ঢাকা প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগে শুরুর দিকে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দল ছিল ভিক্টোরিয়া ও ওয়ান্ডারার্স। মূলত এ দুটি দলের মধ্যে শিরোপার লড়াই সীমাবদ্ধ থাকত। ১৯৫৭ সালে লিগে প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ঘরোয়া আসরে আলাদাভাবে জায়গা করে নেয় ১৯৩৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা মোহামেডান। তখন থেকেই আড়ালে পড়ে যায় ভিক্টোরিয়া। মোহামেডান ও ওয়ান্ডারার্সই হয়ে ওঠে প্রধান আকর্ষণ। ১৯৬০ সালে চ্যাম্পিয়নের পর ওয়ান্ডারার্স আর শিরোপা রেসে না থাকায় তাদেরও গুরুত্ব কমতে থাকে। অফিস দল ইপিআইডিসি (পরবর্তীতে বিআইডিসি, বিজেআইসি ও বিজেএমসি) আগমনের পর শুধু শক্তিশালী দলই গঠন করেনি শিরোপার খাতায় নাম লেখাতে থাকে। শিরোপা তখন ভাগাভাগি হতো মোহামেডান ও ইপিআইডিসির মধ্যে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত জনপ্রিয় দল হিসেবে মোহামেডান ও বিআইডিসির পাশাপাশি ওয়ান্ডারার্সের নামও উচ্চারিত হতো। কিন্তু ১৯৭২ সালে ঢাকা আবাহনী ক্রীড়াচক্রের অভিষেকের পর দৃশ্যটা পাল্টাতে থাকে। সেবার স্বাধীনতার পর প্রথম সিনিয়র ডিভিশন লিগে আবদুস সাদেকের নেতৃত্বে ঢাকা আবাহনী ক্রীড়াচক্র তাদের প্রথম ম্যাচ খেলে ১৯৭০ সালের চ্যাম্পিয়ন বিআইডিসির বিপক্ষে। স্বাধীনতার পর ইপিআইডিসির নাম বদলে বিআইডিসি রাখা হয়। ১৯৭২ সালের উদ্বোধনী ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র ছিল। অভিষেক আসরে দেশের সেরা খেলোয়াড়দের নিয়ে দল গড়ে আলোড়ন তুলেছিল আবাহনী। তবে সেবার আর লিগ শেষ হতে পারেনি। আবাহনী ও ওয়ান্ডারার্সের ম্যাচে ব্যাপক হট্টগোল হওয়ায় লিগ স্থগিত হয়ে যায়। পরে আর মাঠে গড়ায়নি। তবে পয়েন্ট তালিকায় শীর্ষে ছিল আবাহনী।
আবাহনী তারকা ফুটবলারদের নিয়ে দল গড়লেও জনপ্রিয়তার আসনে বসতে অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আবাহনীর খেলা মানেই ছিল সারা গ্যালারি তাদের বিরোধিতা করা। অথচ স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে বিআইডিসি প্রথম ও ১৯৭৪ দ্বিতীয় দল হিসেবে চ্যাম্পিয়ন হয় আবাহনী। ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর লিগের দ্বিতীয় রাউন্ডে গ্যালারির এক পাশ থেকে আবাহনী আবাহনী ধ্বনি উঠতে থাকে। ১৯৭৬ সালের শুরু থেকেই ঘরোয়া ফুটবলের দৃশ্য পুরোপুরি পাল্টে যায়। দেখা যায় গ্যালারি এক পাশে মোহামেডান আর আরেক পাশে আবাহনীর সমর্থকে ভরা। ওয়ান্ডারার্স ব্যর্থতার বৃত্তে বন্দি থাকায় মূলত তাদের সমর্থকরাই হয়ে ওঠে আবাহনীর সাপোর্টার।
১৯৭৬ সাল থেকেই দেশের ফুটবল মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া শুধু মোহামেডান-আবাহনীরই জয়গান। সেই থেকে দুই দল একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী ও চিরশত্রু হয়ে ওঠে। লিগ, ফেডারেশন কাপ, স্বাধীনতা কাপ, ডামফা কাপ, জাতীয় লিগ, বিটিসি কাপ দুই দলের ম্যাচ ঘিরে কত আনন্দ আর বেদনা যা কখনো ভোলবার নয়। ট্র্যাজেডি হচ্ছে আজ আবাহনী ও মোহামেডান যখন পেশাদার লিগে দ্বিতীয় লেগে খেলতে নামবে তা অনেকেরই জানা থাকবে না। কুমিল্লায় অল্প দর্শকে লড়াইটি অনুষ্ঠিত হবে। ভাবা যায় এই আবাহনী-মোহামেডানের ম্যাচ দেখতে গ্যালারি পরিণত হতো সমুদ্রে। সন্ধ্যায় খেলা থাকলেও দুপুর ১টার মধ্যেই গ্যালারি ভরে যেত। টিকিট না পেয়ে বাইরে হাজার হাজার দর্শকের ভিড়। টিভিতে চেয়ে থাকা আর কান পেতে থাকত রেডিওতে। এখনকার তরুণ-তরুণীরা কি বিশ্বাস করবে সেই উন্মাদনার কথা!
দেখতে দেখতে দুই দলের লড়াইয়ে ৫৩ বছর পূর্তি হতে চলেছে। ১৯৭৩ সালে লিগ থেকেই মোহামেডান আবাহনীর লড়াই শুরু। দুই দলের প্রথম ম্যাচে মোহামেডানের অধিনায়ক ছিলেন জাকারিয়া পিন্টু আর আবাহনীর আবদুস সাদেক। ১৯৭৫ সালে ব্রাদার্স ইউনিয়নের আগমনটা ঝলমলে মনে হলেও জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে ছিল অনেক দূরে। ১৯৭৯ সালে বিজেএমসি শেষবার চ্যাম্পিয়ন হয়। এরপর ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত লিগ বা অন্য ট্রফি ভাগাভাগি করত আবাহনী ও মোহামেডানই। ১৯৯৭-৯৮ মৌসুমে মুক্তিযোদ্ধা তাদরে দাপটে ভাঙন ধরায়। এরপর আরও কয়েকটি দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে কিন্তু মোহামেডান ও আবাহনীর জনপ্রিয়তার ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারেনি। মোহামেডানের পিন্টু, প্রতাপ, টিপু, মঞ্জু, হাফিজ উদ্দিন, নওশের, শরীফ, সান্টু, বাদল রায়, সালাম, গাফফার, রামা, কায়কোবাদ, মহসিন, ইলিয়াস, মনু, জসি, কায়সার হামিদ, কানন, সম্রাট হোসেন এমিলি, নকিব, সাব্বির, জুয়েল রানা, আরমান, আলফাজ, আমিনুল। আবাহনীর সাদেক, সালাউদ্দিন, অমলেশ, আশরাফ, নান্নু, টুটুল, চুন্নু, মোত্তালেব, বাবুল, জনি, আসলাম, ইউসুফ, মোনেম মুন্না, রুপু, রুমি, জাকির, বিপ্লব কত যে তারকা তা হিসাবে মেলানো মুশকিল। আবার উভয় দলে খেলে মাঠ কাঁপিয়েছেন এমন খেলোয়াড়রাও কম নয়। বিদেশিদের মধ্যে এমেকা, নালজেগার, বিজন তাহেরী, পাকির আলী, প্রেমলাল, চিমা, সামির সাকি, ঝুকভ, পলিন কভও সমর্থকদের হৃদয় জয় করেছেন। ১৯৭৩ থেকে ২০২৬ সালের ৫৩ বছর লড়াইয়ে দুই দল আজ লিগের ৯৫তম ম্যাচ খেলতে নামছে। কোনো সাড়াশব্দ আছে কি, বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কি হতে পারে।