১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠন হয়েছিল তা অনেকেরই জানা। কিন্তু যিনি ঐতিহাসিক দলটি গঠনে মূল ভূমিকা রেখেছিলেন তাঁর নাম কি জানা আছে? সত্যি বলতে কী অনেকেরই জানা নেই সাহসী এই ব্যক্তির নাম। নাম না জানাকে স্বাভাবিক ঘটনাই বলা যায়। কেননা, কখনো তাঁকে সম্মুখে আনা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ৫৪ বছরেও তিনি উপেক্ষিত থেকে গেছেন। বলছি ’৬০ ও ’৭০-এর দশকে তারকা ফুটবলার আলী ইমামের কথা। যিনি ইস্ট অ্যান্ড, ভিক্টোরিয়া, আজাদ, ওয়ান্ডারার্স ও স্বাধীনতার পর আবাহনীতে আস্থার সঙ্গে খেলেছেন। কোচ হয়ে আবাহনী ও মোহামেডানকে চ্যাম্পিয়নও করান। জাতীয় দলের প্রশিক্ষকও ছিলেন তিনি। সেই ফুটবল নক্ষত্র আড়ালে থাকেন কীভাবে?
১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি সৈন্যরা যখন নিরীহ বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তখনই আলী ইমামের চিন্তায় আসে কীভাবে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠন করা যায়। ফুটবল ছিল জনপ্রিয় খেলা, তাই আলী ইমামের চিন্তায় ছিল স্বাধীন বাংলা দল গড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা দেওয়া। দল গঠনে তখন অনেক পরিচিত ফুটবলারের সহযোগিতা চেয়েছিলেন তিনি। দু-একজন ছাড়া কেউ আসেননি। কেউ কেউ আবার বলেছিলেন, জেনে-শুনে আমরা মৃত্যু ডেকে আনতে পারি না। এতেও দমে যাননি আলী ইমাম। সবার সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন। এর মধ্যে আবার পাক সেনারা তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। কারও মাধ্যমে তারা জেনে যায় আলী ইমামের উদ্যোগের কথা। জীবন বাজি রেখে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠনে চেষ্টা চালিয়ে যান তিনি। শেষ পর্যন্ত সফলও হন। যারা প্রথমে তাঁকে জানের ভয়ে সহযোগিতা করতে চাননি তারাই পরবর্তীতে আলী ইমামের ডাকে ভারতে চলে আসেন। এ ক্ষেত্রে তোফায়েল আহমেদ, শেখ কামাল, মাজহারুল ইসলাম তান্নারা ইমামকে সহযোগিতা করেন।
১২ জন ফুটবলারকে ভারতে পাওয়ার পরই স্বাধীন বাংলা দল গঠনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আলী ইমামের ডাকে পরবর্তীতে অধিকাংশ তারকা খেলোয়াড়ই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভারতে চলে আসেন। এরপরই শুরু হয় দল গঠনের প্রক্রিয়া। জাকারিয়া পিন্টুকে অধিনায়ক ও প্রতাপ শঙ্কর হাজরাকে সহঅধিনায়ক করা হয়। তান্না পান ম্যানেজারের দায়িত্ব। মূল উদ্যোক্তা হলেও আলী ইমাম ফুটবলার হিসেবেই স্বাধীন বাংলা দলে নাম লেখান। ভারতের বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শনী ম্যাচ খেলে মুক্তিযুদ্ধে ফান্ড সংগ্রহ করে স্বাধীন বাংলা দল। দলটি ব্যাপক সাড়া পেয়েছিল। স্বাধীন বাংলা দলের মাধ্যমে বিদেশের মাটিতে প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়। এভাবেই ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পেয়ে যায় আলী ইমামের গড়া স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল।
১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভ করে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলকে সেভাবে স্বীকৃতি দেওয়া না হলেও দলের অনেক খেলোয়াড়ই পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কার ও নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা। অথচ মূল উদ্যোক্তা আলী ইমামই থেকে গেছেন আড়ালে। তাঁকে মূল্যায়নই করা হয়নি। মুক্তিযোদ্ধা আলী ইমামকে নিয়ে আবার ঘটে গেছে অবাক কাণ্ড । যা বড্ড বেদনাদায়ক। ১৯৮৯ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। অথচ ১৯৯২ সালে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের খেলোয়াড়দের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল আলী ইমামকে। তিনি থাকতেন কলাবাগানে। স্বাধীন বাংলা দলের এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য আলী ইমামের আমন্ত্রণপত্র দিতে এসেছিলেন এক মিষ্টির দোকানে। যেখানে প্রতিদিনই আড্ডা দিতেন আলী ইমাম। যাওয়ার সময় ওই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি দোকানের এক কর্মচারীকে বলে যান, আলী ইমাম এলে অবশ্যই আমার কথা বলবে। অনুষ্ঠানে ওকে যেতে বলবে। ওখানে দেশের প্রধানমন্ত্রী আমাদের পুরস্কার দেবেন।
মিষ্টির দোকানের ওই কর্মচারী কার্ড পেয়ে এতটাই অবাক হয়ে যান যে, তাঁকে জানাতে পারেননি যে, আলী ইমাম তিন বছর আগেই না ফেরার দেশে চলে গেছেন। লোকটিকে দেখে আরও অবাক হয়েছিলেন যে, তিনিই তো অনুষ্ঠানের মূল উদ্যোক্তা। যাকে আবার আলী ইমামই স্বাধীন বাংলার বড় দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলেন। তিনি কি জানতেন না ইমামের মৃত্যুর কথা। একি ভুল না অন্য কিছু? কতজনই তো জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন ও পাচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য। আলী ইমামের অবদানের কথা কারও কি মনে নেই? মরনোত্তর পুরস্কারও তো দেওয়া যেতে পারে।