সমরবিদদের ভাষায়, ‘প্রয়োজনই হলো আবিষ্কারের জননী। আর যুদ্ধের সময়ে এর চেয়ে বড় সত্য আর কোথাও নেই।’ কথায় আছে, যে জিতবে সে-ই সিকান্দার। তাই তো যুদ্ধের সবচেয়ে বাজে প্রবণতা হলো, এটি সব উদ্ভট ধারণাকেও গুরুতর প্রস্তাবে পরিণত করে। কারণ যখন ঝুঁকি যথেষ্ট বেশি হয়, তখন কোনো কিছুই খুব বেশি অস্বাভাবিক, খুব বেশি অবাস্তব কিংবা খুব বেশি হাস্যকর বলে মনে হয় না, এমনকি দ্বিতীয়বার ভাবার সুযোগও পাওয়া যায় না। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপার হলো, সেই উদ্ভট ধারণাগুলোর মধ্যে কিছু কিছু বাস্তবেও দেখা গিয়েছিল। এর মধ্যে কয়েকটি তো ‘বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি’ বা ‘সায়েন্স ফিকশন’ লেখকের অলীক গল্পের মতোই শোনায়। আর অন্যগুলো ছিল এমন ভীতিকর পরিকল্পনা; যা বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে বিপজ্জনকভাবে বদলে দেওয়া প্রান্তে চলে এসেছিল। সমর ইতিহাসে গোপনে বাতিল নথি (ডিক্লাসিফাইড ফাইল) এবং কোল্ড ওয়ারের সময়কার মাঝে মাঝে ফাঁস হওয়া তথ্যের সুবাদে আমরা এখন জানি যে, সামরিক নিরাপত্তার নামে পরাশক্তিগুলো কতদূর যেতে প্রস্তুত ছিল। ফলস্বরূপ এমন কিছু পরীক্ষানিরীক্ষা ও অস্ত্রের তালিকাও পাওয়া যায়; যা ইতিহাস এবং বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির সীমারেখাকেও ছাড়িয়ে যায়। সেসব অদ্ভুত ও ভয়ানক সামরিক প্রযুক্তি নিয়েই আজকের রকমারি-
‘অপারেশন ব্লু পিকক’
পঞ্চাশের দশকে ব্রিটেন জার্মানিতে পারমাণবিক বোমা পুঁতে রাখার পরিকল্পনা করেছিল। নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন ব্লু পিকক’। যার মাধ্যমে উত্তর জার্মানির নিম্নভূমিকে দগ্ধ নরকে পরিণত করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল...
আতঙ্কঘেরা পঞ্চাশের দশকে (স্নায়ুযুদ্ধকালীন) ব্রিটিশ সেনাবাহিনী তৈরি করেছিল এক অদ্ভুত গোপন প্রকল্প- ‘অপারেশন ব্লু পিকক’। উদ্দেশ্য, পশ্চিম জার্মানির মাটিতে পারমাণবিক মাইন পুঁতে রাখা (ছোট পারমাণবিক বোমা), যাতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ইউরোপ আক্রমণ করলে এক মুহূর্তে তাদের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেওয়া যায়। প্রতিটি মাইনের বিস্ফোরণশক্তি ছিল প্রায় ১০ কিলোটন, অর্থাৎ হিরোশিমার বোমার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। এগুলো টাইমার, রিমোট বা কম্পন সেন্সর- যে কোনো উপায়ে বিস্ফোরণ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু সমস্যা ছিল- জার্মানিতে শীতকাল। কনকনে ঠান্ডায় পারমাণবিক মাইনের রক্ষণাবেক্ষণ। অর্থাৎ শীতকালীন ঠান্ডায় যাতে মাইনের সূক্ষ্ম সার্কিট ও সুইচ জমে না যায়, সে সমস্যা সমাধানে ব্রিটিশ প্রকৌশলীরা দিলেন এক অবিশ্বাস্য প্রস্তাব প্রণয়ন করেন- সেটি মাইনের ভিতরে জীবন্ত মুরগি রাখা হবে! মুরগির শরীরের তাপ নাকি বোমাকে উষ্ণ রাখবে এবং সাত দিন পর্যন্ত সক্রিয় রাখবে। মুরগির জন্য খাবার ও পানিও বরাদ্দ ছিল, যদিও সেই সময়ের পর বোমা বিস্ফোরিত না হলে সে মারা যেত। প্রযুক্তি, তত্ত্ব আর পাগলামির এই অদ্ভুত মিশ্রণ ১৯৫৮ সালে শেষ পর্যন্ত বাতিল করা হয়, কারণ ইউরোপের ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে এত শক্তিশালী মাইন বসানো রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক ও পরিবেশের জন্য ভয়াবহ হতো। দীর্ঘদিন গোপন থাকার পর ২০০৪ সালে এই গোপন নথিপত্র যখন জনসমক্ষে আসে, তখন ইতিহাসে ‘অপারেশন ব্লু পিকক’ এমন এক প্রকল্প হিসেবে স্থান পায়- যেখানে সামরিক বুদ্ধিমত্তা আর মানবিক অযৌক্তিকতা মিলেমিশে তৈরি হয়েছিল এক অবিশ্বাস্য কাহিনি।

‘সাইকিক স্পাই’ পরীক্ষা
১৯৫০-৬০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন টেলিপ্যাথি, টেলিকাইনেসিস এমনকি ‘মৃত্যু-নজর’ সম্পর্কেও গবেষণা করে এবং সিআইএ তৈরি করে ‘রিমোট ভিউয়ার’, যা ছিল চোখ বন্ধ করে হাজার মাইল দূরের সামরিক স্থাপনার বিবরণ দেওয়া...
মানুষের মন কি দূর থেকে তথ্য গ্রহণ করতে পারে বা বস্তু না ছুঁয়ে নাড়াতে পারে? প্রশ্নটি আজকের দিনে হাস্যকর মনে হলেও, ১৯৫০-৬০-এর দশকে স্নায়ুযুদ্ধের পরিস্থিতিতে এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। নীতিনির্ধারকরা বিশ্বাস করতেন, মানুষের মনই হতে পারে ভবিষ্যতের সবচেয়ে গোপন অস্ত্র। পশ্চিমা গোয়েন্দাদের ধারণা ছিল, সোভিয়েতরা টেলিপ্যাথি, টেলিকাইনেসিস এবং এমনকি ‘মৃত্যু-নজর’ নিয়েও গবেষণা করছে। কেজিবি-সমর্থিত ল্যাবগুলো চেষ্টা করছিল, সৈনিকরা কি শুধু চিন্তার শক্তিতে বস্তু সরাতে পারে বা দূর থেকে শত্রুর পরিকল্পনা দেখতে পারে কি না। ‘ওরা যদি পারে, আমরা কেন পারব না?’ এই প্রতিযোগিতা থেকেই সিআইএ শুরু করে রহস্যময় ‘প্রোজেক্ট স্টারগেট’। এই কর্মসূচিতে ‘রিমোট ভিউয়ার’ তৈরি করা হয়, যারা চোখ বন্ধ করে হাজার মাইল দূরের সামরিক স্থাপনার ছবি আঁকার দাবি করতেন। ডিএআরপিএ-ও ১৯৭০-এর দশকে সাইকিক স্পাই গবেষণায় লাখ লাখ ডলার ঢালে। তাদের লক্ষ্য ছিল অবিশ্বাস্য- সাবমেরিন পানির নিচ থেকে দূর-অনুভূতিতে যোগাযোগ করবে, নভোচারীরা আগেই মহাকাশের বিপদ টের পাবে এবং মানসিক শক্তি দিয়ে যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। ১৯৭৩ সালের আরএএনডি করপোরেশনের প্রতিবেদন অনুসারে, দুই পরাশক্তিই সমান উৎসাহে অর্থ ঢালে, তবে গবেষণার ধরনে পার্থক্য ছিল। আমেরিকানরা মনোবিজ্ঞানে এবং সোভিয়েতরা বায়োলজি ও পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক ক্ষমতার যোগসূত্র খুঁজতে আগ্রহী ছিল। বহু বছর পরীক্ষার পর, ‘অতিমানবীয় ক্ষমতা’ প্রমাণিত হয়নি এবং প্রকল্পগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যায়।

কবুতরের মাধ্যমে বোমা পরিচালনা!
পায়রাদের বিশেষ হারনেসে আটকে, জাহাজ বা ভবনের ছবিতে ঠোকর মারার বিনিময়ে শস্যের দানা দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। ফলস্বরূপ, ‘ঠোকর-মারা বাহিনী’ ৪৫ মিনিটে ১০ হাজার বার ঠোকর মারতে পারত, যা যুদ্ধকালীন লক্ষ্যে নির্ভুল আক্রমণের জন্য যথেষ্ট ছিল!
আজকের পৃথিবীতে- আধুনিক ড্রোন, এআই বা সুনির্দিষ্ট-নির্দেশিত অস্ত্র এক বাস্তবতা। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তপ্ত সময়ে যুক্তরাষ্ট্র একসময় ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নয়- ভরসা রেখেছিল একদল প্রশিক্ষিত কবুতরের ওপর। আর সেই অদ্ভুত, রোমাঞ্চকর উদ্যোগের নেপথ্য নায়ক ছিলেন পরীক্ষামূলক মনোবিজ্ঞানের কিংবদন্তি বি.এফ. স্কিনার। ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটার এই গবেষক একদিন আকাশে উড়তে থাকা পাখির ঝাঁক দেখে হঠাৎ উপলব্ধি করেন- ‘এদের ক্ষিপ্রতা আর তীক্ষè দৃষ্টিশক্তি তো যে কোনো যন্ত্রের চেয়ে নিখুঁত। তাহলে কি একটি বোমাকে লক্ষ্যভেদ করতে ওরাই সাহায্য করতে পারে না?’ সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ‘প্রজেক্ট পিজিয়ন’, আমেরিকান সামরিক ইতিহাসের সবচেয়ে অদ্ভুত অথচ কার্যকর পরীক্ষাগুলোর একটি। স্কিনার পায়রাগুলোকে আচরণগত কন্ডিশনিংয়ের মাধ্যমে শেখাতেন, যদি লক্ষ্যবস্তুর ছবিতে ঠোকর দেওয়া যায়, পাওয়া যাবে খাবার। ধীরে ধীরে শস্যের পুরস্কার পিছিয়ে দিয়ে তিনি গড়ে তোলেন এমন সৈনিক, যারা নড়তে থাকা চিত্রকেও নির্ভুলভাবে ঠোকর মারতে পারে। ফল এতটাই চমকপ্রদ যে, প্রশিক্ষিত পায়রারা টানা ৪৫ মিনিটে ১০ হাজার বার পর্যন্ত ঠোকর দিতে সক্ষম হয়- একটি পড়ন্ত গ্লাইড-বোমা তার লক্ষ্য ধরতে যত সময় প্রয়োজন, তার চেয়েও বেশি। ক্ষুদ্র একটি সোনার ইলেকট্রোড লাগানো ছিল পাখির ঠোঁটে; পর্দার বাম বা ডান পাশে ঠোকর মানে বোমা সে দিকে ঘুরে যাওয়া। বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের ফুটেজ দিয়ে করা পরীক্ষাগুলোতেও সিস্টেম দুর্দান্তভাবে কাজ করেছিল। তবুও শেষ পর্যন্ত সামরিক নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নেয়- একটি দেশের প্রতিরক্ষা ‘একটি পাখির ঠোকরের’ ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। আর সেই সঙ্গে ইতিহাসের সবচেয়ে অদ্ভুত পাইলটদের দল যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছানোর আগেই অবসরে চলে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক ‘লেজার অস্ত্র’
আরেক প্রজন্মের ‘লেজার অস্ত্র’ এখন বাস্তবে এসেছে; যা গোলাবারুদমুক্ত, তাৎক্ষণিক লক্ষ্য নির্ধারণ ও কম খরচে চালানো যায়। তবে আবহাওয়া, শক্তি সরবরাহ ও লক্ষ্যবস্তুর প্রতিরোধ ক্ষমতায় খানিকটা সীমাবদ্ধতাও রয়েছে
কল্পবিজ্ঞান যেখানে বহু দশক ধরে লেজার অস্ত্রকে ভবিষ্যতের প্রতীক হিসেবে দেখিয়েছে, বাস্তব বিশ্বে সেই ভবিষ্যৎ আজ সমুদ্রের বুকে ছড়িয়ে পড়ছে। মার্কিন নৌবাহিনী ইতোমধ্যে কয়েকটি জাহাজে কার্যক্ষম লেজার কামান পরীক্ষা করেছে, এমন অস্ত্র যা ড্রোন গলিয়ে ফেলতে পারে, ছোট নৌকাকে অচল করতে পারে এবং আলোর গতিতে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারে। সবচেয়ে অবিশ্বাস্য তথ্য হলো, প্রতিবার গুলি চালাতে খরচ হয় মাত্র এক কাপ কফির সমান। ২০১৪ সালে ইউএসএস পন্স-এ প্রথম প্রকাশ্যে লেজার অস্ত্রের পরীক্ষা হয়; পরে ইউএসএস প্রেবল সেই ধারাকে আরও এগিয়ে নেয়। প্রচলিত বন্দুক যেখানে পশ্চাৎপসরণ, গোলাবারুদ ও পুনরায় লোডের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে লেজার যুদ্ধ ব্যবস্থার ধারণাই আলাদা-লক্ষ করুন, লক করুন, আর সঙ্গে সঙ্গেই ফায়ার। কোনো শব্দ নেই, নেই কোনো ধোঁয়ার কুণ্ডলী; শুধু নিখুঁতভাবে পরিচালিত শক্তির রশ্মি। যদিও আবহাওয়া, লক্ষ্যবস্তুর উপাদান ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ, তবুও এই প্রযুক্তিশক্তি অস্ত্রের যুগে প্রথম বাস্তব অগ্রগতি। এটি প্রচলিত যুদ্ধাস্ত্রকে প্রতিস্থাপন নয়, বরং সেগুলোর সক্ষমতাকে ভবিষ্যৎমুখী করছে। স্টার ওয়ার্স-এর ‘রে গান’ আর শুধু সিনেমার জগতে সীমাবদ্ধ নয়, তার প্রথম বাস্তব প্রতিধ্বনি এখন গভীর সমুদ্রে প্রতিফলিত হচ্ছে।

পুরোনো এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড প্রযুক্তির অবিস্মরণীয় গল্প
এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড ছিল তৎকালীন প্রযুক্তি অর্থাৎ সময়, গতি ও কিংবদন্তির এক অনন্য স্মারক
একটি বিমান কখন শুধু প্রযুক্তির নিদর্শন থাকে আর কখন তা কিংবদন্তি হয়ে ওঠে? এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড সেই প্রশ্নের নিখুঁত উত্তর। ১৯৬০-এর দশকে নির্মিত এই গুপ্তচর বিমানটিকে দেখলে মনে হয় যেন সায়েন্স ফিকশন থেকে বাস্তবে নেমে এসেছে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উঁচু প্রান্ত ছুঁয়ে ম্যাক ৩-এরও বেশি গতিতে উড়তে সক্ষম ছিল। তবে ব্ল্যাকবার্ডের আসল বিস্ময় লুকিয়ে ছিল তার গঠন-প্রক্রিয়ায়। ‘টাইটানিয়াম’ নির্মিত এই বিমানের ত্বক এতটাই তাপ-সংবেদনশীল ছিল যে, নিচু উচ্চতায় তা ইচ্ছাকৃতভাবে শিথিল রাখা হতো। ফলে উড্ডয়নের আগে ও ধীরগতিতে চলার সময় জ্বালানি ট্যাঙ্ক থেকে ফোঁটা ফোঁটা পড়ে যেত- একটি যুদ্ধবিমানকে এমনভাবে ‘লিক’ করার পরিকল্পনা ইতিহাসে বিরল। কিন্তু আকাশে গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা কয়েক শ ডিগ্রি বেড়ে টাইটানিয়াম প্রসারিত হতো এবং সব ফাঁক নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যেত। যেন উড্ডয়নের মাঝপথে বিমানটি নিজেকে নতুন করে গড়ে নিচ্ছে। পাইলটরা জানিয়েছেন, উচ্চগতিতে ব্ল্যাকবার্ড পুরো শরীরজুড়ে কয়েক ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়ে যেত, ঠিক যান্ত্রিক সাপের মতো। স্টিলথ প্রযুক্তিতেও এটি যুগের চেয়ে বহু এগিয়ে ছিল; রাডারে এর ছায়া খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। আজও দ্রুততম মানব-চালিত বিমানের রেকর্ড ধরে রেখেছে ব্ল্যাকবার্ড। আর তৎকালীন এই বিস্ময়কর আবিষ্কার প্রমাণ করে- প্রযুক্তির সীমা কখনো কখনো কল্পনারও বাইরে যেতে পারে।
অ্যান্টনভ এ-৪০-এর অবিশ্বাস্য কিন্তু অসম্ভব অভিযাত্রা
যুদ্ধের চাপ অনেক সময় এমন উদ্ভাবনের জন্ম দেয়, যা বাস্তবতার চেয়ে কার্টুনের দুনিয়ায় মানানসই মনে হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের অ্যান্টনভ এ-৪০ বা বিখ্যাত ‘উড়ন্ত ট্যাংক’, ঠিক তেমনই এক কল্পনাতীত পরীক্ষা। ১৯৪০-এর দশকের শুরুর দিকে সোভিয়েত প্রকৌশলীরা ভাবলেন যুদ্ধক্ষেত্রের কাছে নতুন এয়ারফিল্ড বানিয়ে সময় নষ্ট কেন? ট্যাঙ্কটিকেই যদি আকাশ পথে টেনে নিয়ে যেখানে দরকার ঠিক সেখানেই নামিয়ে দেওয়া যায়! এ ধারণার জন্ম থেকেই এ-৪০ তৈরি হয় একটি হালকা ট্যাঙ্ক, যার সঙ্গে যুক্ত ছিল বিচ্ছিন্নযোগ্য কাঠের ডানা এবং লেজ অ্যাসেম্বলি- ট্যাঙ্ক আর গ্লাইডারের অদ্ভুত সংমিশ্রণ। পরিকল্পনা ছিল সহজ যেমন- একটি বোমারু বিমান এটিকে টেনে নিয়ে যাবে, যুদ্ধক্ষেত্রের মাথার ওপর ছাড়বে, আর ট্যাঙ্কটি গ্লাইড করে নেমে এসে সঙ্গে সঙ্গেই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হবে। ১৯৪২ সালের পরীক্ষায় দেখা গেল- হ্যাঁ, ট্যাঙ্কটি গ্লাইড করতে পারে, কিন্তু মূল্য ছিল ভয়াবহ। টেনে নেওয়া বিমানটির ওপর চাপ এতটাই বেশি পড়ত যে, তা প্রায় বিধ্বস্ত হতো। একবারের পরীক্ষাই যথেষ্ট ছিল যে, এই ধারণা বাস্তব যুদ্ধের জন্য মোটেই উপযোগী নয়। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রকল্পটি বাতিল করা হয়। যদিও যুদ্ধক্ষেত্রে এর ব্যবহার হয়নি, তবে এটি আজও সোভিয়েত সৃজনশীলতার রঙিন প্রমাণ।

কল্পকাহিনি থেকে এক বাস্তব প্রযুক্তির দোরগোড়ায়
‘অদৃশ্য হওয়ার চাদর’- শুনতে অদ্ভুত শোনালেও দীর্ঘদিন ধরে যা কল্পবিজ্ঞান ও জাদুর দুনিয়ার অংশ- বাস্তবে এর সূত্র ধরেছিল বিংশ শতাব্দীর পেন্টাগনের গবেষণাগারে। ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকের শুরুতে ডারপা যোদ্ধা, ট্যাঙ্ক এবং বিমানকে শত্রুর চোখে কম দৃশ্যমান করার লক্ষ্যে অ্যাডাপটিভ ক্যামোফ্লাজ গবেষণায় বিরাট বিনিয়োগ করে। তাদের সবচেয়ে সাহসী দিকটি ছিল মেটামেটেরিয়ালস- এমন উপাদান, যা আলোকে প্রাকৃতিক নিয়ম ভেঙে ভিন্ন পথে বাঁকাতে পারে। প্রাথমিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ছোট বস্তু আড়াল করতে সফল হন; কিছু ক্ষেত্রে একটি বস্তুকে নির্দিষ্ট কোণ কিংবা সীমিত আলোকফ্রিকোয়েন্সির মধ্যে প্রায় সম্পূর্ণ অদৃশ্য করে ফেলা সম্ভব হয়েছিল। যদিও এগুলো এখনো হ্যারি পটারের কল্পিত চাদর থেকে বহু দূরে, ডিক্লাসিফাই হওয়া নথি বলে, সামরিক গবেষণা কল্পনার তুলনায় অনেক বেশি এগিয়ে গিয়েছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গবেষকরা এমন প্রোটোটাইপ তৈরি করেছেন, যা বস্তুর চারপাশ দিয়ে আলোকে ঘুরিয়ে নেয়- একটি আধুনিক ‘অদৃশ্যতার চাদর’-এর প্রাথমিক রূপ। এগুলো ভারী, সীমিত এবং খুব কাছ থেকে দেখলে ধোঁকা লাগে না, কিন্তু প্রযুক্তির দিকনির্দেশ স্পষ্ট। ডারপার ল্যাবে জন্ম নেওয়া অনেক প্রযুক্তিই শেষ পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে, এমনকি মানুষের জীবনেও পৌঁছায়।

সোভিয়েত ‘ডেড হ্যান্ড’ রহস্য ও শীতল যুদ্ধের আতঙ্ক
শীতল যুদ্ধের ছায়ায় ১৯৮০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন এমন এক প্রযুক্তি তৈরি করেছিল, যা শুনলেই মনে পড়ে কোনো ডিস্টোপিয়ান গেমের কাহিনি ডেড হ্যান্ড, আনুষ্ঠানিক নাম পেরিমিটার। এটি ছিল এক ধরনের স্বয়ংক্রিয় প্রতিশোধমূলক পারমাণবিক ব্যবস্থা, যার উদ্দেশ্য ছিল ভয়ংকরভাবে সরল, অর্থাৎ- সোভিয়েত নেতৃত্ব প্রথম আঘাতেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও যেন পাল্টা হামলা থেমে না যায়। ব্যবস্থাটি কাজ করত মাটির গভীরে ইনস্টল করা সেন্সর ও নজরদারি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। যা ভূকম্পন, তেজস্ক্রিয়তা এবং পারমাণবিক বিস্ফোরণের অন্যান্য সংকেত শনাক্ত করতে পারত। যদি এসব তথ্য সম্ভাব্য আক্রমণের ইঙ্গিত দিত এবং একই সঙ্গে ক্রেমলিনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত, তাহলে পেরিমিটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিশোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের কমান্ড দিতে পারত- অবশ্যই সংকটের সময় মানবীয় অনুমোদন দিয়ে এটি আগে থেকেই সক্রিয় করা থাকলে। ডেড হ্যান্ড তাই ছিল ডক্টর স্ট্রেঞ্জ লাভের কল্পিত ডুমসডে মেশিনের বাস্তব সংস্করণ- এক ভয়াবহ নিরাপত্তা বিমা, যার অস্তিত্বই মানব জাতির ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার প্রমাণ। এটি এখনো সক্রিয় কি না, তা রাশিয়ার সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ছাড়া কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না। তবে ডিক্লাসিফাই হওয়া তথ্য দেখায়, ব্যবস্থাটি সত্যিই একসময় মোতায়েন ছিল। এই অদৃশ্য যন্ত্র ভাবায় যে, ‘ভুল সংকেত’ বা ‘যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা’র ওপর কখনো কখনো টিকে ছিল পুরো জাতির ভবিষ্যৎ।

সূর্যকিরণ দিয়ে ধ্বংসের ভয়ংকর পরিকল্পনা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় নাৎসি জার্মানির উদ্ভাবনী ক্ষমতা অনেক সময় অবিশ্বাস্য উচ্চাকাক্সক্ষার উদাহরণ দেখিয়েছে। রকেট, জেট ফাইটার এবং বিশাল ট্যাঙ্কের সীমার বাইরে, তারা পরীক্ষা করেছিল এক অদ্ভুত পরিকল্পনা- ‘সান গান’। এই কল্পনাতীত ধারণা অনুযায়ী একটি বিশাল কক্ষপথের আয়না তৈরি করা হবে, যা সূর্যের আলোকে পৃথিবীর নির্দিষ্ট অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত করতে পারবে। তাত্ত্বিকভাবে, এটি একটি শহরকে আগুনে ভস্মীভূত করতে বা সমুদ্রের কোনো অংশকে বাষ্পীভূত করতে সক্ষম হতো। পরিকল্পনার পেছনে ছিলেন রকেট প্রযুক্তির অগ্রদূত হারমান ওবার্থ, যিনি পরে নাসার বিজ্ঞানী সমাজকেও প্রভাবিত করেছিলেন। গোয়েন্দা নথি প্রমাণ করে, এই ‘ডেথ রে’ প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে চরম ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষমতা অর্জন। তবে ভাগ্যক্রমে, ১৯৪০-এর দশকে এর বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি তখনো বহু দশক দূরে ছিল। ‘সান গান’ প্রকল্পের অস্তিত্ব শুধু নাৎসিদের উচ্চাকাক্সক্ষার পরিচয় দেয় না, এটি একটি সতর্কবার্তা দেয় যে মানব ইতিহাসে কল্পনার সীমা কখনো ভয়াবহ বাস্তবতার সঙ্গে মিলিত হতে পারে। যদি তাদের সেই প্রযুক্তি তখন উপলব্ধি হতো, তাহলে স্টার ওয়ার্স- এর নক্ষত্রযুদ্ধ কল্পকাহিনি না হয়ে মানব ইতিহাসের ভয়ংকর ডকুমেন্টারিতে পরিণত হতো।

মার্কিন নৌবাহিনীর ফোর্স ফিল্ড পরীক্ষা
কয়েক দশক ধরে হলিউডের কল্পকাহিনির এক অমূল্য বস্তু ছিল- ফোর্সফিল্ড। কিন্তু ২০১৪ সালে মার্কিন নৌবাহিনী সেই ধারণাকে বাস্তবের আরও কাছে নিয়ে গেল, যখন তারা আক্রমণ থেকে যানবাহন রক্ষার জন্য একটি প্লাজমা শিল্ড পেটেন্ট তৈরি করল। এই সিস্টেমটি লক্ষ্যবস্তু এবং আগত ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে অতিরিক্ত উত্তপ্ত গ্যাসের মেঘ ‘প্লাজমা’- উৎপন্ন করে। তৈরি হওয়া প্লাজমার প্রাচীর শত্রুর গোলা-গুলি প্রতিহত বা ব্যাহত করতে পারে, একই সঙ্গে ঝলমলে আলো এবং বিকট শব্দের মাধ্যমে আক্রমণকারীদের বিভ্রান্ত করে। কিছু ক্ষেত্রে, এই প্লাজমা শিল্ড এমনভাবে ডিজাইন করা যায় যে বিস্ফোরণের চেহারা নকল করা সম্ভব, ফলে শত্রু মনে করে তাদের হামলা সঠিক লক্ষ্যভেদ করেছে। পেটেন্ট পালসড লেজার এবং মাইক্রোওয়েভ ব্যবহার করে আকাশে প্লাজমাকে আকার দেওয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। যদিও প্রযুক্তিটি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে এবং কার্যক্ষম ‘শিল্ড’ হিসেবে ব্যবহারযোগ্য নয়। এটি প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের নতুন দিগন্তের সূচনা করে। এক সময় কেবল মহাকাশযানের জন্য সংরক্ষিত ধারণা আজ নৌবাহিনীর জাহাজকে আধুনিক ‘শক্তি বাধা’ দিতে চলেছে। হঠাৎ করেই ইউএসএস ডেস্ট্রয়ার এবং ইউএসএস এন্টারপ্রাইজের মধ্যে দূরত্ব কল্পনাপ্রসূত মহাকাশযুদ্ধের মতো মনে হয়। এ প্রকল্প দেখিয়ে দিয়েছে, সায়েন্স ফিকশন (কল্পকাহিনি) আর বাস্তবের সীমানা আদতে কতটা সংকীর্ণ হতে পারে।