৩ জানুয়ারি, ভোর। মার্কিন বোমারু বিমানের হামলায় কেঁপে ওঠে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস। কিছুক্ষণ পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে আকাশপথে দেশটির বাইরে নিয়ে গেছে মার্কিন সেনারা। সঙ্গে প্রকাশ হয় চোখ বাঁধা, হাতকড়া পরানো মাদুরোর ছবি। একজন ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানকে সরাসরি বন্দি করার এ ঘটনা যেন সিনেমাকেও হার মানিয়েছে। দেশটির মূল্যবান খনিজ সম্পদ ও তেলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বলা হচ্ছে, মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে করা হবে বিচারের মুখোমুখি...
যেভাবে আটক হন
গত সেপ্টেম্বর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা উপকূলে বিশাল নৌবহর মোতায়েন করে। ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পাচারের অভিযোগে একের পর এক বিমান ও নৌ অভিযান চালানো হয়। ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজও জব্দ করা হয়। এসব অভিযানে অন্তত ১১০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানায় বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা। ভেনেজুয়েলা সরকার পাল্টা অভিযোগ করে, বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুত দখল করাই যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য। ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই মাদুরোকে সরাসরি নিশানা বানান। তিনি মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসন উসকে দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে বিশ্বের শীর্ষ মাদক পাচারকারীদের একজন হিসেবে অভিযুক্ত করে তাঁর মাথার দাম ৫ কোটি ডলার ঘোষণা করে। নভেম্বরের শেষ দিকে ট্রাম্প মাদুরোকে ক্ষমতা ছাড়ার সময়সীমা বেঁধে দিয়ে নিরাপদে দেশ ছাড়ার প্রস্তাব দেন। মাদুরো তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তিনি ‘দাসের শান্তি’ চান না। ভেনেজুয়েলা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অবনতি শুরু হয় ১৯৯৯ সালে হুগো শ্যাভেজ ক্ষমতায় আসার পর। সমাজতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী শ্যাভেজ যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের বিরোধিতা করেন এবং কিউবা ও ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন। ২০০২ সালের অভ্যুত্থান চেষ্টার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার মৃত্যুর পর ২০১৩ সালে মাদুরো ক্ষমতায় আসেন। মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিরোধী দমনপীড়নের অভিযোগে সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়। ২০১৯ সালে ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরো সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করে হুয়ান গুয়াইদোকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ ওঠে। বিরোধীদের দাবি, প্রকৃত বিজয়ী ছিলেন এডমুন্ডো গঞ্জালেস, কিন্তু মাদুরো শক্তি প্রয়োগ করে ক্ষমতা ধরে রাখেন। ডিসেম্বরের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন ‘ট্রাম্প করোলারি’ নামে একটি নীতি ঘোষণা করে। এতে বলা হয়, পশ্চিম গোলার্ধের রাজনীতি, অর্থনীতি ও খনিজ সম্পদ আহরণ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে এবং প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহার করা হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নীতিই ভেনেজুয়েলা অভিযানের আদর্শিক ভিত্তি তৈরি করে। ৩ জানুয়ারি ভোরে ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরু হয়। ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে রাত ২টার দিকে আকস্মিক বিস্ফোরণ শুরু হয়। শহরজুড়ে অন্তত ৭৯টি বিস্ফোরণ ঘটে। লক্ষ্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা যেমন ফুয়ের্তে তিউনা ঘাঁটি, লা কার্লোটা এয়ারবেস ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের সমাধি কুয়ের্তেল দে লা মনতানিয়া। অন্তত ৯টি সামরিক হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়, যার মধ্যে এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি ও এএইচ-১ জেড ভাইপার ছিল। এরা লক্ষ্যবস্তুতে রকেট ও ভারী গোলাবর্ষণ চালায়। বড়দিনের আগে থেকে এই সামরিক প্রস্তুতি চলে। সিআইএ, ব্রিটিশ এমআই-৬ ও ইসরায়েলের মোসাদ যৌথভাবে স্থানীয় নেটওয়ার্ক, ‘কাট-আউট’ এবং চাপ সৃষ্টি করে দেশে ‘গ্রাউন্ড সফটেনিং’ করেছে। সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে প্রথমে অবহিত করা হয় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। হামলার পরপরই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র দেশটির তেল ও খনিজ সম্পদ দখলের লক্ষ্যেই এ হামলা চালিয়েছে। এর কিছুক্ষণ পরেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে আটক নিকোলাস মাদুরোর একটি ছবি প্রকাশ করেন। ছবিতে ধূসর পোশাক পরা মাদুরোর চোখ বাঁধা এবং হাতে একটি পানির বোতল দেখা যায়। ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র বড় আকারের সফল অভিযান চালিয়ে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে দেশের বাইরে নিয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের চালানো অভিযানে অন্তত ১০০ জন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলো। কিউবা জানায়, ভেনেজুয়েলায় অবস্থানরত তাদের সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজন সদস্যও ওই অভিযানে নিহত হয়েছেন। অভিযানের সময় মাদুরোর সঙ্গে আটক করা তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের মাথায় আঘাত লাগে, আর প্রেসিডেন্ট মাদুরো পায়ে আঘাত পান।
যে কারণে হামলা
মাদক
মাদুরো এবং তাঁর সহযোগীরা আমেরিকায় অবৈধ ওষুধ পাঠানোর সঙ্গে যুক্ত বলে মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ। ‘ট্রেন ডি আরাগুয়া’ ও ‘কার্টেল ডি লস সোলস’কে বিদেশি সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে যুক্তরাষ্ট্র। ভেনেজুয়েলা ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোকেনের ট্রানজিট দেশ হিসেবে পরিচিত।
তেল
ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেলের মজুত রয়েছে। মাদুরো বরাবরই অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র মূলত ভেনেজুয়েলার তেল চাইছে, যা বর্তমানে বেশির ভাগই চীনের কাছে বিক্রি হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, তেল ভেনেজুয়েলার সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল বিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার বলেই যুক্তরাষ্ট্রের নজর এখানে।
অভিবাসন
২০১৩ সাল থেকে প্রায় ৮ মিলিয়ন ভেনেজুয়েলাবাসী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে দেশত্যাগ করেছেন। ট্রাম্পের অভিযোগ, মাদুরো তাঁর দেশ থেকে বহু মানুষ মার্কিন সীমান্তে অভিবাসনের জন্য প্রেরণ করেছেন।
নৈসর্গিক দেশে আর্থিক দুরবস্থা
ভেনেজুয়েলা দক্ষিণ আমেরিকার দেশ। এটি ক্যারিবিয়ান সাগর এবং আটলান্টিক মহাসাগরের সীমান্তে অবস্থিত। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার সঙ্গে সংযোগকারী প্রধান সমুদ্র রুটে ভেনেজুয়েলার একটি কৌশলগত অবস্থান রয়েছে। দেশটির সীমানায় পশ্চিমে কলম্বিয়া, দক্ষিণে ব্রাজিল এবং পূর্বে গায়ানা অবস্থিত। ভেনেজুয়েলা ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্পেনীয় উপনিবেশ ছিল। ১৯শ শতকের শুরুতে এটি দক্ষিণ আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী প্রথম দেশগুলোর মধ্যে একটি। ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে। ১৯৫০-এর দশকের শেষ থেকে দেশটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। ২০১৮ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে দেশটির জনসংখ্যা ছিল ২ কোটি ৮৮ লাখ ৮৭ হাজার ১১৮ জন। ভেনেজুয়েলার রাজস্বের সিংহভাগ আসে খনিজ তেল বিক্রি করে। ১৯৮৯ সালে খাদ্যসংকট দেখা দেয়। ২০১৩ সালে নিকোলাস মাদুরোর সরকারের তেলনীতি পরিবর্তনের কারণে আর্থিক অব্যবস্থার ফলে দেশজুড়ে খাদ্যসংকট দেখা দেয় এবং বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। তেল রপ্তানির ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা, ব্যাপক দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং সরকারের দায়িত্বজ্ঞানহীন নীতি দেশটির অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দেশটিতে আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতির কারণে জাতীয় মুদ্রা ‘বলিভার’-এর মান ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
মূল্যবান খনিজ সম্পদের লোভনীয় ভান্ডার এখানে
তেলের রাজ্য
২০২৩ সাল পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত তেল মজুত যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় পাঁচ গুণেরও বেশি। এর পরিমাণ প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল! দেশের পূর্বাঞ্চলের ওরিনোকো উপত্যকায় অবস্থিত এই তেলের বড় অংশ ‘অতি-ভারী’ হওয়ায় উত্তোলন ও পরিশোধন অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও প্রযুক্তিনির্ভর। এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও গত এক দশকে চীন ছিল ভেনেজুয়েলার তেলের প্রধান ক্রেতা। ২০২৪ সালের শেষ দিকে দেশটির মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৮১.৭ শতাংশই কিনেছে চীন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ছিল মাত্র ১৫.৮ শতাংশ।
প্রাকৃতিক গ্যাস
তেলের পাশাপাশি প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুতেও ভেনেজুয়েলা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। বিশ্বে গ্যাস মজুতের দিক থেকে দেশটির অবস্থান নবম, আর দক্ষিণ আমেরিকার মোট গ্যাস মজুতের প্রায় ৭৩ শতাংশই ভেনেজুয়েলার দখলে।
স্বর্ণের বিশাল ভান্ডার
ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সরকারি স্বর্ণের মজুত রয়েছে ভেনেজুয়েলাতেই। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে রয়েছে প্রায় ১৬১ মেট্রিক টন স্বর্ণ। এ ছাড়া দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ‘ওরিনোকো মাইনিং আর্ক’ এলাকায় বিপুল পরিমাণ অব্যবহৃত স্বর্ণের ভান্ডার রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ২০১৮ সালের একটি খনিজ প্রতিবেদনে ভেনেজুয়েলায় অন্তত ৬৪৪ মেট্রিক টন স্বর্ণ থাকার অনুমান করা হলেও সরকারি সূত্রগুলো বলছে, প্রকৃত পরিমাণ এর চেয়েও বেশি।
লোহা, কয়লা ও শিল্প খনিজ
স্বর্ণ ও গ্যাসের পাশাপাশি ভেনেজুয়েলায় রয়েছে প্রায় ৩ বিলিয়ন মেট্রিক টন কয়লা এবং ১৪.৬৮ বিলিয়ন মেট্রিক টন লোহার আকরিক। এ ছাড়া শিল্প উৎপাদনে অপরিহার্য নিকেল ও বক্সাইটেরও বিশাল মজুত রয়েছে দেশটিতে, যা ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম শিল্পে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক জানিয়েছেন, এসব খনিজ সম্পদের একটি বড় অংশ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে ‘মরিচা ধরে নষ্ট হচ্ছে’, যা পুনরুদ্ধারে কাজ করতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন।
হীরার দেশ
হীরা উৎপাদনের ক্ষেত্রেও ভেনেজুয়েলা সম্ভাবনাময় দেশ। বিভিন্ন খনিতে প্রায় ১,২৯৫ মিলিয়ন ক্যারেট হীরার মজুত থাকার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের দখলে
হোয়াইট হাউসের ঘোষণায় স্পষ্ট, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ববাজারে ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে এর বিনিময়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশটির তেল বিক্রি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে চায় ওয়াশিংটন। প্রথম ধাপে তিন থেকে পাঁচ কোটি ব্যারেল তেল বিক্রির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিক্রি থেকে আনুমানিক ২৮০ কোটি ডলার আয় হতে পারে। তেল বিক্রির অর্থ জমা হবে যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত একটি অ্যাকাউন্টে, যার চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ থাকবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে। এই বিপুল আয়ের কতটা ভেনেজুয়েলার হাতে যাবে, তা পরিষ্কার নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে এবং বছরের পর বছর ধরে দেশটির বিশাল তেল মজুত থেকে তেল উত্তোলন ও বিক্রি চলবে। সেটা তিন মাস, ছয় মাস কিংবা এক বছর নয়, ‘আরও বেশি সময়’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ভয়ংকর ডেল্টা ফোর্স
ভেনেজুয়েলায় দুঃসাহসিক অভিযান চালায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর ‘ডেল্টা ফোর্স’। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সবচেয়ে অভিজাত সন্ত্রাসবিরোধী ও সরাসরি আঘাত হানার (ডাইরেক্ট অ্যাকশন) ইউনিট। এই ইউনিট উচ্চ ঝুঁকির অভিযানে বিশেষায়িত বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ টার্গেটদের আটক বা হত্যা এবং এমন সংবেদনশীল মিশন- যেখানে দ্রুততা, গোপনীয়তা ও নিখুঁত পরিকল্পনা অপরিহার্য। এই গোপনীয় ইউনিট যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছে, যার মধ্যে ২০০৩ সালে ইরাকের শাসক সাদ্দাম হোসেনকে আটকের অভিযান অন্যতম। এ ছাড়া আফগানিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলে আলকায়েদার শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্য করে পরিচালিত বহু সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে ইউনিটটি সক্রিয় ছিল। ডেল্টা ফোর্সের নেতৃত্বে থাকেন একজন জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা। তবে ইউনিটটির প্রধান কে, তা যেমন গোপন রাখা হয়, তেমনি ইউনিটটির সদস্য-সংখ্যাও শ্রেণিবদ্ধ তথ্য। ভেনেজুয়েলার এ অভিযানের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ১৬০তম স্পেশাল অপারেশনস এভিয়েশন রেজিমেন্টের হেলিকপ্টার, যেগুলো ‘নাইট স্টকার্স’ নামে পরিচিত, বিশেষ অভিযানের বাহিনীকে ভেনেজুয়েলায় পৌঁছে দেয় বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। তারা ভেনেজুয়েলার রাজধানীতে পৌঁছায় রাত ২টার দিকে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ যুদ্ধ দপ্তরকে এমন গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে; যা ডেল্টা ফোর্সকে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীর অবস্থান শনাক্ত করতে সহায়তা করে। তাদের আটক করার কাজটি সম্পন্ন করে ‘ডেল্টা ফোর্স। অবতরণের পুরো কৌশল, বিপুলসংখ্যক উড়োজাহাজ, অসংখ্য হেলিকপ্টার, ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হেলিকপ্টার, ভিন্ন ভিন্ন ধরনের যুদ্ধবিমান- সবকিছু ছিল এ অভিযানে।

কে এই মাদুরো
একজন বাসচালক থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন নিকোলাস মাদুরো। কর্মজীবনের শুরুতে যখন বাসচালক ছিলেন, সে সময় শ্রমিক রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ধীরে ধীরে তিনি শ্রমিকদের নেতৃত্বে আসেন। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে শ্রমিক রাজনীতি করেছেন। পরে জড়িয়ে পড়েন জাতীয় রাজনীতিতে। ভেনেজুয়েলায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের নেতা হুগো শ্যাভেজের খুবই ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন মাদুরো। তিনি শ্যাভেজের সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন ২০০৬ সালে। শ্যাভেজের মৃত্যুর পর মাদুরো ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন এবং অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। এরপর ২০১৩ সালে নির্বাচন করে অল্প ভোটের ব্যবধানে প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। মাদুরো ১৯৯৮ সালে ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের ডেপুটি স্পিকার হন। সেই থেকে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়। মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসও হুগো শ্যাভেজের প্রতিরক্ষা দলের সঙ্গে ছিলেন। মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি বিরোধী মত সহ্য করেন না। মাদুরোর শাসনামলে তেলের দামে পতন, দুর্নীতি ও নীতিগত দুর্বলতার কারণে দেশটি গভীর অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি এমন অবস্থায় পৌঁছে যে, দেশটির হাজার হাজার নাগরিক পাশের দেশগুলোতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। ভেনেজুয়েলার লাখ লাখ অভিবাসীর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ এবং মাদক, বিশেষ করে ফেন্টানাইল ও কোকেনের চোরাচালান নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে নিকোলাস মাদুরোর মতবিরোধ চরমে ওঠে। এর জেরেই মার্কিন হামলায় আটক হন মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী। মাদুরোকে ম্যানহাটনের একটি ফেডারেল আদালতে হাজির করা হবে। মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি জানিয়েছেন, মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে মামলা রয়েছে, সেই মামলাতেই তাঁদের বিচার হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক যত রাষ্ট্রনায়ক
ম্যানুয়েল নরিয়েগা (পানামা, ১৯৮৯)
পানামার ম্যানুয়েল নরিয়েগা এক সময় সিআইএর হয়ে কাজ করতেন। পরে তিনি মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচরণ শুরু করেন। ১৯৮৯ সালের ২০ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ পানামায় সামরিক হামলা চালান। নরিয়েগা পালিয়ে ভ্যাটিকান দূতাবাসে আশ্রয় নেন। অবশেষে ৩ জানুয়ারি, ১৯৯০ সালে তিনি আত্মসমর্পণ করেন। তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে উড়িয়ে নেওয়া হয় এবং মাদক পাচার ও মুদ্রা পাচারের দায়ে ৪০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
সাদ্দাম হোসেন (ইরাক, ২০০৩)
ইরাকের এক সময়ের প্রতাপশালী শাসক সাদ্দাম হোসেনকে আটক করা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত সামরিক অপারেশন। ২০০৩ সালের এপ্রিলে বাগদাদের পতনের পর সাদ্দাম পালিয়ে যান। দীর্ঘ ৯ মাস গোয়েন্দা নজরদারির পর ১৩ ডিসেম্বর, ২০০৩ সালে সাদ্দামের জন্মশহর তিকরিতের একটি গোপন সুড়ঙ্গ বা ‘স্পাইডার হোল’ থেকে তাঁকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে তাঁকে ইরাকি ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার করে ২০০৬ সালে ফাঁসি দেওয়া হয়।
হিদেকি তোজো (জাপান, ১৯৪৫)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির অন্যতম প্রধান নেতা এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী হিদেকি তোজোকে যুদ্ধের শেষ দিকে মার্কিন সামরিক পুলিশ আটক করে। তোজোকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে টোকিও ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি করা হয় এবং ১৯৪৮ সালে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজ (হন্ডুরাস, ২০২২)
মাদুরোর মতোই নারকো-টেররিজমের অভিযোগে হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হার্নান্দেজকে আটক করা হয়। প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার মাত্র কয়ে সপ্তাহের মধ্যে মার্কিন ডিরেক্টরেট অব ইন্টেলিজেন্সের সহযোগিতায় তাঁকে শিকলবদ্ধ অবস্থায় আটক করা হয়। ২০২২ সালের এপ্রিলে তাঁকে হন্ডুরাস থেকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হয়। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্কের কারাগারে বন্দি।
মুয়াম্মার গাদ্দাফি (লিবিয়া, ২০১১)
লিবিয়ার দীর্ঘকালীন শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি ছিল ওবামা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদে পরিচালিত ন্যাটো অভিযান। যদিও বিদ্রোহীরা তাঁকে হত্যা করেছিল, তবে লিবিয়ার আকাশে মার্কিন ড্রোন ও ফ্রেঞ্চ যুদ্ধবিমান গাদ্দাফির কনভয়ে হামলা চালিয়ে তাঁকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছিল।

আড়ালে কলকাঠি নাড়তেন মাদুরোর স্ত্রী
মার্কিন অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সঙ্গে গ্রেপ্তার হন তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস। ভেনেজুয়েলার ক্ষমতার আড়ালের অন্যতম প্রভাবশালী চরিত্র ছিলেন সিলিয়া। তাঁর বয়স ৬৯ বছর। কয়েক দশক ধরে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে তাঁর প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট। নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতায় আসার পর সিলিয়া ফ্লোরেসকে তিনি আদর করে ডাকতেন ‘ফার্স্ট ওয়ারিয়র’ নামে। তিনি ‘কন সিলিয়া এন ফামিলিয়া’ নামে একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতেন। মাঝে মাঝে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে স্বামীর সঙ্গে তাঁকে সালসা নাচতেও দেখা যেত। আড়ালে তিনি ছিলেন মাদুরোর অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক পরামর্শদাতা। সিলিয়া ফ্লোরেসের সঙ্গে নিকোলাস মাদুরোর পরিচয় ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে। সে সময় ফ্লোরেস ছিলেন একজন আইনজীবী। তিনি ১৯৯২ সালের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জড়িতদের পক্ষে মামলা লড়ছিলেন। ওই অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা ছিলেন হুগো শ্যাভেজ, যিনি পরে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হন। তখন নিকোলাস মাদুরো শ্যাভেজের নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সেই সূত্রেই দুজনের পরিচয়। ১৯৯৮ সালে হুগো শ্যাভেজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর সিলিয়া ফ্লোরেস দ্রুত রাজনীতির শীর্ষ সারিতে উঠে আসেন। ২০০০ সালে তিনি ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সদস্য হন এবং ২০০৬ সালে অ্যাসেম্বলির স্পিকার নির্বাচিত হন। টানা ছয় বছর তিনি কার্যত একদলীয় সংসদের নেতৃত্ব দেন। ২০১৩ সালে শ্যাভেজের মৃত্যুর পর তিনি প্রকাশ্যে নিকোলাস মাদুরোর পাশে দাঁড়ান। ওই বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাদুরো অল্প ব্যবধানে জয়ী হন। নির্বাচনের কয়েক মাস পর এই দম্পতি বিয়ে করেন। ভেনেজুয়েলার সাংবাদিক ও আমেরিকাস কোয়ার্টারলি-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক জোস এনরিক আরিওজা বলেন, ‘তিনি মাদুরোর শাসনব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হন। তিনি ছিলেন মাদুরোর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মানুষ।’ সিলিয়া ফ্লোরেসের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ২০১২ সালে শ্রমিক সংগঠনগুলো অভিযোগ তোলে, তিনি প্রভাব খাটিয়ে প্রায় ৪০ জনকে চাকরি দিয়েছেন, যাদের মধ্যে তাঁর পরিবারের সদস্যও ছিলেন। ২০১৫ সালে তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন বহুল আলোচিত ‘নার্কো নেফিউজ’ মামলায়। সম্প্রতি প্রকাশিত অভিযোগপত্রে সিলিয়া ফ্লোরেসের বিরুদ্ধে ২০০৭ সালে কয়েক লাখ ডলার ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে।