রাবাতে তখন বৃষ্টি হচ্ছে। চলছে সমানে সমানে লড়াই। গোলশূন্য ফাইনাল ম্যাচের প্রায় শেষ সময়। যোগ করা আট মিনিট সময়ের বাকি আর তিন মিনিট। কর্নার পায় স্বাগতিক মরক্কো, বল উড়ে যাচ্ছিল দূরের পোস্টে, সেখানেই ফাউলের শিকার হন রিয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড ব্রাহিম দিয়াজ। মনিটরে দেখার সিদ্ধান্ত নেন রেফারি। সাইডলাইনে তাকে ঘিরে রাখে সবাই। পেনাল্টির সিদ্ধান্ত নেন রেফারি। আর তাতেই ক্ষেপে যান সেনেগালের ফুটবলাররা। বিশেষ করে কোচ পাপে থিয়াউয়ের। বিতর্কিত পেনাল্টি সিদ্ধান্ত নিয়ে সেনেগালিজ ভদ্রলোক মাঠ ছেড়ে ওঠার আহ্বান জানালেন শিষ্যদের। অথচ আফ্রিকানদের রক্তে ফুটবল। ডাকারের অলিগলিতে বেড়ে ওঠা ছেলেরা ফুটবল জড়িয়ে ঘুমায়। রাবাতের ফরাসি আমলের পুরোনো রাস্তাগুলোতেও বিকাল হলেই ডাক পড়ে খেলার। সেই সেনেগালিজরাই টানেল ধরে চলে গেলেন। কেবল থেকে গেলেন লিভারপুল তারকা সাদিও মানে। এটি তার শেষ আফ্রিকা কাপ অব নেশনস আসর। কিছুক্ষণ পর তিনি নিজে গিয়ে ফিরিয়ে আনলেন সতীর্থদের। সেনেগাল ফিরে এলো।
মাঠে ফিরল ফুটবল। ওরা সব আফ্রিকানই তো। দিয়াজ কী ভাবছেন কে জানে? পঞ্চাশ বছরে দুটো প্রজন্ম পেরিয়েছে অ্যাটলাস লায়ন্সদের। অপেক্ষা এতদিনেরই। তাঁর পেনাল্টিতে আবার কাপ ফিরবে মরক্কোয়। শুধু ১২ গজের একটা কিকে ৫০ বছরের খরা কাটানোর সুযোগের প্রতীক্ষা। ১৯৭৬ সালে শেষবার মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা জিতেছিল তারা। পেনাল্টি নিতে গেলেন দিয়াজ। একটু বিষণ্ন দেখাল। রিয়াল তারকা পারেননি। সেনেগালের গোলকিপার মেন্দি পানেনকা ঠেকিয়ে দিয়েছেন। তবে দিয়াজের শটটা ছিল খুবই রহস্যময়। অনেকের মনে হতে পারে ইচ্ছা করেই গোলকিপারের হাতে আলতো করে মেরেছেন দিয়াজ। আবার নাও হতে পারে। চিরন্তন আফ্রিকান নাটুকেপনায় ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে। পাপ গেয়ে পারলেন। বাঁ পায়ের চমৎকার শটটা বারে লাগল, এরপর জালে। ইতিহাসে নিজের উপস্থিতি জানিয়ে সতীর্থদের আলিঙ্গনে হারিয়ে গেলেন। কোচ থিয়াউয়ের মুখে হাসি। অথচ কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টিতেও তার মাথা ঠান্ডা হচ্ছিল না!
সেনেগালের চারণভূমিতে পশ্চিম আফ্রিকান সিংহ টিকে আছে গোটা বিশেক। ৩ হাজার কিলোমিটার দূরে রাবাতের মাঠে হলুদ-সবুজ জার্সিতে একেকজন সিংহ হয়ে দাঁড়ালেন। স্টেডিয়াম, পরিবেশ, ভাগ্য-সবকিছুর সঙ্গে লড়াইয়ে জয়ী সেনেগালিজরা। ‘তেরেঙ্গা লায়ন্সরা’। শেষ বাঁশি বেজেছে। মরক্কোন সমর্থকদের চোখের পানি ঝরছে আকাশ বেয়ে। সেনেগাল জিতে গেছে। সাদিও মানে জিতেছেন। ফুটবল জিতেছে। জিতেছে আফ্রিকাই! মানের শেষ আসরকে রাঙিছেন সতীর্থরা। স্বাগতিক মরক্কোর বিপক্ষে ১-০ গোলের জয়ে দ্বিতীয়বারের মতো আফ্রিকান ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরল সেনেগাল। প্রথমবার জিতেছিল ২০২১ সালে। এদিকে এক মাস আগে ফিফা আরব কাপ জিতলেও আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের শিরোপার অপেক্ষার পালা আরও দীর্ঘ হলো হাকিমি ও দিয়াজের মরক্কোর।