এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস সাথে নিয়ে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি ফ্রান্স ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাচ্ছে। গত তিন দশকে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে ‘লে ব্লুস’রা। ১৯৯৮ সালে নিজেদের মাটিতে প্রথম শিরোপা জয় এবং এরপর ২০১৮ সালে রাশিয়ায় দ্বিতীয়বার সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরা ফরাসিরা এখন উত্তর আমেরিকার মাটিতে তৃতীয় মুকুটের খোঁজে মাঠে নামবে। গত বিশ্বকাপে রানার্স-আপ হওয়া এই দলটি এবার শিরোপা পুনরুদ্ধারের জন্য মরিয়া হয়ে আছে।
ফ্রান্সের ফুটবল ইতিহাসের সূচনা সেই ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ থেকেই। উরুগুয়ের মাটিতে আয়োজিত সেই আসরে মেক্সিকোর বিপক্ষে ৪-১ গোলের জয় দিয়ে তারা বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু করেছিল। লুই লরেন্ট সেই ম্যাচে বিশ্বকাপের ইতিহাসের প্রথম গোলটি করার কৃতিত্ব অর্জন করেন। যদিও সেই সময় দলটি খুব বেশি দূর এগোতে পারেনি, তবুও সেই শুরুটাই আজ ফ্রান্সকে ফুটবলের অভিজাত শ্রেণিতে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এরপর ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে জাঁ ফন্টেইন এক আসরে ১৩ গোল করে যে রেকর্ড গড়েছিলেন, তা আজও কেউ ভাঙতে পারেনি। ফন্টেইনের সেই জাদুকরি পারফরম্যান্সের ওপর ভর করে ফ্রান্স তৃতীয় স্থান অর্জন করে বিশ্বকে তাদের সামর্থ্যের জানান দেয়। সেই সাফল্যের ধারা অব্যাহত রেখে আশির দশকে মিশেল প্লাতিনির নেতৃত্বে দলটি আবারও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং ১৯৮৬ সালেও তৃতীয় স্থান দখল করে ফরাসি ফুটবলের সোনালি যুগের ভিত্তি স্থাপন করে।
ফরাসি ফুটবলের ইতিহাসে ১৯৯৮ সাল একটি মাহেন্দ্রক্ষণ হয়ে থাকবে। জিনেদিন জিদানের জাদুকরি নৈপুণ্যে ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে তারা প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বাদ পায়। সেই জয় ফ্রান্সের জাতীয় সংহতি ও ফুটবলের জনপ্রিয়তাকে এক নতুন মাত্রা দেয়। এরপর ২০০৬ সালে জিনেদিন জিদানের বিদায়ী আসরেও তারা ফাইনালে উঠেছিল কিন্তু পেনাল্টি শুটআউটে ইতালির কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় তাদের।
দিদিয়ের দেশমের কোচিংয়ে ফ্রান্স দল বর্তমানে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম স্থিতিশীল শক্তি। দেশম নিজে খেলোয়াড় হিসেবে ১৯৯৮ সালে ট্রফি জিতেছিলেন এবং ২০১৮ সালে কোচ হিসেবেও সেই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি ঘটান। তার অধীনে ফ্রান্স টানা দুইবার বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার গৌরব অর্জন করেছে। যদিও ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে তারা টাইব্রেকারে পরাজিত হয়, তবুও কিলিয়ান এমবাপ্পের হ্যাটট্রিক প্রমাণ করেছে যে ফরাসিরা কেন বিশ্বের সেরা।
২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য ফ্রান্সের দল এখন তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার এক দারুণ মিশ্রণ। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় কিলিয়ান এমবাপ্পে দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার সাথে আক্রমণভাগে আছেন উসমানে দেম্বেলে এবং উদীয়মান তারকা মাইকেল অলিসে। মাঝমাঠে অরেলিয়েন চুয়ামেনি এবং এডুয়ার্ডো কামাভিঙ্গার মতো প্রতিভারা খেলা নিয়ন্ত্রণ করছেন, যা ফ্রান্সকে যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্য এক বিশাল আতঙ্ক হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
রক্ষণেও ফ্রান্সের শক্তিমত্তা বিশ্বমানের। উইলিয়াম সালিবা, থিও হার্নান্দেজ এবং জুলস কুন্দের মতো ডিফেন্ডাররা ইউরোপের বড় বড় ক্লাবে নিজেদের প্রমাণ করে জাতীয় দলেও সেই দাপট বজায় রাখছেন। গোলপোস্টের নিচে মাইক মাইনান এখন ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। এই শক্তিশালী রক্ষণভাগ এবং গতিশীল আক্রমণভাগের সমন্বয়ই ফ্রান্সকে ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম ফেবারিট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ফ্রান্স তাদের ১৭তম বিশ্বকাপ মিশনে নামছে এবং এটি তাদের টানা অষ্টম অংশগ্রহণ। উত্তর আমেরিকার আসরে তারা ইরাক, নরওয়ে এবং সেনেগালের মতো দলগুলোর বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে লড়াই শুরু করবে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ফরাসি ভক্তরা আশা করছেন, ১৯৫৮ সালে ফন্টেইন বা ১৯৯৮ সালে জিদান যা করে দেখিয়েছিলেন, ২০২৬ সালে এমবাপ্পে ও তার দল সেই গৌরব আবারও ফিরিয়ে আনবেন।
বিডি প্রতিদিন/এনএইচ