লুসাইল স্টেডিয়ামের সেই রূপকথার রাত। গ্যালারিতে নীল-সাদা সমুদ্রের গর্জন, আর পেনাল্টি শুটআউটে স্নায়ুচাপ জয় করে বল জালে জড়ানো এক শান্ত কারিগর পাওলো দিবালা। মনে হচ্ছিল, ছত্রিশ বছরের আক্ষেপ মেটানোর সেই রাতে দিবালা খুঁজে পেয়েছিলেন তার পরম গন্তব্য। কিন্তু ফুটবলের বিধাতা বড়ই বিচিত্র। ২০২৬ বিশ্বকাপের ঠিক আগ মুহূর্তে এসে সেই ‘জুয়েল’ বা রত্নটিই এখন যেন এক ঝরা পালক। আর্জেন্টিনার ঘোষিত ৫৫ সদস্যের প্রাথমিক স্কোয়াডে ৩২ বছর বয়সি দিবালার নাম নেই। এই এক লাইনের সংবাদটি যেন আলবিসেলেস্তে ফুটবলে একটি যুগের নিঃশব্দ বিদায়ঘণ্টা। একটা সময় যাকে ভাবা হতো লিওনেল মেসির উত্তরসূরি, যার বাঁ-পায়ের জাদুতে মুগ্ধ ছিল ফুটবল বিশ্ব, সেই দিবালাই এখন লিওনেল স্কালোনির ছক থেকে পুরোপুরি ছিটকে গেছেন।
দিবালা ক্যারিয়ারে ইতালিয়ান ক্লাব ফুটবলে রাজত্ব করলেও জাতীয় দলে তিনি সবসময়ই ছিলেন মেসির ছায়া হয়ে। তার উত্থান ছিল আশাজাগানিয়া, কিন্তু পতন হলো বড়ই নিষ্ঠুর। দিবালার প্রধান শত্রু ছিল তার নিজের শরীর। পেশির চোট তাকে বারবার ছিটকে দিয়েছে মাঠ থেকে। বিশ্বজয়ী কোচ এখন অভিজ্ঞতার চেয়ে তরুণদের গতি আর প্রেসিং ফুটবলের ওপর বেশি ভরসা করছেন। হুলিয়ান আলভারেজ বা লাউতারো মার্তিনেসদের ভিড়ে দিবালা হারিয়েছেন তার অপরিহার্যতা। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের পর আর আকাশি-সাদা জার্সিতে নামা হয়নি তার। সর্বশেষ কোপা আমেরিকাতেও ছিলেন ব্রাত্য। রোমার জার্সিতে চেনা ছন্দে ফেরার চেষ্টা করলেও স্কালোনির মন গলাতে পারেননি এই ফরোয়ার্ড।
আর্জেন্টিনা ফুটবল এখন তারুণ্যের জয়গানে মুখরিত। স্কালোনির এই সাহসী সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে, আবেগের চেয়ে দলের ভারসাম্যই তার কাছে মুখ্য। এক সময়ের মহাতারকা দিবালার এই প্রস্থান যেন ফুটবলীয় ট্র্যাজেডির এক জীবন্ত দলিল। যে হাতে লুসাইলের ট্রফি ছুঁয়েছিলেন, সেই হাত আজ বিদায়ের মিছিলে। পাওলো দিবালা হয়তো আর কখনোই বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরবেন না, তবে নীল-সাদা ইতিহাসে তার সেই টাইব্রেকারের গোলটি চিরকাল এক সোনালি স্মৃতি হয়েই থাকবে। শেষ হলো এক রূপকথার, শুরু হলো নতুন প্রজন্মের অদম্য পথচলা।