ভোটের দিন মানেই ভোটার, ব্যালট বাক্স আর ফলাফলের হিসাব। এই দৃশ্যপটের আড়ালে থাকে কিছু মানুষ যারা নিজেরা ভোট দেন না। প্রার্থীও নন, তবু পুরো নির্বাচনটি কার্যত তাদের কাঁধেই ভর করে থাকে। তারা নির্বাচন দিনের নীরব নায়ক। এদের মধ্যে রয়েছেন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, পোলিং কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, সাংবাদিক, পর্যবেক্ষকরা। ভোটারদের নিরাপত্তায় অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে সারা দেশে মোতায়েন করা হয়েছে সশস্ত্র বাহিনীর ১ লাখের বেশি সদস্য। তারাই মূলত একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ভোট অনুষ্ঠানের মূল দায়িত্ব পালন করছেন। এবারের ভোটে মোট কেন্দ্রের প্রায় ৫০ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে যেকোনো সময় সহিংসতার ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অতীতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়া এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এবারের নির্বাচনেও এই নীরব নায়করা কাঁধে তুলে নিচ্ছেন একটি অবাধ ভোটের গুরুদায়িত্ব। ভোটের দিনে কেন্দ্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা। তিনি সবচেয়ে চাপ নিয়ে তার দায়িত্ব পালন করেন।
১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে সারা দেশে ৪২ হাজার ৭৬টি ভোট কেন্দ্র রয়েছে। অর্থাৎ সারা দেশে ৪২ হাজার ৭৬ জন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা প্রতিটি কেন্দ্রের প্রধান দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। সঙ্গে থাকেন পোলিং কর্মকর্তারা। ভোট কেন্দ্রগুলো শহর গ্রামে সাধারণত বিভিন্ন কলেজ, বিদ্যালয়, মাদ্রাসায় অনুষ্ঠিত হয়। প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত কেন্দ্রগুলোতে আগের দিন রাতেই প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের উপস্থিত হতে হয়। ভোরের আলো ফোটার আগেই প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও পোলিং কর্মকর্তা নির্বাচন কেন্দ্র ভোটারদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করার কাজ করেন। গোপন কক্ষ তৈরি করা, বাইরে শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ব্যারিকেড তৈরির তদারকি করতে হয়। ব্যালট পেপার, সিল, বাক্স সবকিছুর দায় তার ওপর বর্তায়। যেকোনো সহিংসতায় তাদের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হয়। ভোট কেন্দ্রের বাইরে কিংবা ভিতরে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে পুলিশ ও আনসার সদস্যরা। দৃশ্যমান আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব হলেও ভুল বোঝাবুঝি, জনরোষের ঝুঁকিও থাকে। অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ বছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৮ লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ জন্য সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এ সদস্যরা নিরপেক্ষ ভোট অনুষ্ঠানসহ কেন্দ্রের ফলাফল নিরাপদে প্রধান নির্বাচন কার্যালয়ে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করবেন।
হামলা সহিংসতার ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে হবে এসব নায়কদের। এর বাইরে অবাধ সুষ্ঠু ভোট অনুষ্ঠানের অনানুষ্ঠানিক নায়ক হচ্ছেন সাংবাদিক, পর্যবেক্ষকরা। সাংবাদিদের চোখ দিয়েই দেশ নির্বাচন দেখে। ভোটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে কাজ করেন সাংবাদিকরা। অনেক সময় হুমকি, কখনো প্রশাসনের প্রশ্ন, কখনো রাজনৈতিক পক্ষের চাপ সব সামলে কলম ধরতে হয়।
শত শত ভোটারের মুখোমুখি হওয়া, উত্তেজিত কর্মী সামলানো, নিয়ম মেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া সবকিছু করতে হয় নিরপেক্ষতার এক কঠিন কাঠামোর ভিতর। ভোট শেষ হলে ভোটার বাড়ি ফেরেন, প্রার্থীরা অপেক্ষা করেন ফলের। কোনো বাহবা ছাড়াই নীরব নায়করা ক্লান্ত শরীর নিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন।