ইতিহাস গড়ার মঞ্চে লাল রঙা জার্সি গায়ে মাঠে নামলেন বাংলাদেশের মেয়েরা। সুদূর অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচের দিকে দৃষ্টি ছিল বাংলাদেশের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর। প্রতিপক্ষ প্রবল প্রতাপ চীন। এশিয়ায় নারীদের ফুটবলে যারা একক আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে দশকের পর দশক ধরে। সেই দলটির বিপক্ষে বুকভরা সাহস নিয়ে লড়াইয়ে নামলেন আফঈদা খন্দকাররা। শক্তিমত্তার বিশাল ফারাকটা মাঠের লড়াইয়ে ফুটে উঠতে দেননি বাংলার বাঘিনীরা। চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছেন। শেষটায় ২-০ গোলের পরাজয় নিয়ে মাঠ ছাড়লেও মুগ্ধ করেছেন দর্শকদের। প্রতিপক্ষকেও বিস্মিত করেছেন।
চীনের দলে ১১ জন ফুটবলার ছিলেন, যারা গতবার নারী বিশ্বকাপে খেলেছেন। এ ১১ ফুটবলারের মধ্যে সাতজনই গতকাল খেলেছেন বাংলাদেশের বিপক্ষে। বাংলাদেশ এমন এক দলের বিপক্ষে এশিয়ান কাপে ইতিহাস গড়তে নেমেছে যারা নিয়মিত বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলে চলেছে। এশিয়ান কাপে যাদের রয়েছে ৯টি শিরোপা। তবে ম্যাচের পরিসংখ্যান অবাক করে দেওয়ার মতো। কোচ পিটার বাটলারের পরিকল্পনা প্রায় পুরোটাই কাজে লাগিয়েছেন আফঈদারা। যতটা সম্ভব বল দখলে রাখার চেষ্টা করেছেন। ম্যাচে ৪১ ভাগ সময় বল দখলে ছিল বাংলাদেশের। চীনের মতো দলের বিপক্ষে এ পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। চীন বাংলাদেশের গোলমুখে ২৬ বার আক্রমণে এসেছে। বাংলাদেশ আক্রমণ করেছে আটবার। চীনের অন টার্গেট শট ছিল ১৩টি। বাংলাদেশের ছিল দুটি। ডিফেন্সে শক্তি বাড়িয়ে গোলবার নিরাপদ করতে চেয়েছেন কোচ বাটলার। তবে মাঝ মাঠেও ছিল বাংলাদেশের দাপট। মণিকা, মারিয়া, ঋতুপর্ণারা দাপট দেখিয়েছেন। চীনের অর্ধে নিয়ে গেছেন বল। ম্যাচের ১৫তম মিনিটে চীনা দর্শকদের স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন ঋতুপর্ণা চাকমা। কাউন্টার অ্যাটাক থেকে বল পান তিনি। চাইনিজ এক ডিফেন্ডারকে পেছনে ফেলে ঋতুপর্ণা বলের দখল নেন। দ্রুততার সঙ্গে চীনের বক্সের দিকে এগিয়ে যান। চীনের গোলরক্ষক খানিকটা এগিয়ে ছিলেন। ৩০ গজ দূর থেকে ঋতুপর্ণা বাঁ পায়ে শট নেন। গোল মনে করে বাংলাদেশি সমর্থকরা উল্লাসে মেতে উঠেছিলেন। তবে চীনের গোলরক্ষক চেন চেন পেছনের দিকে শূন্যে লাফিয়ে গোল হতে দেননি। অসাধারণ এক শটটা বাংলাদেশের সমর্থকদের দীর্ঘদিন মনে থাকবে। ম্যাচের ৪৩ মিনিট পর্যন্ত চীনকে রুখে দিয়েছে বাংলাদেশ। ৪৪ মিনিটে চীনকে এগিয়ে দেন ওয়াঙ সুয়াঙ। তিনি একসময় টটেনহ্যাম এবং পিএসজির মতো সেরা ইউরোপিয়ান ক্লাবে খেলেছেন। গতবার বিশ্বকাপেও ছিলেন তিনি। দুই মিনিট পর ঝেঙ রুইয়ের গোলে ব্যবধান ২-০ করে নেয় চীনা মেয়েরা। মাত্র কয়েক মিনিটের এ ঝড়টাই চীনকে জয় এনে দেয়। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশ গোলবার নিরাপদ করার পাশাপাশি আক্রমণেও গেছে। তবে গোলের দেখা পাননি শামসুন্নাহাররা।
এশিয়ান কাপে প্রথমবারের মতো খেলতে নেমে পরাজিত হয়েছে বাংলাদেশ। তবে মন জয় করেছে সবার। প্রধান কোচ পিটার বাটলার ম্যাচের পর বলেছেন, ‘আমি চীনকে অভিনন্দন জানাতে চাই। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন তারা। আমার ফুটবলাররা তাদের সেরাটাই দিয়েছে মাঠে। আমি বলতে চাই, মেয়েরা অসাধারণ খেলেছে। তাদের নিয়ে আমি গর্বিত। অল্প কিছু সময়ের জন্য মনোযোগ ছুটে যাওয়ায় আমরা গোল হজম করেছি। না হলে তারা দারুণ খেলেছে।’ হঠাৎ করে এশিয়ান কাপের মতো বড় মঞ্চে নিয়মিত গোলরক্ষক রূপনাকে বসিয়ে রেখে মিলি আক্তারকে কেন নামালেন কোচ? বাটলার বলেন, ‘মিলি কিছু ভুল করেছে। তবে সে পুরো ম্যাচেই দারুণ কাজ করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এই ম্যাচে ভিত্তি স্থাপন করেছি। মেয়েরা কেমন খেলতে পারে তা প্রদর্শন করেছি। আমাদের আরও উন্নতি করতে হবে। এ মেয়েদের কোচিং করিয়ে আমি গর্বিত। তারা সাহসের সঙ্গে লড়াই করেছে।’