরে প্রথম রাউন্ডের গন্ডিই পার হতে পারেনি ভারত। কে ভেবেছিল সেই দলটাই পরের আসরে শিরোপা জিতবে? কিন্তু কপিল দেবের অসাধারণ নেতৃত্বে সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়েই ৮৩-তে অসাধ্যকে সাধারণ করেছিল ভারত!

পাকিস্তানের কথাই ধরুন! ১৯৯২ বিশ্বকাপে তো তাদের প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেওয়ার কথা ছিল। গ্রুপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মাত্র ৭৪ রানে অলআউট হয়ে গিয়েছিল ইমরান খানের দল। কিন্তু ভাগ্য সহায় থাকলে ঠেকায় কে? নিশ্চিত হারের পথে থাকা ম্যাচ বৃষ্টিতে পন্ড  হয়ে যাওয়ায় পাকিস্তান পেয়ে যায় ১ পয়েন্ট। ইংলিশদের বিরুদ্ধে পাওয়া ওই ১ পয়েন্টই পাকিস্তানকে কোনো রকমে নকআউটের দরজায় নিয়ে যায়। তারপর তো সবই ইতিহাস। শিরোপাই উঠে যায় ইমরানের হাতে।

১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপে অর্জুনা রানাতুঙ্গার শ্রীলঙ্কা কি ফেবারিট ছিল? মোটেও না। হয়তো ১ হাজার জনের মধ্যে একজনকেও খুঁজে পাওয়া যেত না যে বিশ্বাস করেছিল শ্রীলঙ্কা শিরোপা জিততে পারে! বিশ্বকাপে অংশগ্রহণই ছিল যাদের কাছে বড় ঘটনা, সেই দলটাই কিনা বাজিমাত করে দিয়ে শিরোপা ঘরে তুলল!

তাহলে বাংলাদেশ কেন পারবে না এবার?

বাস্তবতার কথা চিন্তা করলে পরিস্থিতি ভিন্ন। ভারত, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার মতো সুপার পাওয়ার দলগুলো শিরোপার জন্য ওত পেতে আছে। সেখানে টাইগারদের সম্ভাবনা কোথায়?

হ্যাঁ, অবশ্যই সম্ভাবনা আছে! কে ভেবেছিল ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের মাটিতে প্রতিকূল পরিবেশে ইংল্যান্ডের মতো ফেবারিট দলকে বিদায় করে দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলবে বাংলাদেশ!

কিংবা ২০১৭ সালের আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির কথাই চিন্তা করুন! বাংলাদেশের গ্রুপে ছিল স্বাগতিক ইংল্যান্ড ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দল। এমন গ্রুপ থেকে নকআউটে কোয়ালিফাই করার কথা কেউ হয়তো কল্পনাও করেনি। কিন্তু টাইগাররা অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডকে বিদায় করে দিয়ে উঠে গিয়েছিল সেমিফাইনালে। সেটাও কিনা এই ইংল্যান্ডের মাটিতেই, যেখানে এবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপ!

তাহলে এবার বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে দোষ কোথায়?

বাংলাদেশ দলে আছেন বিশ্বমানের পাঁচজন সিনিয়র ক্রিকেটার। মাশরাফি বিন মতুর্জা, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম এবং মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ-এই ‘পঞ্চপা-ব’ই তো ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে মহানায়ক বনে যেতে পারেন!

তবে এবারের স্কোয়াডে পঞ্চপান্ডবই যে শেষ ভরসা তা কিন্তু নয়! এছাড়াও এই দলে রয়েছেন বেশ কয়েকজন বিস্ফোরক ক্রিকেটার। মুস্তাফিজুর রহমান, মোহাম্মদ মিথুন, মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন, মেহেদী হাসান মিরাজ, রুবেল হোসেন, লিটন দাস-কেউ তো কারও থেকে কম নন। আগের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে রুবেলের এক ক্যারিশমেটিক স্পেলেই তো জিতে যায় লাল-সবুজরা। এশিয়া কাপের ফাইনালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাটিতে ভারতের বিরুদ্ধে ১১৭ বলে লিটন দাসের ১২১ রানের ইনিংসটি যেন এখনো ক্রীড়ামোদীদের চোখে ভাসছে। ফর্মহীনতায় ভুগতে থাকা সৌম্য সরকার প্রিমিয়ার লিগে টানা দুই ম্যাচে সেঞ্চুরি ও ডাবল সেঞ্চুরি করে রেকর্ডের বন্যা বইয়ে দিয়ে যেভাবে নিজেকে ফিরে পেয়েছেন তা মনে রাখার মতো।

আর এই তরুণ ক্রিকেটারদের মাথার ওপর ‘বটগাছের’ মতো ছায়া দিতে পঞ্চপান্ডব তো আছেনই! মূলত এই পাঁচ সিনিয়র ক্রিকেটারকে ঘিরেই বিশ্বকাপের শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ।

মাশরাফি-এক যোদ্ধা ক্রিকেটার! দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ও। তার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে তিনটি বিশ্বকাপ। ২০০৩, ২০০৭ ও ২০১৫ সালে বিশ্বকাপ খেলেছেন তিনি। ইনজুরির কারণে ঘরের মাঠে ২০১১ বিশ্বকাপে খেলতে পারেননি। বিশ্বকাপে ১৬ ম্যাচে ১৮ উইকেট নিয়েছেন মাশরাফি। তার নেতৃত্বে ২০১৫ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল, ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সেমিফাইনাল এবং ২০১৮ এশিয়া কাপের ফাইনাল খেলেছে বাংলাদেশ। এছাড়া ম্যাশ দলপতি থাকার সময়ই ঘরের মাঠে ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলের বিরুদ্ধে সিরিজ জিতেছে টাইগাররা। এবার মাশরাফির নেতৃত্বেই শিরোপা জয়ের স্বপ্ন নিয়ে ইংল্যান্ড যাচ্ছে দল। 

সাকিব-এই বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারই বাংলাদেশের প্রধান ভরসা। ব্যাটে-বলে দুর্দান্ত। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ২১টি ম্যাচ খেলেছেন। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে সর্বোচ্চ ২৩ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি সর্বোচ্চ ৫৪০ রানও করেছেন। তাছাড়া চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে কার্ডিফের যে ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে শেষ চারের টিকিট নিশ্চিত করেছিল টাইগাররা সে ম্যাচে অসাধারণ এক সেঞ্চুরি করেছিলেন সাকিব। বিশ্বকাপেও তার দিকে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ।

তামিম-এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান। ড্যাসিং ওপেনার রয়েছেন ফর্মের তুঙ্গে। বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতাতেও সাকিবের সমান (২১ ম্যাচ)। আগের তিন বিশ্বকাপে খেললেও এবার যাচ্ছেন সেরা ফর্মে থেকে। ইংল্যান্ডের মাটিতে বিশ্বকাপ বলে যেন বাড়তি আনন্দ তার। কেন না বাংলাদেশের পর ইংল্যান্ডের মাটিতেই খেলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি। বছর দুয়েক আগে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে তার সেঞ্চুরিটি ছিল দেখার মতো। এবার আরও বড় কিছুর প্রত্যাশায় তামিম।

মুশফিক-বাংলাদেশের মিডল অর্ডার ব্যাটিংয়ের প্রধান ভরসা। বিশ্বকাপের তিন আসরে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তারও। ২০ ম্যাচে করেছেন ৫১০ রান। কোনো সেঞ্চুরি না থাকলেও রয়েছেন তিনটি হাফ সেঞ্চুরি। তবে একটুখানি দুশ্চিন্তা হচ্ছে, এখনো শতভাগ ফিট নন মিস্টার ডিপেন্ডেবল। কোচের আশাবাদ, বিশ্বকাপের আগেই পুরোপুরি ফিট হয়ে যাবেন মুশফিক।

মাহমুদুল্লাহ-বিশ্বকাপে বাংলাদেশের একমাত্র সেঞ্চুরিয়ন। ২০১৫ বিশ্বকাপে টানা দুই সেঞ্চুরি করে ফোকাস নিজের দিকে নিয়েছিলেন। তা ছাড়া চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ইংল্যান্ডের কার্ডিফে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই ঐতিহাসিক জয়ে সাকিবের সঙ্গে সেঞ্চুরি করেছিলেন তিনিও। ইংলিশ কন্ডিশনের সঙ্গে সহজেই মানিয়েও নিতে পারেন। তাই বিশ্বকাপে দৃষ্টি থাকবে তার দিকেও।

বাস্তবতার বিচারে সামনের বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে ফেবারিটের আসনে বসিয়ে দেওয়া বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়! কিন্তু মূলমঞ্চে ‘পঞ্চপা-ব যদি আপন আলোয় উদ্ভাসিত হন, সেই সঙ্গে অন্যরাও যদি সাধ্য মতো সহযোগিতা করতে পারেন তাহলে ভিন্ন চিত্র দেখা যেতেই পারে! আলোচনায় না থেকেও ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা যদিও নিজের প্রথম বিশ্বকাপ জিততে পারে তাহলে এবার বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখলে দোষ কোথায়!


আপনার মন্তব্য