সংস্কার উদ্যোগ ঘিরে দেশে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে গণভোট। ইংরেজি ‘রেফারেন্ডাম’-এর বাংলা প্রতিশব্দ গণভোট হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে জনগণ সরাসরি ভোটের মাধ্যমে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত দেয়। সংবিধান সংশোধন, আইন প্রণয়ন, রাজনৈতিক সংকট সমাধান বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে গণভোট আয়োজন করা হয়, যেখানে ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথম গণভোট হয় ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে, দ্বিতীয়টি ১৯৮৫ সালে রাষ্ট্রপতি এরশাদের শাসনকালে এবং প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলে তৃতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর, যা ছিল সাংবিধানিক গণভোট।
গণভোট কীভাবে ফিরল
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গণভোট কেবল রাজনৈতিক অনুষ্ঠান নয়- এটি সংবিধান ও শাসনব্যবস্থার ভবন নির্মাণের একটি কাঠামোগত উপাদান। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে দেশে যখন তৃতীয় গণভোটের আয়োজনের আইন করা হচ্ছিল, তখনই স্পষ্ট হয় যে, গণভোটের বিধান শুধু ভোটের কাগজে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উপস্থাপন নয়, বরং তা সংবিধানের গভীর স্তরকে স্পর্শ করছে। সেই গণভোট আইন ১৯৯১-এর প্রস্তাবনায় বলা হয়েছিল, যেহেতু সংবিধানের বহু অনুচ্ছেদ সংশোধনের জন্য একটি বিল সংসদে গৃহীত হবে এবং এরপর তা রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকবে, এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি সেই অনুমোদন দেবেন কি না, তা গণভোটের মাধ্যমে যাচাই করার বিধান উপযুক্ত ও প্রয়োজনীয়। এই বিধানকে সংবিধানের ১৪২(১ক) অনুচ্ছেদ মোতাবেক অন্তর্ভুক্ত করে গণভোটের পথ স্বচ্ছন্দ করা হয়েছিল। ১৯৯১ সালে তৃতীয় গণভোট এই আইনের ভিত্তিতেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সময় বয়ে যায়; ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ওই গণভোটের বিধান বাতিল করা হয়। কিন্তু রাজনৈতিক ইতিহাস কখনো স্থির থাকে না। ২০২৪ সালে ১৭ ডিসেম্বর হাই কোর্ট এই পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের মামলায় রায় দেন- যাতে শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশই নয়, গণভোটের বিধানও পুনর্বহালের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। ফলে গণভোটে আর কোনো বাধা নেই।

এবার গণভোট কেন
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিলে আবারও আলোচনায় আসে গণভোট। রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার কার্যক্রমকে জনগণের অনুমোদনের আওতায় আনতেই গণভোটের ভাবনা সামনে এসেছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের ধারাবাহিক বৈঠকে ‘জুলাই সনদ’-এর আলোকে গৃহীত সংস্কারগুলোর বৈধতা নিশ্চিত করতে গণভোট আয়োজনের বিষয়ে নীতিগত মতৈক্য তৈরি হয়েছে। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সংস্কার প্রক্রিয়ায় জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই প্রস্তাবিত গণভোটের মূল উদ্দেশ্য। তবে গণভোট অনুষ্ঠানের সময়কাল নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভেদ ছিল। জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দল দাবি তোলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজন করা হোক। অন্যদিকে বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল বলে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হলে জটিলতা কমবে। এই সিদ্ধান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়। অবশেষে অন্তর্বর্তী সরকার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রথম গণভোট : ১৯৭৭
ক্ষমতার বৈধতা যাচাই
১৯৭৭ সালের ৩০ মে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কারণ, সেদিন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম গণভোটের খাতা খোলা হয়েছিল। সেনাপ্রধান থেকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়া জিয়াউর রহমানের শাসন এবং বৈধতা ও নীতিমালার ওপর জনমত যাচাই ছিল সেই ভোটের মূল উদ্দেশ্য। ২২ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পরই জিয়াউর রহমান জাতীয় টেলিভিশন ও বেতারের মাধ্যমে জাতির উদ্দেশে এই গণভোটের ঘোষণা দেন, দেশের জনগণের কাছে সোজাসাপটা প্রশ্ন তোলে ‘তাঁর নীতি, শাসন ও কর্মসূচির প্রতি আস্থা রাখেন কি?’ সমগ্র দেশের প্রায় ২১,৬৮৫টি কেন্দ্রে সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে। ওই সময়ে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ কোটি ৮৪ লাখ, যা তৎকালীন এক বিশাল রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করেছিল। সরকারি তথ্য বলছে ৮৮.১% মানুষ ভোটে অংশগ্রহণ করেন। গণভোটের ফলাফলে ভোটদাতাদের ৯৮.৯% ‘হ্যাঁ’ ভোট, অর্থাৎ জিয়াউর রহমানের নীতির প্রতি আস্থাশীল আছেন, আর মাত্র ১.১% ‘না’ ভোট পড়ে।

দ্বিতীয় গণভোট : ১৯৮৫
এরশাদের আস্থা যাচাই
১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ বাংলাদেশে দ্বিতীয়বারের মতো গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেই সময়কার রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নীতি ও শাসনকাজের বৈধতা যাচাই করার জন্য। যুদ্ধোত্তর রাজনীতির ধারাবাহিকতায় ক্ষমতায় থাকা একজন সেনাপ্রধানের শাসনকে গণতান্ত্রিক বৈধতা দেয় কি না- এ প্রশ্নটি সরাসরি জনগণের সামনে রাখা হয়। ভোট গ্রহণে ভোটারদের সামনে দুটি বাক্স রাখা হয়েছিল- ‘হ্যাঁ’ যেখানে এরশাদের ছবি ছিল, আর ‘না’ যেখানে কোনো ছবি ছিল না; যারা তাঁর নেতৃত্বে আস্থা রাখতেন, তারা ‘হ্যাঁ’তে, আর যারা তা করতে চাননি, তারা ‘না’তে ভোট দিয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, সে সময়ের ওই গণভোটে ৭২.২ শতাংশ ভোটার অংশগ্রহণ করেন।
তন্মধ্যে ৯৪.৫ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন, অর্থাৎ এরশাদের নীতি ও শাসনকাজের প্রতি জনগণের অনুমোদন প্রকাশ পায়। ‘না’ ভোট ছিল মাত্র ৫.৫ শতাংশ। তৎকালীন ওই গণভোটটি তখনকার রাজনীতিতে রাজনৈতিক বৈধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

তৃতীয় গণভোট : ১৯৯১
সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরা
তবে, ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বরের তৃতীয় গণভোটটি ছিল একদম আলাদা। এটি ছিল এক ঐতিহাসিক সাংবিধানিক বাঁক বদল। গণ আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটে। এর মাত্র তিন মাসের মধ্যে, ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ১৬ বছরের রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে দেশে আবারও সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। সেদিন মানুষ দীর্ঘ ১৬ বছরের রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা ভেঙে প্রধানমন্ত্রী শাসিত সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরার প্রশ্নে দেশের মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছিল। যদিও এতে অংশগ্রহণের হার ছিল মাত্র ৩৫.২ শতাংশ, তন্মধ্যে ১ কোটি ৮৩ লাখ ৮ হাজার ৩৭৭ জন ভোটার, অর্থাৎ ৮৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ, সংসদীয় গণতন্ত্রের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন। অন্যদিকে ৩৩ লাখ ৯০ হাজার ৬২ জন ভোটার বা ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ ‘না’ ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার পক্ষে মত দেন।