১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেশের ক্রীড়াঙ্গন পুরোপুরি অচল ছিল। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে কিছু খেলা হলেও ২৫ মার্চের পর কোনো খেলায় হয়নি। ঢাকায় ক্লাবগুলোতেও তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ঐতিহ্যবাহী মোহামেডানের অবস্থা ছিল খুবই সংকটাপন্ন। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়ক ছিলেন এ ক্লাবের। অধিকাংশ খেলোয়াড় ছিলেন মোহামেডানের। তাই পাকিস্তান আর্মি ও তাদের সহযোগীদের বিশেষ নজর ছিল ক্লাবটির ওপর। ক্লাবের সব রকম কর্মসূচি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ভারতে যাওয়া খেলোয়াড়দের ঠিকানা ও আত্মীয়স্বজনদের সন্ধানে তখন ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ সংস্থা অফিসের পাশে অবস্থিত মোহামেডান ক্লাবে বসানো হয়েছিল টর্চার সেল। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে অংশ নেওয়ায় মোহামেডান ক্লাব ধ্বংস করে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। শুধু তাই নয় গ্রামে ফুটবলারদের ঠিকানা খুঁজে অনেকের বাসায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় লাভ করায় মূলত বেঁচে যায় মোহামেডান ক্লাব। এরপর থেকে স্বাধীন দেশে ফেরা শুরু করেন স্বাধীন বাংলা দলের ফুটবলাররা। খুলে দেওয়া হয় ক্লাবের তালা। বিভিন্ন খেলায় অংশ নিলেও মূলত ফুটবলাররা ক্লাবেই থাকতেন। খেলোয়াড়রা যার যার ক্লাবে আসার পরই ক্রীড়াঙ্গন সরব হওয়ার সম্ভাবনা জেগে ওঠে। পাক সেনারা দেশকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করায় খেলাধুলা মাঠে নামানোটা ছিল সত্যিই কঠিন। তারপরও ক্রীড়াঙ্গন সচল হতে খুব বেশি দেরি হয়নি। এর পেছনে বড় কারণ ছিল বাঙালি খেলা পাগল। তা ছাড়া স্বাধীন বাংলা ফুটবলারদের মাঠে দেখতে দর্শকরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। সংগঠকদের আন্তরিকতা না বললে নয়।
গোলাম সারোয়ার টিপু ছিলেন ওই সময়ে ফুটবলে বড় তারকা। তিনি জানালেন, ‘১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পর ঢাকার ক্রীড়াঙ্গন সরব হয়েছিল ফুটবলের মাধ্যমে। ক্রিকেট, হকি ও অ্যাথলেটিকসেরও জনপ্রিয়তা ছিল। তবে ফুটবলের বিষয়টি পুরোপুরি আলাদা ছিল। ১৬ ডিসেম্বরের পরই আতঙ্ক কাটিয়ে খেলোয়াড়রা যার যার ক্লাবে আসতে থাকেন। একে একে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের খেলোয়াড়রাও ফিরে আসেন। মূলত তাদের আগমনের পরই ক্রীড়াঙ্গনে প্রাণ চাঞ্চল্যতা ফিরতে শুরু করে।’
ফুটবলের স্বাধীনতা কাপ দিয়েই স্বাধীন বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন নতুনভাবে জেগে ওঠে।
গোলাম সারোয়ার টিপু
টিপু বলেন, ‘১৯৭২ সালের শুরুর দিকেই কয়েকটি ক্রীড়া ফেডারেশন গঠন হয়। এর মধ্যে বাফুফে অর্থাৎ বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন অন্যতম। সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন ওয়ারী ক্লাবের আবুল হাশেম ভাই। সভাপতি ছিলেন গাজী গোলাম মোস্তফা। নতুন কমিটি গঠনের পরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় স্বাধীনতা কাপ দিয়ে স্বাধীন বাংলায় ফুটবল মাঠে গড়াবে। আমি তখন মোহামেডানে খেলতাম। যেহেতু স্বাধীনতার পরপরই তাই সবকটি ক্লাব অংশও নিতে পারেনি। মোহামেডান স্বাধীনতা কাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ফাইনালে গেন্ডারিয়ার ইস্টন্ডকে হারিয়ে। কাজী সালাউদ্দিনও তখন খেলতেন মোহামেডানে। স্বাধীনতা কাপে সেমিফাইনালে হ্যাটট্রিক ও ফাইনালে দুই গোল করেন তিনি। এখান থেকেই মূলত তারকা সালাউদ্দিনের দেখা মেলে। অবশ্য ঢাকায় প্রীতি ম্যাচে মোহনবাগানের বিপক্ষে ঢাকা একাদশের হয়ে দর্শনীয় গোলটি সালাউদ্দিনকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। মোট কথা ফুটবলের স্বাধীনতা কাপ দিয়েই নতুন বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন নতুনভাবে জেগে ওঠে। এরপর ক্রিকেট, আবদুস সাদেক ভাইদের প্রচেষ্টায় হকি মাঠে গড়ায়।’
স্বাধীনতা কাপের পর ১৯৭২ সালে ফুটবল লিগের দলবদল শুরু হয়। নতুন দল হিসেবে আবির্ভাব ঘটে ঢাকা আবাহনীর। শুরুতেই তারা শক্তিশালী দল গড়েছিল। টিপু, সালাউদ্দিন মোহামেডানের পাঁচ খেলোয়াড় আবাহনীতে যোগ দেন। বিশেষ করে টিপুর মোহামেডান ছাড়াটা বেশ আলোড়ন পড়েছিল। তবে লিগ শুরু করাটা সহজ ছিল না। প্রায় দেড় শ পশ্চিম পাকিস্তান ফুটবলারের দেখা নেই। তাদের শূন্যস্থান কীভাবে পূরণ হবে তা ছিল বড় চিন্তা। শেষ পর্যন্ত লিগ ঠিকই মাঠে গড়িয়েছিল। আবদুস সাদেকের নেতৃত্বে নতুন দল আবাহনীর যাত্রা হলেও ১৯৭২ সালে লিগ শেষ হতে পারেনি। ১৯৭৩ সালে লিগ মাঠে গড়ার এবং বাংলাদেশে প্রথম ঢাকা লিগে চ্যাম্পিয়ন হয় বিআইডিসি। ক্রিকেটে আবাহনী ও হকিতে প্রথম চ্যাম্পিয়ন মাহুরটুলি। ১৯৭৩ সালেই আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে নাম লেখায় বাংলাদেশ। আর তা ফুটবলের মাধ্যমে। মালয়েশিয়ার মারদেকা কাপে জাতীয় ফুটবল দলের অভিষেক হয় জাকারিয়া পিন্টুর নেতৃত্বে। ক্রিকেটে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে এমসিসির বিপক্ষে। হকিতে জাতীয় দলের অভিষেক হয় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে। এভাবে সরব হয়ে ওঠে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন।
১৬ ডিসেম্বর প্রথম বিজয় দিবসের পর এভাবেই ক্রীড়াঙ্গন সরব হয়ে ওঠে। ৫৪ বছরেও বাংলাদেশের প্রাপ্তি কম নয়। ক্রিকেটে এখন বিশ্ব পরিচিত দেশ। যুব বিশ্বকাপ ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন, নারী এশিয়া কাপেও চ্যাম্পিয়ন। কমনওয়েলথ গেমসে সোনা, এশিয়া গেমসেও সোনা মিলেছে।
ফুটবলে সাউথ এশিয়ান গেমস ও সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে শিরোপা জিতেছে। যুব হকির বিশ্বকাপে অভিষেক আসরেই আলোড়ন তুলেছে বাংলাদেশ। ব্যক্তি প্রাপ্তিও কম নয়। এভাবে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ।