সাধারণ নির্বাচনে আমরা প্রতিনিধি খুঁজি, কিন্তু ‘গণভোট’ বা ‘রেফারেন্ডাম’-এ আমরা খুঁজি সিদ্ধান্ত। সংসদ যখন থমকে দাঁড়ায় কিংবা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ যখন ধোঁয়াশায় ঢেকে যায়, তখন চূড়ান্ত ফয়সালার জন্য ডাক পড়ে দেশের সাধারণ মানুষের। ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত এসেছে যখন সাধারণ মানুষের আঙুলের ছাপ বা একটি টিক চিহ্ন আমূল বদলে দিয়েছে মহাদেশের মানচিত্র কিংবা শত বছরের পুরোনো শাসনব্যবস্থা।
গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠতম অলংকার যদি ভোট হয়ে থাকে, তবে ‘গণভোট’ বা ‘রেফারেন্ডাম’ হলো তার প্রাণভোমরা। প্রতিনিধি নির্বাচনের চেয়েও যখন বড় হয়ে দাঁড়ায় কোনো আদর্শ বা জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন, তখন থমকে দাঁড়ায় সংসদ; গুরুত্ব পায় সাধারণ মানুষের মতামত। ১৭৯৩ সালের ফ্রান্স থেকে ২০১৬ সালের ব্রিটেনের ইতিহাস সাক্ষী হয়ে আছে, জনগণের একটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কখনো সাম্রাজ্য ভেঙেছে, আবার কখনো গড়েছে নতুন কোনো প্রজাতন্ত্র।
ফ্রান্স থেকে ফালুজা কিংবা সুইজারল্যান্ড থেকে চিলি সবখানেই প্রমাণিত হয়েছে যে, যখনই বড় সংকটে রাষ্ট্রপথ হারিয়েছে, তখনই সাধারণ মানুষের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের রায়ে নির্ধারিত হয়েছে আগামীর গন্তব্য।
বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় দাগ কেটে যাওয়া কয়েকটি ঐতিহাসিক গণভোটের কাহিনি নিয়ে আমাদের আজকের বিশেষ ফিচার...
ফ্রান্স : ‘প্লেবিসাইট’ ছিল আধুনিকতার দিশা
১৭৯৩ সাল। ফরাসি বিপ্লবের দাবানল তখন দাউ দাউ করে জ্বলছে। ঠিক সেই সময়েই নতুন সংবিধান বা ‘মন্টানিয়ার্ড কন্সটিটিউশন’ অনুমোদনের জন্য প্রথমবারের মতো সরাসরি জনগণের মতামত নেওয়া হয়। ইতিহাসে এটিই ছিল জাতীয় পর্যায়ে জনমতের প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রয়োগ। যদিও এটি স্থায়ী রূপ পায়নি, কিন্তু চার্লস দ্য গলের ১৯৫৮ সালের সেই ঐতিহাসিক গণভোটই আজকের আধুনিক ফ্রান্স বা ‘পঞ্চম প্রজাতন্ত্র’র জন্ম দিয়েছিল। ফরাসিদের এই সাহসিকতাই বিশ্বের অন্য প্রান্তের মানুষকে শিখিয়েছিল- দেশের ভাগ্যবিধাতা আদতে তার নাগরিকরাই।
সুইজারল্যান্ড : গণতন্ত্রের স্থায়ী ঠিকানা
ফ্রান্সে যদি গণভোটের ‘বীজ’ বপন করা হয়, তবে তার ‘বৃক্ষ’ হয়ে ওঠার কৃতিত্ব সুইজারল্যান্ডের। ১৮০২ সালে আংশিকভাবে শুরু হলেও ১৮৪৮ সালে সুইজারল্যান্ডই প্রথম গণভোটকে প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মিত রূপ দেয়। মজার ব্যাপার হলো, আমরা যে ‘রেফারেন্ডাম’ বলি, সেই নামকরণের গোড়াপত্তনও এই আল্পস কন্যাদের দেশে। আজ সুইজারল্যান্ডের নাগরিকরা শুধু নেতা নয়, সরাসরি আইন বদলাতে ব্যালট হাতে বছরে কয়েকবার ভোট কেন্দ্রে যান। বিশ্বের কাছে এটিই হলো ‘সরাসরি গণতন্ত্র’র জীবন্ত উদাহরণ।
নরওয়ে : ব্যালট পেপারে অর্জিত স্বাধীনতা
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে নরওয়ে আমাদের এক বিস্ময়কর গল্প শুনিয়েছিল। ১৯০৫ সালে নরওয়ের মানুষ চাইল না আর সুইডেনের ছায়াতলে থাকতে। কোনো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ নয়, কোনো সীমান্তে কামানের গর্জন নয়; বরং একটি শান্তিপূর্ণ গণভোটের মাধ্যমে তারা সুইডেনের কাছ থেকে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ছিনিয়ে নেয়। ইউরোপের ইতিহাসে এটি আজও সবচেয়ে সফল ও জনসম্পৃক্ত গণভোট হিসেবে স্বীকৃত।
ব্রিটেন ও ব্রেক্সিট : আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিচ্ছেদ
নিকট অতীতে ২০১৬ সালের ‘ব্রেক্সিট’ গণভোট পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকবে কি না এই এক প্রশ্নে ব্রিটেনের সাধারণ মানুষ যখন বিচ্ছেদের পক্ষে রায় দিল, তখন কেঁপে উঠেছিল বিশ্ব বাজার থেকে শুরু করে কূটনীতির দীর্ঘদিনের সমীকরণ। ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি ব্রিটেন যখন আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ থেকে বের হয়ে আসে, তখন প্রমাণিত হয় যে জনগণের ইচ্ছাই আধুনিক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন।
গণভোটে তুরস্ক : সংবিধান বদলের পথ ও বিতর্কিত রাজনীতি
তুরস্কে জাতীয় পর্যায়ে এখন পর্যন্ত সাতটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিটি গণভোটই ছিল সংবিধান সংশোধন বা শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
তুরস্কে প্রথম গণভোট অনুষ্ঠিত হয় ১৯৬১ সালের ৯ জুলাই, ১৯৬০ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর নতুন সংবিধান অনুমোদনের লক্ষ্যে। সরকারি ফল অনুযায়ী, ৬২ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ বলেন এবং ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৮১ শতাংশ। এটি দেশটিকে পুনরায় সাংবিধানিক কাঠামোয় ফেরানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। এর দুই দশক পর, ১৯৮২ সালের ৭ নভেম্বর, ১৯৮০ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর প্রণীত সংবিধান অনুমোদনে দ্বিতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এতে ৯১ দশমিক ৪ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ে এবং ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৯১ শতাংশ, যা সামরিক শাসনের প্রভাব ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত দেয় বলে সমালোচকদের দাবি।
১৯৮৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত তৃতীয় গণভোটে রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ নেতাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে। ফলাফল ছিল অত্যন্ত কাছাকাছি ৫০ দশমিক ২ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ এবং ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ ‘না’। তবে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৯৩ দশমিক ৬ শতাংশ, যা গণভোটের প্রতি জনগণের উচ্চ আগ্রহের প্রমাণ দেয়। চতুর্থ গণভোট অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৮ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর, স্থানীয় নির্বাচন এক বছর এগিয়ে আনার প্রস্তাব নিয়ে। এতে ৬৫ শতাংশ ভোটার ‘না’ বলায় প্রস্তাবটি বাতিল হয়। দীর্ঘ বিরতির পর ২০০৭ সালের ২৫ অক্টোবর পঞ্চম গণভোটে সংবিধানের পাঁচটি সংশোধনী প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়, যা সরকারি হিসাবে অনুমোদিত হয়। তবে ভোটার উপস্থিতি ও বিস্তারিত ফলাফলের তথ্য প্রকাশিত হয়নি। এরপর ২০১০ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ষষ্ঠ গণভোটে ২৬টি সাংবিধানিক সংশোধনী প্রস্তাব ভোটে ওঠে। এতে ৫৮ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ায় সংশোধনীগুলো পাস হয়, যা বিচারব্যবস্থা ও সামরিক প্রভাব কমানোর উদ্যোগ হিসেবে সরকার তুলে ধরে। সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত গণভোটটি অনুষ্ঠিত হয় ২০১৭ সালের ১৬ এপ্রিল। এই গণভোটের মাধ্যমে তুরস্কে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা বাতিল করে প্রেসিডেনশিয়াল ব্যবস্থা প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকারি ফল অনুযায়ী, ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ এবং ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ ‘না’ ভোট পড়ে, ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৮৫ শতাংশ। মাত্র ২ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যবধান, ক্ষমতার ব্যাপক কেন্দ্রীকরণ এবং ভোটপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে অভিযোগ সব মিলিয়ে এই গণভোট তুরস্ককে গভীর রাজনৈতিক বিভাজনের দিকে ঠেলে দেয়। নতুন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির হাতে আইন প্রণয়ন, জরুরি অবস্থা ঘোষণা ও উচ্চপর্যায়ের নিয়োগের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়, যা গণতন্ত্রের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
চিলি : একনায়কতন্ত্রের বিদায় এবং সংবিধানের জটিলতা
চিলির ১৯৮৮ সালের গণভোট ছিল এক রূপকথার মতো। একনায়ক আগুস্তো পিনোশে চেয়েছিলেন তাঁর ক্ষমতা আরও আট বছর বাড়িয়ে নিতে। কিন্তু জনতা ‘না’ বলে তাঁর বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে দেয়। মজার ব্যাপার হলো, ২০২০ সালে ৭৮ শতাংশ মানুষ নতুন সংবিধানের জন্য ‘হ্যাঁ’ বললেও, ২০২২ সালে যখন পূর্ণাঙ্গ খসড়াটি সামনে আসে, তখন ৬২ শতাংশ মানুষ আবার তা ‘বাতিল’ করে দেয়। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, জনগণ কেবল পরিবর্তন চায় না, তারা রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে একটি স্থিতিশীল, সূদূরপ্রসারী এবং স্বচ্ছ পরিবর্তনের পথে হাঁটতে চায়।