রংপুর রাইডার্স ও সিলেট টাইটান্স এলিমিনেটর ম্যাচের শেষ বলে দাঁড়ায় তখন ৬ রান। ব্যাটিংয়ে ইংলিশ ক্রিকেটার ক্রিস ওকস এবং বোলিংয়ে পাকিস্তানের ফাহিম আশরাফ। টানটান উত্তেজনা মিরপুর স্টেডিয়ামে। দুই দলের সাজঘরের বাইরে ক্রিকেটার, কোচরা দাঁড়িয়ে পড়েছেন উত্তেজনায়। টিভি স্ক্রিনে দেখা যায় রংপুরের দুই কোচ মিকি আর্থার ও মোহাম্মদ আশরাফুল নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন। গ্যালারিতে রংপুরের সমর্থক হাত তুলে প্রার্থনা করছেন। অবিশ্বাস্য এক ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে স্টেডিয়ামের হাজার দশেক দর্শক তখন উত্তেজনায় ফুটছেন। ওভারের প্রথম ৫ বলে অবিশ্বাস্য বোলিং করা ফাহিম তখন আকাশসমান চাপে। একই রকম চাপে ইংল্যান্ড থেকে উড়ে আসা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ক্রিকেটার ওকস। ফাহিম বল করলেন অফ স্টাম্পের বাইরে। এর আগেই ব্যাটিং স্ট্যান্স পরিবর্তন করে উইকেটের কাছাকাছি চলে আসেন ওকস। অফ স্টাম্পের বাইরের বলটিকে বটম হ্যান্ডে ফ্ল্যাশ করেন। বল আকাশে ভাসতেই ডান হাতের তর্জনী তুলে গ্যালারির দিকে ইঙ্গিত করেন ওকস। বল সীমানা দড়ি পার হয়ে গ্যালারিতে আছরে পড়তেই ডাগআউট থেকে রকেট গতিতে ছুটতে ছুটতে মাঠে এসে ওকসের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়েন মেহেদি হাসান মিরাজ। ওকসের ছক্কায় শেষ বলের নাটকীয়তায় সিলেট টাইটান্স ৩ উইকেটে রংপুরকে হারিয়ে দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে জায়গা করে নেয়।
প্রথম ব্যাটিংয়ে রংপুর ২০ ওভারে ৯ উইকেটে ১১১ রান করে। ১১২ রান টপকাতে সিলেটকে শেষ বল পর্যন্ত লড়তে হয়েছে। শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচ হেরে উইকেটকে দুষেছেন রংপুর অধিনায়ক লিটন দাস, ‘টি-২০ ক্রিকেটের জন্য এটি কোনোভাবেই আদর্শ উইকেট নয়। কোয়ালিফায়ার ম্যাচে আরও ভালো উইকেট প্রত্যাশা করেছিলাম।’ শেষ বলে ছক্কা মারা প্রসঙ্গে ওকস বলেন, ‘এটা অবশ্যই খুব উত্তেজনাকর। ক্রিকেট ম্যাচে শেষ বলে ছক্কা মেরে জেতা এমন একটা বিষয়, যা আমি আগে কখনো করিনি। এমন পরিস্থিতিতে আমি আগেও পড়েছি যেখানে ছক্কা মারার দরকার ছিল, কিন্তু পারিনি। তাই বলটা বাউন্ডারির ওপারে পাঠানোটা এমন একটা স্মৃতি যা আমার মনে থাকবে। বিপিএলে সিলেটের হয়ে এটাই আমার প্রথম ম্যাচ, তাই এটা আরও বেশি স্পেশাল। অফ স্টাম্পের বাইরের বল আমি পছন্দ করি। অপেক্ষায় ছিলাম একটা স্লোয়ার বল বা কাটারের জন্য। বলটিতে গতি ছিল। আমি তখন শুধু রিয়্যাক্ট করেছি।’
শেষ বলের ছক্কায় এর আগেও হারের তিক্ত স্বাদ পেয়েছেন লিটন। ২০১৮ সালে নিদাহাস ট্রফির ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে শেষ বলের ছক্কায় হেরেছিল বাংলাদেশ। কলম্বোয় শেষ ওভারে ভারতের দরকার ছিল ২২ রান। ব্যাটিংয়ে ছিলেন দিনেশ কার্তিক এবং বোলিংয়ে সৌম্য সরকার। শেষ বলের সমীকরণ ছিল ৫ রান। সৌম্যর অফ স্টাম্পের বাইরের বলটিকে কাভারে ছক্কা মেরে ম্যাচ জেতান দিনেশ। গতকাল ম্যাচ শেষে ছক্কায় হারার পর রংপুরের অধিনায়ক লিটনও নিদহাস ট্রফির ফাইনালের ওই ছক্কার কথা উল্লেখ করেন, ‘শেষ বলের ছক্কায় এর আগেও হেরেছি। নিদাহাস ট্রফির ফাইনালে হেরেছিলাম। সেবারও কাভার দিয়ে ছক্কা ছিল শেষ বলটি।’
উইকেটে ঘাস থাকায় টস জিতে ফিল্ডিং করেন সিলেটের অধিনায়ক মিরাজ। দুই পেসার খালেদ আহমেদ, ওকস গতি ও সুইংয়ে নাকাল করেন রংপুরের টপ অর্ডার। দুজনে ২৯ রানে তুলে নেন ৪ উইকেট। সেখান থেকে খুশদিল শাহ, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ও নুরুল হাসান সোহানের দৃঢ়তার পরিচয় দিলে রংপুরের রান দাঁড়ায় ২০ ওভারে ৯ উইকেটে ১১১। খুশদিল ৩০, মাহমুদুল্লাহ ৩৩ ও ১৮ রান করেন নুরুল হাসান সোহান। ম্যাচসেরা সিলেটের পেসার খালেদ ৪ ওভারে ১৪ রানের খরচে নেন ৪ উইকেট। ওকস ২ উইকেট নেন ১৫ রানের খরচে। টার্গেটে ১১২ রান। সিলেট ১৯ ওভারে তুলে ফেলে ১০৩ রান। শেষ ওভারে টার্গেট দাঁড়ায় ৯ রান। ফাহিমের প্রথম বলে মঈন আলি নেন ২ রান। পরের ৩ বলে কোনো রান না দিয়ে উইকেট নেন মঈনের। শেষ ২ বলের সমীকরণ ৭ রান। খালেদ ১ রান নিয়ে প্রান্ত বদল করেন। শেষ বলের সমীকরণ দাঁড়ায় ৬ রানের। এরপর অবিশ্বাস্য ক্রিকেট খেলেন ওকস। আকাশসমান চাপ নিয়ে ছক্কায় রংপুর রাইডার্সকে বিদায় করে দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে টেনে তোলেন সিলেট টাইটান্সকে।