পেশাদার ফুটবলে মধ্যবর্তী দলবদল শেষ হয়েছে। এ কর্মসূচিতে দেশের বড় তিন ক্লাব বসুন্ধরা কিংস, আবাহনী ও মোহামেডান ছিল একেবারে নীরব। দ্বিতীয় লেগে শক্তি বাড়াতে তারা নতুন কোনো খেলোয়াড় সংগ্রহ করতে পারেনি। চেয়ে চেয়ে দেখেছে অন্যদের তৎপরতা। পেশাদার ফুটবল ইতিহাসে বড় তিন দলের এমন ভূমিকা এবারই প্রথম। কেন পারেনি তা কারোর অজানা নেই। তিন দলের ওপর ফিফার নিষেধাজ্ঞা ছিল বলেই তারা নতুন বিদেশি বা স্থানীয়দের দলে ভিড়াতে পারেনি। বিদেশি ফুটবলাররা ফিফার কাছে অভিযোগ করেছিল তাদের বকেয়া টাকা পরিশোধ করেনি। তিন ক্লাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ আবার বেশ পুরোনো। ক্লাবগুলো ধারণাই করতে পারেনি এমন ধাক্কা তারা খাবে।
মোহামেডান ক্লাবের বিপক্ষে যে বিদেশির টাকা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন তা ক্লাবের অনেক পরিচালকই প্রথমে স্মরণ করতে পারছিলেন না আদৌ এমন ঘটনা ঘটেছে কি না। পরে তারা বের করতে পেরেছেন এক ইরানিকে মোহামেডান মৌখিক আশ্বাস দিয়েছিল তুমি যদি অনুশীলনে কোচকে সন্তুষ্ট করতে পার অবশ্যই তোমাকে খেলাব। ২০২১-২২ মৌসুমে তার নাম রেজিস্ট্রেশন করা হলেও মাঠে নামানোর মতো যোগ্য মনে হয়নি। তারপরও ২/১টি ম্যাচে বদলি হিসেবে নামানো হয় এবং কিছু টাকাও দেওয়া হয়। খেলোয়াড়টি লিগ শেষ হওয়ার আগেই তার দেশে ফিরে যান।
মোহামেডান ক্লাব তাকে মনেও রাখেনি। অথচ এই খেলোয়াড়ই সম্প্রতি ফিফার কাছে চুক্তির প্রমাণ দেখিয়ে অভিযোগ করেছেন কয়েক হাজার ডলারের বকেয়ার। ফিফার চিঠি পেয়ে তো মোহামেডানের পরিচালকের মাথায় হাত। কারণ যে বকেয়ার অভিযোগ করেছেন খেলোয়াড়টি তা নাকি ওই সময়ে নিয়মিত খেলা বিদেশিদের সঙ্গেও করা হয়নি। ফিফা মোহামেডানের কোনো কথাই শুনতে চাচ্ছে না। বকেয়া শোধের নির্দেশ দিয়েছে এবং তারিখও নির্ধারণ করে দিয়েছে। মোহামেডান এখনো তার বকেয়া শোধ করেনি বলে দ্বিতীয় লেগের জন্য দলবদলও করতে পারেনি। অথচ তাদের খেলোয়াড় বদল করাই খুব জরুরি ছিল।
ঢাকা আবাহনীর বেলায় যে বিদেশি খেলোয়াড় অর্থ পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন সেই কাহিনী তো আরও অবাক করার মতো। জানা গেছে, আবাহনীর কোন পরিচালক ফিফার কাছে নালিশ করা সেই বিদেশি ফুটবলারের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন তা এখনকার কেউ জানেন না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরই বেশ কজন পরিচালক দেশ ছেড়েছেন। তাই ক্লাব নিশ্চিত না যে, এত টাকা দিয়ে এই বিদেশির সঙ্গে চুক্তি করলেন কে? যেটাই হোক অভিযোগ তো ফিফায় চলে গেছে। ফিফা নির্দেশও দিয়েছে বকেয়া পরিশোধের। তবে এটা ঠিক এত বড় ক্লাবের চুক্তির বিষয়টি কেউ জানে না তা কীভাবে হয়? আবাহনীর এক কর্মকর্তা জোর গলায় বলেছেন, ‘আমাদের ইতিহাসে নেই কারোর টাকা বাকি রাখার। এখন যে পরিস্থিতিতে পড়েছি তা সত্যিই বিব্রতকর।’
আসা যাক বসুন্ধরা কিংস প্রসঙ্গে। পেশাদার লিগের অভিষেক থেকেই তারা সর্বোচ্চ বাজেটে দল গড়ছে। কিংস খেলোয়াড়দের অর্থ বাকি রাখবে একে তো আশ্চর্য ঘটনাই বলা যেতে পারে। যেটাই হোক অভিযোগ তো জমা পড়েছে বিশ্ব ফুটবল অভিভাবক সংস্থার কাছে। অবাক করা ব্যাপার যে, তিন ক্লাবের বেলায় যে অভিযোগগুলো এসেছে তা বেশ পুরোনো। বকেয়া না পেয়ে তো এতদিন অপেক্ষা করার কথা না। প্রকৃত ঘটনা যে কী সেটাই রহস্য! যেটাই হোক এর জন্য দায়ী ক্লাবগুলো। তারা পেশাদার যুগে পেশাদারি মেনে বিদেশিদের সঙ্গে চুক্তি করবে না কেন? ফাঁকফোকর খুঁজে কেউ তো সুবিধাই নিতে পারে। তিন ক্লাবের এখন এতটা বিপদ যে, বিদেশিদের বকেয়া পরিশোধ করতে না পারলে সামনের মৌসুমে বিদেশিই খেলাতে পারবে না। সতর্ক থাকলে তো এমন হতো না। তা ছাড়া বাংলাদেশের ক্লাবগুলোর ওপর ফিফার নিষেধাজ্ঞা নতুন নয়। কয়েকদিন আগে ইয়ংমেন্স ফকিরেরপুল, ফেনী সকার, শেখ জামাল, শেখ রাসেল এমনকি বসুন্ধরা কিংসকেও ফিফা নোটিস দিয়েছিল। এরপরও বিদেশি খেলোয়াড়দের বেলায় এমন ঘটছে কেন? কথা উঠতেই পারে টাকা না পেলে কেউ কি অভিযোগ করবেন? আবার ব্ল্যাকমেইল করাটাও অসম্ভবের কিছু নয়। একজন ফুটবল বিশ্লেষক বলেছেন, ‘স্থানীয়দের বাকি রাখাটা কয়েকটি ক্লাবের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বিদেশিদের বেলায় যে হয় না তা উপলব্ধি করুক।’