দেশ এখন পুরোপুরি নির্বাচনমুখী। ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা তুঙ্গে। হিসাবনিকাশ শুরু হয়ে গেছে কে জিতবেন বা হারবেন। সংখ্যায় কম হলেও এবারও তারকা ক্রীড়াবিদ ও সংগঠক নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। নির্বাচনে পুরোনোরা যেমন লড়ছেন, তেমনই ক্রীড়াঙ্গনের নতুন মুখেরও দেখা মিলছে। অন্যবার বিএনপি ও আওয়ামী লীগ থেকেই ক্রীড়াঙ্গনের তারকারা প্রার্থী হতেন। এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় পরিচিত ও আলোচিত মুখ মূলত বিএনপির হয়েই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। যাঁরা নির্বাচন করছেন সবাই নিজগুণে পরিচিত। সাবেক তারকা ফুটবলার ও অ্যাথলেট মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ উদ্দিন আহমদ, অভিজ্ঞ সংগঠক মনিরুল হক চৌধুরী, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক সভাপতি আলী আসগার লবি, জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক ও ব্রাদার্স ইউনিয়নের সভাপতি ইশরাক হোসেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লড়ছেন। এঁরা সবাই বিএনপির প্রার্থী। ক্রীড়াঙ্গনের লোকেরা নির্বাচন করছেন বলেই ক্রীড়াঙ্গনেও তা আলাদাভাবে উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ নির্বাচনে পরিচিত মুখ। ১৯৮৬ সালে তিনি ভোলা-৩ আসন থেকে প্রথমবার নির্বাচন করেন। এবারও একই আসন থেকে লড়ছেন। ক্রীড়াঙ্গনে হাফিজের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনিই প্রথম ফুটবলার হিসেবে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মনোনীত হন। এর আগে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সভাপতি থাকার সময় ফিফার সঙ্গে বাফুফের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। হাফিজ ষাটের দশকে পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে পাকিস্তান ওই সময় জনপ্রিয় আসর আরসিডি কাপে অংশ নেয়। বাংলাদেশে ঘরোয়া ফুটবলে তিনি ছিলেন অন্যতম সেরা ফুটবলার। দীর্ঘদিন ঐতিহ্যবাহী ঢাকা মোহামেডানে সুনামের সঙ্গে খেলেছেন। ১৯৭৬ সালে তাঁর নেতৃত্বে মোহামেডান ঢাকা প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগে চ্যাম্পিয়ন হয়। অ্যাথলেটিকসেও হাফিজ ছিলেন তারকা দৌড়বিদ। টানা তিনবার জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে পাকিস্তানের দ্রুততম মানব হয়েছিলেন। খেলোয়াড় ছাড়া ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে অনেকে দেশপরিচিতি ও তারকা খ্যাতি পান। এর মধ্যে মনিরুল হক চৌধুরী অন্যতম। জাতীয় নির্বাচনে তিনিও পরিচিত মুখ। নিজ এলাকা কুমিল্লা-৬ থেকে ১৯৮৮ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন। এবারও একই এলাকা থেকে বিএনপির হয়ে নির্বাচন করছেন। ঢাকা মোহামেডানের সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মোহামেডানের আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তার পেছনে তাঁর সাংগঠনিক ক্যারিশমাও অনন্য। ফুটবলার সংগ্রহ থেকে শুরু করে মোহামেডানের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পেছনে তাঁর পরিশ্রম স্মরণীয় হয়ে আছে। বিশেষ করে টানা তিনবার অপরাজিত লিগ চ্যাম্পিয়ন ও এশিয়ান ক্লাব কাপ ফুটবলে মোহামেডানের সাফল্যের পেছনে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ভোলার নয়। দেশে ফেডারেশন কাপ, ডামফা কাপ ও বিটিসি কাপ মাঠে নামানোর পেছনেও মনিরুল হকের বড় ভূমিকা ছিল।
আলী আসগার লবিকে অনেকে ক্রিকেটের লোক বলে চেনেন ও জানেন। ২০০১ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি মনোনীত হওয়ার পর দেশের ক্রিকেটে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়। তিনি সভাপতি থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আয়োজন করে। টেস্ট ইতিহাসে বাংলাদেশ প্রথম সিরিজটি জিতেছিল লবি সভাপতি থাকা অবস্থায়। ২০০১ সালে খুলনা-২ আসন থেকে প্রথমবার তিনি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেন। এবার খুলনা-৫ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন।
দেশের সাড়াজাগানো ফুটবলার-গোলরক্ষক আমিনুল হক এবারই প্রথম জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। ঢাকা-১৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী তিনি। ২০১০ সালে তাঁর নেতৃত্বে ঢাকায় এসএ গেমসে ফুটবলে বাংলাদেশ সোনা জিতেছিল। ২০০৩ সালে জাতীয় দলের একমাত্র শিরোপ জয়ের পেছনেও তিনি বড় ভূমিকা রাখেন। সেবার সাফের সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার পান আমিনুল। তাঁর নেতৃত্বে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব দুবার পেশাদার লিগে চ্যাম্পিয়ন হয়। একবার জেতান ফেডারেশন কাপ। ঢাকা মোহামেডানেরও অধিনায়ক ছিলেন আমিনুল। কোটি টাকার সুপার কাপ ও দুবার ফেডারেশন কাপ সাদা-কালোরা জিতেছিল তাঁরই নেতৃত্বে। মুক্তিযোদ্ধার হয়ে লিগ ও ফেডারেশন কাপে শিরোপার অংশীদার হয়েছেন তিনি। এবার আসা যাক ইশরাক হোসেন প্রসঙ্গে। এবারই প্রথম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন তিনি। ঢাকা-৬ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন। দেশের প্রখ্যাত ক্রীড়া সংগঠক মরহুম সাদেক হোসেন খোকা তাঁর বাবা। বাবার দেখানো পথ ধরেই তিনি ক্রীড়ার উন্নয়নে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। হয়েছেন জনপ্রিয় ক্লাব ব্রাদার্স ইউনিয়নের সভাপতি।