২০২৫ সালকে পেছনে তাকিয়ে দেখলে মনে হয় এটি কেবল একটি ক্যালেন্ডারের বছর নয়, বরং মানুষের জ্ঞানভান্ডারের ভিতর দিয়ে ছুটে চলা এক মহাজাগতিক অভিযাত্রা। এ বছরে বিজ্ঞান আমাদের সময়ের সীমানা ভেঙে কখনো নিয়ে গেছে কয়েক লাখ বছর আগের আদিম মানুষের আগুন জ্বালানো সন্ধ্যায়, আবার কখনো কোটি কোটি বছর আগের পৃথিবীতে, যেখানে ডাইনোসরের পদচিহ্ন আজও নীরবে ইতিহাস লিখে রেখেছে। গবেষণাগারের সীমা ছাপিয়ে আবিষ্কারগুলো ছড়িয়ে পড়েছে জঙ্গল, মরুভূমি, সমুদ্রতল আর মহাকাশের গভীরতায়- প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভেঙেছে পুরোনো ধারণা, তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন...
২০২৫ সালের বিজ্ঞানযাত্রা ছিল এক মিশ্র অনুভূতির গল্প। যেখানে একদিকে আবিষ্কারের আনন্দ আছে, অন্যদিকে আছে বিশাল হিমশৈল ভেসে যাওয়ার মতো পরিবেশগত বিপদের আগাম সতর্কবার্তাও....
গোবরে ২০২৫ সাল যেন আমাদের জন্য এক মহাজাগতিক টাইম মেশিনে চড়ে বসার বছর হয়ে ধরা দিয়েছে। সময়ের চাকা কখনো কয়েক লাখ বছর পিছিয়ে গিয়ে আদিম মানুষের গুহায় জ্বালানো প্রথম আগুনের শিখা দেখাচ্ছে, আবার কখনো কয়েক কোটি বছর আগেকার কর্দমাক্ত ভূমিতে ডাইনোসরের রেখে যাওয়া বিশাল পদচিহ্নের গল্প বলছে। বিজ্ঞানের এই অগ্রযাত্রা কেবল গবেষণাগারের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা সমুদ্রের অতল গভীর থেকে শুরু করে মহাকাশের অসীম শূন্যতা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এক বছরের ছোট পরিসরে দাঁড়িয়ে আমরা এমন সব সত্যের মুখোমুখি হয়েছি, যা মানব বিবর্তন, পৃথিবী এবং মহাকাশ সম্পর্কে আমাদের চিরকালীন ধ্যানধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে।
এ বছরের অন্যতম বড় চমক ছিল ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডশায়ারের একটি খনিতে ডাইনোসরের বিশাল এক ‘হাইওয়ে’ আবিষ্কার। আজ থেকে প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি বছর আগে যে পৃথিবীতে মানুষের কোনো অস্তিত্বই ছিল না, সেই পৃথিবীতে হেঁটে বেড়ানো সিটিওসোরাস বা মেগালোসোরাসদের পায়ের ছাপগুলো আজ আমাদের অস্তিত্বের ক্ষুদ্রতাকে মনে করিয়ে দেয়। ১৫০ মিটার দীর্ঘ সেই পদচিহ্নের সারি যেন এক প্রাগৈতিহাসিক মানচিত্র, যা আমাদের আগের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে বলছে-জুরাসিক যুগের সেই দৈত্যরা কতটা সামাজিক বা পরিব্রাজক ছিল। ঠিক একইভাবে সাফোকের বার্নহ্যামে আবিষ্কৃত ৪ লাখ বছর আগের আগুনের চিহ্নটি আমাদের পূর্বপুরুষদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার প্রমাণ দেয়। যখন আমরা ভাবতাম আগুন জ্বালানোর বিদ্যা অনেক পরের উদ্ভাবন, তখন এ আবিষ্কার আমাদের বিবর্তনের মাইলফলকটিকে সাড়ে তিন লাখ বছর পিছিয়ে দিল। আগুন কেবল অন্ধকার দূর করেনি, তা খাবার রান্না করে আমাদের মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়তা করেছিল, যা আজকের পৃথিবীতে এ আধুনিক মানুষের জন্ম দিয়েছে।
প্রকৃতির রহস্যময় ভান্ডার থেকে আমরা শুধু অতীত নয়, বরং আমাদের নিকটতম আত্মীয়দের জীবন সম্পর্কেও চমকপ্রদ তথ্য পেয়েছি। উগান্ডার গহিন জঙ্গলে বন্য শিম্পাঞ্জিদের ভেষজ উদ্ভিদের মাধ্যমে নিজেদের ক্ষত সারানোর দৃশ্যটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই বিস্ময়কর। এটি প্রমাণ করে যে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের আদি পাঠ কেবল মানুষের একচেটিয়া অধিকার নয়; প্রকৃতির বুকেই লুকিয়ে আছে আরোগ্যের দাওয়াই, যা প্রাণিকুল প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ব্যবহার করে আসছে। আবার মানুষের আবেগীয় সম্পর্কের গভীরতা মাপতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা যখন আমাদের একগামিতার তুলনা করেন ক্যালিফোর্নিয়ান ইঁদুর বা মিরক্যাটের সঙ্গে, তখন আমরা বুঝতে পারি যে ভালোবাসার ব্যাকরণও অনেকটা জৈবিক ও বিবর্তনীয় চাহিদার ফসল।
মহাকাশ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গেল বছর আমাদের দুই হাত ভরে উপহার দিয়েছে। ফেব্রুয়ারির সেই সন্ধ্যায় আকাশের বুক চিরে যখন সাতটি গ্রহ এক সারিতে দাঁড়িয়েছিল, তা ছিল এক বিরল মহাজাগতিক কুচকাওয়াজ। বুধ থেকে শনি- সবাই যেন পৃথিবীর মানুষকে এক পরম অভিবাদন জানাতেই এমন সারিবদ্ধ হয়েছিল। এরপর চাঁদের মাটি বা ধুলোর নমুনা যুক্তরাজ্যে পৌঁছানো ছিল বিজ্ঞানের এক কূটনৈতিক ও গবেষণামূলক জয়। সোনার চেয়েও দামি সেই ধূলিকণাগুলো বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এখন চাঁদের জন্ম ও বিবর্তন নিয়ে নতুন রহস্যের জট খুলছেন। মহাকাশের এ বিশালত্বের পাশে পৃথিবীর সাগরতলে লুকিয়ে থাকা ২০০০ বছর আগের রোমান জাহাজ বা পম্পেইয়ের দেয়ালে আঁকা মদের দেবতা ডায়োনিসাসের চিত্রমালা মনে করিয়ে দেয়- আদি মানুষের শিল্প ও বাণিজ্য কতটা প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ ছিল।
প্রত্নতত্ত্বের পাতায় ২০২৫ যেন রহস্যে ঘেরা এক উপন্যাস। তুতমোস দ্বিতীয়-এর হারানো সমাধি খুঁজে পাওয়া বা লন্ডনের আধুনিক আকাশচুম্বী দালানের নিচে রোমান ব্যাসিলিকার অস্তিত্ব- সবই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা আসলে একটি চলমান ইতিহাসের ওপর দিয়ে হেঁটে চলি। স্কটল্যান্ডের সেই ৬০০০ বছরের পুরোনো কাঠের প্রাসাদটি যখন আবিষ্কৃত হয়, তখন তা স্টোনহেঞ্জের অহংকারকেও কিছুটা ম্লান করে দেয়। এ স্থাপনাগুলো শুধু কাঠ বা পাথরের স্তূপ নয়, এগুলো ছিল মানুষের বিশ্বাস, উপাসনা এবং সামাজিক কাঠামোর এক অনন্য সাক্ষী। ওডিসিউসের স্মৃতিবাহী উপাসনাস্থলটি প্রমাণ করে, কিংবদন্তি আর বাস্তবের সীমানা অনেক সময় এক বিন্দুতে মিশে যায়।
বিজ্ঞানের এ অগ্রযাত্রার সমান্তরালে নৈতিকতার এক নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছে বিলুপ্ত প্রাণীকে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা। কলোসাল বায়োসায়েন্সের ডায়ার উলফ বা প্রাগৈতিহাসিক নেকড়ে শাবক তৈরির উদ্যোগটি যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি তা বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি করেছে। বিলুপ্ত ডিএনএ থেকে প্রাণ ফিরিয়ে আনা কি বাস্তুতন্ত্রের জন্য শুভ হবে, নাকি আমাদের মনোযোগ দেওয়া উচিত বর্তমানের বিপন্ন প্রাণীদের রক্ষায়? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই ডেনিসোভান মানুষের অবয়ব উন্মোচন আমাদের পূর্বপুরুষদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের নতুন এক সমীকরণ তৈরি করেছে। ড্রাগন ম্যানের খুলি যখন ডেনিসোভান হিসেবে শনাক্ত হয়, তখন আমরা বুঝি মানব প্রজাতির শাখা-প্রশাখা কতটা বিস্তৃত!
প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ২০২৫ সাল আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে সৃজনশীলতা মানুষের জীবনকে আরও সহজ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে পারে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য স্মার্ট লিপস্টিক বা হাতের ইশারায় হুইলচেয়ার চালানোর নিউরাল ইয়ারবাড-এগুলো কেবল গ্যাজেট নয়, এগুলো হলো মানুষের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যম। পোকামাকড় ট্র্যাকিং ক্যামেরা যখন বাস্তুতন্ত্রের নীরব সৈনিকদের সুরক্ষা দিচ্ছে, তখন বাতাস থেকে পানি তৈরি করা কফি মেশিন আমাদের টেকসই জীবনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। মরুভূমির গুবরে পোকার কাছ থেকে ধার করা প্রযুক্তিতে যখন শূন্য বাতাস থেকে কফি তৈরি হয়, তখন বোঝা যায় যে প্রকৃতিই আসলে সেরা।
সব মিলিয়ে ২০২৫ সালের এই বিজ্ঞানযাত্রা ছিল এক মিশ্র অনুভূতির গল্প। যেখানে একদিকে আবিষ্কারের আনন্দ আছে, অন্যদিকে আছে বিশাল হিমশৈল ভেসে যাওয়ার মতো পরিবেশগত বিপদের সতর্কতা। ডাইনোসরের পায়ের ছাপ থেকে শুরু করে রোমান ফ্রেস্কোর উজ্জ্বল রং- সবকিছুই আমাদের অস্তিত্বের নিরবচ্ছিন্ন এক সুতোয় গেঁথে রাখে। এই এক বছরে আমরা যা পেয়েছি, তা হয়তো কয়েক দশকের গবেষণার খোরাক জোগাবে। প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম আর মানুষের অদম্য কৌতূহল- যখন এক বিন্দুতে মেলে, তখনই সৃষ্টি হয় এমন সব ইতিহাস, যা মনে করিয়ে দেয়- মহাবিশ্ব কত না অজানা বিস্ময় জমিয়ে রেখেছে।
১৬৬ মিলিয়ন বছর আগের ‘হাইওয়ে’
ভোরবেলার কুয়াশা ঘেরা অক্সফোর্ডশায়ারের আধুনিক কোনো খনিতে দাঁড়িয়ে যদি ভাবেন পায়ের নিচে কেবল পাথর আর মাটি, তবে ভুল করবেন! আপনার পায়ের নিচেই হয়তো লুকিয়ে আছে এক প্রাগৈতিহাসিক জগৎ, যেখানে একসময় দাপিয়ে বেড়াত ডাইনোসরের দল। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডশায়ারের ‘ডেওয়ার্স ফার্ম’ খনিতে বিজ্ঞানীরা ঠিক এমনই এক অবিস্মরণীয় ও বিশাল ‘ডাইনোসর ট্র্যাকওয়ে’ বা চলাচলের পথের সন্ধান পেয়েছেন। বিজ্ঞানীদের দাবি, এ পায়ের ছাপগুলো প্রায় ১৬ কোটি ৬০ লাখ (১৬৬ মিলিয়ন) বছরের পুরোনো। গবেষকরা খনির গভীরে ২০০টিরও বেশি বিশালাকার পায়ের ছাপ খুঁজে পেয়েছেন। এ ছাপগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সেখানে অন্তত পাঁচটি আলাদা আলাদা ‘ট্র্যাকওয়ে’ বা চলাচলের পথ রয়েছে। কোনো কোনো পথ প্রায় ২২০ মিটার পর্যন্ত দীর্ঘ, যা ইউরোপের মধ্যে দীর্ঘতম। যেন মনে হচ্ছে, কোটি বছর আগে ডাইনোসররা দলবেঁধে কোনো এক গন্তব্যে যাচ্ছিল, আর তাদের সেই যাত্রার মুহূর্তটি মাটির স্তরে চিরস্থায়ী হয়ে থমকে গেছে। প্যালিয়ন্টোলজিস্ট বা জীবাশ্ম বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পথে মূলত দুই ধরনের ডাইনোসরের আনাগোনা ছিল-
১. তৃণভোজী দানব ‘সোরোপড’ : দীর্ঘ গলার এ দৈত্যাকার প্রাণীগুলো ছিল চারপেয়ে। তাদের বিশালাকার পায়ের ছাপ দেখে বোঝা যায়, কত ভার নিয়ে তারা হেঁটেছিল।
২. মাংসাশী শিকারি ‘মেগালোসোরাস’: পাশাপাশি ছিল মেগালোসোরাস প্রজাতির ডাইনোসর। এরা দুই পায়ে চলা ক্ষিপ্র গতির শিকারি, লম্বায় প্রায় ৬ থেকে ৯ মিটার! গবেষকদের মতে, তখন এ অঞ্চলটি ছিল অত্যন্ত উষ্ণ এবং জলাভূমিতে ভরা। চারপাশে ছিল নাম না জানা সব লতাগুল্ম আর বিশাল গাছপালা। গবেষকদের ধারণা, খনির মাটির আরও গভীরে গেলে এমন আরও শত শত ট্র্যাকওয়ে এবং ডাইনোসরদের কঙ্কাল পাওয়া যেতে পারে।

সুচবিহীন ইনজেকশন, ভয় দূর করবে নতুন ‘প্রযুক্তি’
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে নার্সের হাতে চকচকে সুচ দেখে ঘামেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শিশু এবং এক-চতুর্থাংশ প্রাপ্তবয়স্কের রয়েছে তীব্র ‘নিডল ফোবিয়া’ বা সুচভীতি। এমনকি ২৭ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মীও শুধু এই ভয়ে নিয়মিত ফ্লু-ভ্যাকসিন নেওয়া থেকে দূরে থাকেন। কিন্তু যদি এমন হয় যে, ইনজেকশন দেওয়া হবে অথচ কোনো সুচই শরীরে ঢুকবে না? সায়েন্সফিকশন বলে মনে হলেও নেদারল্যান্ডসের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ফোবিমস ঠিক এ অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখিয়েছে। তাদের নতুন এ প্রযুক্তির নাম ‘বোল্ডজেট’। বোল্ডজেট প্রযুক্তিতে প্রচলিত ধাতব সুচের বদলে ব্যবহার করা হয়েছে লেজার। প্রশ্ন হলো- লেজার কি যন্ত্রণাদায়ক নয়? উত্তরটি সহজ- না। এ পদ্ধতিতে লেজার রশ্মি ব্যবহার করে ওষুধের তরলকে মুহূর্তের মধ্যে উত্তপ্ত করা হয়। ফলে তৈরি হয় অত্যন্ত উচ্চ গতিসম্পন্ন এবং সূক্ষ্ম এক ‘লিকুইড মাইক্রোজেট’ বা তরল প্রবাহ। এ প্রবাহটি এতটাই সূক্ষ্ম যে, তা মানুষের চুলের চেয়েও পাতলা! এটি চোখের পলকে ত্বকের ভিতর দিয়ে শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে যায়। সাধারণ সুচের তুলনায় এটি কম যন্ত্রণাদায়ক, রোগী অনুভূতি বোঝার আগেই কাজ শেষ হয়ে যায়। এতে চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনাবশত সুচের খোঁচা খাওয়ার ঝুঁকি দূর হবে। কোনো প্লাস্টিক বা ধাতব সুচ ব্যবহৃত হয় না, ফলে বিপুল পরিমাণ ‘বায়োমেডিকেল’ বর্জ্য কমবে। মাইক্রোজেট প্রযুক্তি ওষুধের সঠিক ডোজ ত্বকের গভীরে পৌঁছে দিতে পারে।

প্রাকৃতিক শূন্য বাতাস থেকে তৈরি হবে কফি!
কল্পনা করুন, প্রতিদিন সকালে কফি মেকারে আলাদা করে পানি না ভরেই আপনি এক কাপ তাজা কফি হাতে পাচ্ছেন। ঠিক এই জাদুকরি কাজটিই করে দেখিয়েছে ‘কারাপড’। যন্ত্রটি বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতাকে শোষণ করে তা থেকে প্রতিদিন ১৩ কাপ পানি তৈরি করতে পারে। পানি পরিষ্কার করার জন্য এতে রয়েছে একটি আল্ট্রাভায়োলেট (ইউভি) ফিল্টার এবং কফি তৈরির জন্য এটি পরিবেশবান্ধব উদ্ভিজ্জ কফি পড ব্যবহার করে। কারাপড মূলত ‘কারা ওয়াটার’ কোম্পানির একটি নতুন উদ্ভাবন, যারা আগে থেকেই বাসাবাড়িতে ব্যবহারের জন্য বাতাস থেকে পানি তৈরির যন্ত্র নির্মাণ করে আসছে। কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা কোডি সুদিন জানান, ছোটবেলায় নিজের বাড়িতে দূষিত কুয়োর পানি ব্যবহারের তিক্ত অভিজ্ঞতাই তাঁকে সুপেয় পানির একটি উদ্ভাবনী উৎস তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এ প্রযুক্তির নকশা তৈরিতে তিনি নামিবিয়ান মরুভূমির এক বিশেষ ধরনের গুবরে পোকার থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন, যারা নিজেদের খোলসের সাহায্যে বাতাস থেকে পানি সংগ্রহ করতে পারে। এ বছরের শেষের দিকে ২৯৯ ডলার মূল্যে কারাপড পাওয়া যেতে পারে।

স্মৃতিশক্তি থাকবে কবজিতে ভুলে যাওয়ার দিন কি তবে শেষ?
আচ্ছা, এমনকি কখনো হয়েছে যে, আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা বা তথ্য গুলিয়ে ফেলেছেন? যা কোনোভাবেই মনে করতে পারছেন না? আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এই অতি পরিচিত ‘ভুলে যাওয়ার’ রোগ সারাতে এবার বিজ্ঞানের হাত ধরে আসছে এক জাদুকরি সমাধান- ‘বি পাইওনিয়ার’। কবজিতে পরার এই ছোট্ট ব্রেসলেটটি মূলত আপনার একটি ‘আউটসোর্সড ব্রেন’ বা সহায়তাকারী মস্তিষ্ক হিসেবে কাজ করবে। স্মার্টওয়াচের মতো দেখতে গ্যাজেটটি আপনার চারপাশে হওয়া প্রতিটি কথোপকথন অত্যন্ত নিপুণভাবে খেয়াল রাখে। তবে ভয়ের কিছু নেই; নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে এটি কোনো অডিও রেকর্ড জমা রাখে না। বরং আপনার চারপাশের কথাগুলোকে এটি তাৎক্ষণিকভাবে লিখিত টেক্সটে রূপান্তর করে ফেলে। বি পাইওনিয়ার শুধু কথা রেকর্ড করেই ক্ষান্ত হয় না, এর সঙ্গে থাকা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অ্যাপটি সারা দিনের ট্রান্সক্রিপ্ট বিশ্লেষণ করে আপনাকে প্রয়োজনীয় তথ্য মনে করিয়ে দেবে। যেমন সকাল ৮টায় হয়তো আপনার স্ত্রী আপনাকে ময়লা পরিষ্কার করার কথা বলেছিলেন-বি পাইওনিয়ার ঠিক সময়ে মোবাইলে নোটিফিকেশন পাঠিয়ে আপনাকে মনে করিয়ে দেবে, ‘মনে আছে তো? ময়লা পরিষ্কার করতে হবে!’ এর আগে বাজারে আসা অনেক ‘এআই উইয়্যারেবল’ ব্যর্থ হলেও ‘বি পাইওনিয়ার’ নিয়ে আশাবাদী প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা।

আপনার বাগানে থাকবে
এআই ‘পাহারাদার’
ভেবে দেখুন, এক সকালে ঘুম থেকে উঠে জানালার পাশে কফি হাতে দাঁড়িয়েছেন আর আপনার স্মার্টফোনে একটি নোটিফিকেশন এলো- ‘একটি প্রজাপতি এই মাত্র বাগানের গাঁদা ফুলে বসেছে!’ শুনতে কল্পবিজ্ঞানের মতো মনে হলেও এ অভিজ্ঞতা দিতেই বাজারে আসছে ‘পেটাল’ নামের ইনসেক্ট-ট্র্যাকিং ক্যামেরা। দেখতে একদম উজ্জ্বল কমলা রঙের একটি ফুলের মতো ক্যামেরাটি নকশা করা হয়েছে গাছের কাণ্ডের আদলে। ফলে বাগানের ঝোপঝাড়ের সঙ্গে এটি অনায়াসেই মিশে যায়। কিন্তু এর ভিতরে লুকিয়ে আছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। এটি প্রতিটি মৌমাছি, প্রজাপতি বা পোকাকে আলাদাভাবে চিনতে পারে। পোকাগুলো কখন আসছে, কোন ফুলটি তাদের বেশি পছন্দ- সবই রেকর্ড করবে এই অত্যাধুনিক ডিভাইস। কেবল পোকামাকড় নয়, বীজের অঙ্কুরোদগম বা চারা গাছ বেড়ে ওঠার মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রাকৃতিক পরিবর্তনগুলোও নজরে রাখে। যারা শহরের বারান্দা বা জানালায় বাগান করেন, তাদের জন্য আছে ‘ওয়ান্ডার ব্লকস’। যা অল্প জায়গায় পরাগবাহী পোকাদের আকর্ষণ করতে সক্ষম।

মাটির নিচে ২ হাজার বছর আগের
‘রোমান লন্ডন’
লন্ডনের ‘সিটি অব লন্ডন’ এলাকায় খননকাজ চলার সময় আবিষ্কৃত হয়েছে এক বিশাল ‘রোমান ব্যাসিলিকা’-এর ধ্বংসাবশেষ। প্রায় ২০০০ বছর আগে, যখন লন্ডনের নাম ছিল ‘লন্ডিনিয়াম’, তখন এটি ছিল রোমান ব্রিটেনের প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক হৃৎপিণ্ড। সে সময় ‘ব্যাসিলিকা’ বলতে কেবল ধর্মীয় উপাসনালয় বোঝাত না। বরং এটি ছিল শহরের প্রধান কেন্দ্রস্থল- অর্থাৎ একধারে আদালত, অন্যদিকে বাণিজ্যিক বাজার এবং জনসমাবেশের প্রধান স্থান। আজ আমরা যেমন বড় বড় শপিং মল বা সচিবালয় দেখি, লন্ডিনিয়ামের বাসিন্দাদের কাছে এই ব্যাসিলিকা ছিল ঠিক তেমন। যুক্তরাজ্যে এ পর্যন্ত যত রোমান স্থাপনা পাওয়া গেছে, তার মধ্যে এটি অন্যতম বৃহৎ এবং আশ্চর্যজনকভাবে সংরক্ষিত। ২০০০ বছর ধরে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকলেও এর দেয়াল এবং মেঝে এতটাই সুরক্ষিত যে, তা দেখে প্রত্নতত্ত্ববিদরা বিস্মিত। যা অবশ্যই রোমানদের উন্নত প্রকৌশল জ্ঞান এবং নগর পরিকল্পনার এক জ্যান্ত দলিল।

ইশারায় চলবে কম্পিউটার
দাঁত চাপলে জ্বলবে বাতি
একসময় মনে করা হতো- চোখের ইশারায় বা মাথার সামান্য নড়াচড়ায় যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করা কেবল সিনেমেটিক দৃশ্যেই সম্ভব। পরবর্তীতে এলো নিউরাল ইমপ্লান্ট- যা কাজ করলেও মস্তিষ্কে জটিল অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতো। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতাকে জয় করে প্রযুক্তি এখন পৌঁছে গেছে আমাদের কানের ছিদ্রে! সম্প্রতি উন্মোচিত হয়েছে ‘নাকি নিউরাল ইয়ারবাডস’, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সংজ্ঞা বদলে দিতে প্রস্তুত। এই নিউরাল ইয়ারবাডটি কোনো অস্ত্রোপচার ছাড়াই বাইরে থেকে মস্তিষ্কের সংকেত এবং মুখের সূক্ষ্ম সব পেশির নড়াচড়া শনাক্ত করতে পারে। এটি কেবল গান শোনার যন্ত্র নয়, বরং এটি আপনার শরীরের একটি অংশ হয়ে কাজ করে। চাইলে দাঁত চেপে ঘরের লাইট অন বা অফ করতে পারেন। সোফায় শুয়ে মাথাটা সামান্য ডান দিকে কাত করলেই বাড়বে-কমবে টিভির ভলিউম। এমনকি এটি ব্যবহার করে চালানো যাবে কম্পিউটার বা ইলেকট্রিক হুইলচেয়ার। এই উদ্ভাবন কেবল ব্যবহারকারীদের মধ্যেই নয়, বরং বিশেষজ্ঞ মহলেও সাড়া ফেলে দিয়েছে।

আকাশে গ্রহদের মহা-কুচকাওয়াজ
মিলবে ২০৪০ সালে!
রাতের আকাশের দিকে তাকালে আমরা সাধারণত চাঁদ আর দু-একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র বা গ্রহ দেখতে পাই। কিন্তু ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির কয়েকটি সন্ধ্যায় মহাকাশের বিশাল মঞ্চে একই সারিতে এসে দাঁড়াবে সৌরজগতের সাত-সাতটি গ্রহ! যেন পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এক বিরল কুচকাওয়াজে অংশ নিচ্ছে। যেখানে অংশ নেয়- বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুন। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, পৃথিবীর প্রতিবেশী এ সাতটি গ্রহ একই সময়ে সন্ধ্যার আকাশে নিজেরা উপস্থিত হয়েছিল। যা ছিল পৃথিবীর বুক থেকে দৃশ্যমান এক অভাবনীয় দৃশ্য। গ্রহগুলো নিজ নিজ কক্ষপথে ভিন্ন ভিন্ন গতিতে ঘোরে। তাই তাদের এভাবে একই ফ্রেমে আসা বা একই লাইনে দাঁড়ানোর ঘটনা অত্যন্ত বিরল। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, এবারের এই সাজ বিন্যাসটি এতটাই নিখুঁত ও স্পষ্ট যে, এমন সুযোগ আর নিকট ভবিষ্যতে মিলবে না। এমন দৃশ্য দেখার সুযোগ আবার আসবে ২০৪০ সালে।

মানুষের আগুন জ্বালানোর ঐতিহাসিক ইতিহাস
চারদিকে অন্ধকার আর হিংস্র বন্য পশুর ভয়। এমন সময়ে একটি আগুনের কুণ্ডলী- একই সঙ্গে উষ্ণতা দেয়, নিরাপত্তা দেয়, দেখায় বেঁচে থাকার নতুন স্বপ্ন। এত দিন ভাবা হতো মানুষ আগুন জ্বালানোর কৌশল শিখেছে তুলনামূলক পরে। কিন্তু ইংল্যান্ডের সাফোক কাউন্টির এক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার যেন সব বদলে দিল। সাফোকের বার্নহ্যাম বা বিচেস পিট নামক স্থানে বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন কয়লা এবং পোড়া হাড়ের টুকরো, যার বয়স প্রায় ৪ লাখ বছর। এটি প্রমাণ করে যে, আধুনিক মানুষের বিবর্তনের অনেক আগে মানুষ আগুনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। গবেষকদের মতে, এটি কোনো দাবানল ছিল না; বরং মানুষ নিজের প্রয়োজনে নিয়মিত আগুন জ্বালাত। তা ছাড়া এ আবিষ্কার মানুষের জীবনে তিনটি প্রধান পরিবর্তন আনে। ১. আগুনের আঁচে মাংস নরম হওয়ার কারণে চিবানোর কষ্ট কমে যায়। ২. আগুন রাতের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে অন্ধকারে আগুনের চারপাশে বসে গল্প করা এবং সামাজিক বন্ধন তৈরির সুযোগ করে দেয়। ৩. হিংস্র প্রাণীদের হাত থেকে বাঁচতে আগুন হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় অস্ত্র। আর এ আবিষ্কার আমাদের ধারণাকে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার বছর পিছিয়ে দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে, ৪ লাখ বছর আগের ‘আদিম’ মানুষ অনেক বুদ্ধিমান ছিল।

ফারাও তুতমোস দ্বিতীয়র হারানো সমাধির খোঁজ
মিসরের দক্ষিণাঞ্চলের ভ্যালি অব দ্য কিংসে প্রত্নতত্ত্ববিদরা আবিষ্কার করেছেন ১৮তম রাজবংশের ফারাও তুতমোস দ্বিতীয়র হারানো সমাধি। খ্রিস্টপূর্ব ১৪৯৩ থেকে ১৪৭৯ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করা তুতমোস দ্বিতীয় ছিলেন মিসরের এক শক্তিশালী শাসক। তাঁর শাসনকাল সম্পর্কে ঐতিহাসিক তথ্য থাকলেও এতদিন তাঁর সমাধির অবস্থান ছিল অজানা। রাজাদের উপত্যকায় অধিকাংশ ফারাওয়ের সমাধি আবিষ্কৃত হলেও তুতমোস দ্বিতীয় যেন দীর্ঘদিন ইতিহাসের আড়ালেই ছিলেন। সম্প্রতি উপত্যকার এক নির্জন এলাকায় পাথর ও বালির স্তর সরাতে গিয়ে একটি প্রাচীন প্রবেশপথের সন্ধান পান গবেষকরা। ভারী পাথরের দরজা খুলতেই চোখে পড়ে প্রায় ৩ হাজার বছরের পুরোনো, অক্ষত এক রাজকীয় সমাধিক্ষেত্র। ভিতরে পাওয়া গেছে প্রাচীন কাঠের আসবাব, রাজকীয় কারুকার্য, অমলিন দেয়ালচিত্র এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য রাখা নানা অলংকার ও সামগ্রী। এসব নিদর্শন বিশ্লেষণ করে গবেষকরা নিশ্চিত হয়েছেন- এটিই ফারাও তুতমোস দ্বিতীয়র শেষ শয্যা। মিসরের পুরাতত্ত্ব পরিষদের মহাসচিব মোহামেদ ইসমাইল খালেদ এ আবিষ্কারকে ‘সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজকীয় সন্ধান’ বলে অভিহিত করেছেন।

শিম্পাঞ্জি ডাক্তার, নিজেরাই সারাচ্ছে চোট-অসুখ
মানুষ অসুস্থ হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়। কিন্তু বনের গভীরে বসবাসকারী শিম্পাঞ্জিরা অসুস্থতা বা আঘাত পেলে কী করে? উগান্ডার রেইন ফরেস্টে চালানো এক দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এমনই এক বিস্ময়কর তথ্য পেয়েছেন- বন্য শিম্পাঞ্জিরা নিজেরাই রোগ ও চোটের চিকিৎসা করে, তাও জঙ্গল থেকেই সংগ্রহ করা প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় কয়েক দশক ধরে শিম্পাঞ্জিদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন। গবেষণায় দেখা যায়, শরীরে ক্ষত বা আঘাত লাগলে শিম্পাঞ্জিরা নির্দিষ্ট কিছু ঔষধি গাছের পাতা ও লতা বেছে নেয়। সেগুলো চিবিয়ে বা পিষে ক্ষতস্থানে লাগায় তারা। আবার পেটের সমস্যা হলে লতাপাতা খায়, যা অ্যান্টিবায়োটিকের মতো কাজ করে।