বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অধ্যায় রচিত হতে যাচ্ছে আজ ১২ ফেব্রুয়ারি। এই প্রথম একই দিনে দেশের ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে আয়োজিত এক ঐতিহাসিক গণভোটে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এই নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনকে দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভোটাররা দুটি ব্যালট পাবেন- সংসদ নির্বাচনের জন্য সাদা এবং গণভোটের (হ্যাঁ/না) জন্য গোলাপি রঙের ব্যালট। এই প্রথম নির্বাচনে প্রবাসীদের সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবগুলোর ওপর জনগণের সরাসরি রায় নিতে এই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে। গণভোটে চারটি প্রধান বিষয়ের ওপর একটি সাধারণ প্রশ্ন রাখা হবে। এই সনদ বাস্তবায়নে ভোটারদের সমর্থন আছে কি-না, সেই প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেবেন ভোটাররা। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে সারা দেশে গণভোট নিয়ে প্রচারণা শুরু করে সরকার। প্রথমে সরকারের পক্ষ থেকে শুধু গণভোট নিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে প্রচারণা শুরু করে। পরে অবশ্য সেই অবস্থা থেকে সরে এসে সরাসরি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা শুরু করে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এ নিয়ে রেডিও টেলিভিশনে প্রচারের জন্য একটি ভিডিও বার্তাও দেন। যেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে বৈষম্য, শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত হবে দেশ এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে যাবে। সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট, দফায় দফায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকের পর গণভোটে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে ৪৭টি প্রস্তাবনা সাংবিধানিক এবং ৩৭টি সাধারণ আইন বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার কথাও জানিয়েছে সরকার। গণভোটের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব থাকলেও এর মধ্যে কোনো কোনোটিতে বিএনপি, কোনোটিতে জামায়াতসহ অন্য রাজনৈতিক দলের নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে। প্রথমে প্রস্তাবনা ছিল- যেসব প্রশ্নে যে রাজনৈতিক দলের নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে সেই দল ক্ষমতায় গেলে ওই প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়ন করতে বাধ্য থাকবে না। তবে শেষ পর্যন্ত এই নিয়ে সমাধানে ব্যর্থ হয়ে গণভোটের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। গণভোটে হ্যাঁ জয় পেলে আগামী সংসদে এই ৮৪টা ধারা বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে। আর যদি না জয় পায় তাহলে জুলাই সনদই কার্যকর হবে না। গণভোটের অধীনে চারটি প্রধান বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রথমত নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। নির্বাচনকালীন সময়ে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন এবং নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো ‘জুলাই সনদ’-এ বর্ণিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী গঠন করা হবে। দ্বিতীয়ত; দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ। এতে সংসদকে শক্তিশালী করতে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ এই দুই ভাগে বিভক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। সংবিধানের যেকোনো সংশোধনী পাসের ক্ষেত্রে এই উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠের সম্মতি বাধ্যতামূলক থাকবে। তৃতীয়ত; ক্ষমতার ভারসাম্য ও প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্ধারণ। গণভোটে জয়ী হলে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য ‘জুলাই সনদ’-এর ৩০টি সংস্কার প্রস্তাব মেনে চলা বাধ্যতামূলক হবে। এর মধ্যে রয়েছে- একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে বা ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও গুরুত্বপূর্ণ কমিটির প্রধান পদগুলো বিরোধী দলের জন্য বরাদ্দ রাখা। সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। চতুর্থত; জুলাই সনদের অন্যান্য সংস্কার বাস্তবায়ন। রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার অনুযায়ী জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। এদিকে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর একই দিন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সকাল ৭টা ৩০ থেকে বিকাল ৪টা ৩০ পর্যন্ত টানা ভোট গ্রহণ চলবে। আজকের নির্বাচনে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে মোট ১,৯৮১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। শেরপুর-৩ আসনে একজন প্রার্থীর মৃত্যুতে সেখানকার নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে।
ইসি জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫৪, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৫ আর তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২২০ জন। ৩০০ আসনে মধ্যে সর্বনিম্ন ভোটার ঝালকাঠি-১ আসনে ২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩১ জন। আর সর্বোচ্চ ভোটার রয়েছে গাজীপুর-২ আসনে ৮ লাখ ৪ হাজার ৩৩৩ জন। এবার নির্বাচনি দায়িত্ব পালনে প্রায় ৮ লাখ কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকবেন। এর পাশাপাশি প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে নিরাপত্তা দায়িত্ব পালন করবেন। আওয়ামী লীগবিহীন এ নির্বাচনে ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। অংশগ্রহণকারী প্রধান দলগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। ’২৪-এর ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় তারা এ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়নি।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অনেক শরিক দলও নৈতিক অবস্থান বা কৌশলগত কারণে এ ভোট বর্জন করছে। তবে দলীয় প্রার্থীর বাইরেও বিপুলসংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনি মাঠে থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশ জমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনি পরিবেশ মোটামুটি শান্ত থাকলেও পুরোপুরি রক্তপাতহীন থাকেনি মাঠ।