গত বছরের নভেম্বরে ইউরোপের বাইরে ১৯টি দেশের নাগরিকদের সব ধরনের ভিসা আবেদন স্থগিত করে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে গ্রিন কার্ড ও মার্কিন নাগরিকত্বের আবেদনও ছিল। জাতীয় নিরাপত্তা ও জননিরাপত্তার উদ্বেগ দেখিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এই সিদ্ধান্ত নেয়। তালিকায় আফ্রিকার একাধিক দেশ থাকায় বিষয়টি ঘিরে ক্ষোভ তৈরি হয়।
এরই পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় এবার কয়েকটি আফ্রিকান দেশ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ভিসা দেওয়া বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালি এবং বুরকিনা ফাসো জানিয়েছে তারা মার্কিন নাগরিকদের জন্য সম্পূর্ণ ভিসা নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করছে। দেশ দুটি বলছে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নাগরিকদের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে তার জবাব হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত।
মালি এবং বুরকিনা ফাসো উভয় দেশই বর্তমানে সামরিক সরকারের অধীনে পরিচালিত। গত মঙ্গলবার দেশ দুটি পারস্পরিকতা নীতি অনুসরণ করে এই ভিসা নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন আফ্রিকা এশিয়া মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার ৩৯টি দেশের ওপর নতুন ভিসা বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল।
মালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায় পারস্পরিকতা নীতির আলোকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ওপর মালির নাগরিকদের জন্য আরোপিত একই শর্ত এবং বিধিনিষেধ কার্যকর করা হবে।
বুরকিনা ফাসোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী কারামোকো জঁ মারি ত্রাওরে পৃথক বিবৃতিতে একই অবস্থান তুলে ধরেন।
ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে জারি করা মার্কিন নির্দেশনার আওতায় মালি এবং বুরকিনা ফাসোর পাশাপাশি আরও পাঁচটি দেশের নাগরিকদের ওপর সম্পূর্ণ ভিসা নিষেধাজ্ঞা বাড়ানো হয়। দেশগুলো হলো লাওস নাইজার সিয়েরা লিওন দক্ষিণ সুদান এবং সিরিয়া।
এ ছাড়া ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ইস্যু করা ভ্রমণ নথির ধারকেরাও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষিদ্ধ হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে দুর্বল নিরাপত্তা যাচাইব্যবস্থা তথ্য বিনিময়ের সীমাবদ্ধতা ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অবস্থান করা নাগরিকের সংখ্যা এবং নিজ দেশের নাগরিকদের ফেরত নিতে অনীহার কারণেই এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যেসব দেশে গুরুত্বপূর্ণ সন্ত্রাসীর উপস্থিতি রয়েছে সেগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর হয়েছে।
এরই মধ্যে নাইজারও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। গত শুক্রবার দেশটি জানায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের নাগরিকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় তারা একই পদক্ষেপ নিয়েছে। নাইজারও বর্তমানে সামরিক সরকারের অধীনে রয়েছে।
মালি বুরকিনা ফাসো এবং নাইজার ২০২৪ সালের জুলাইয়ে নিরাপত্তা ও বাণিজ্য জোরদারে অ্যালায়েন্স অব সাহেল স্টেটস নামে একটি জোট গঠন করে।
এদিকে সবার আগে গত ৬ জুন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দেয় চাদ। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। ৯ জুনের আগে যাঁদের ভিসা ইস্যু করা হয়েছিল শুধু তাঁরাই এখন চাদে প্রবেশ করতে পারছেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাংক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে ৩৯টি দেশের নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে পূর্ণ অথবা আংশিক নিষেধাজ্ঞার মুখে। এর মধ্যে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশগুলোর বড় অংশই আফ্রিকার।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আফ্রিকার ক্ষেত্রে ভিসা নীতিতে প্রথম মেয়াদেরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তখন তথাকথিত মুসলিম নিষেধাজ্ঞার আওতায় সোমালিয়া সুদান এবং লিবিয়া ছিল। বর্তমানে যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে তার মধ্যে ২৬টিই আফ্রিকার।
ট্রাম্প প্রশাসন আফ্রিকার সঙ্গে বাণিজ্যে আগের আফ্রিকান গ্রোথ অ্যান্ড অপরচুনিটি অ্যাক্ট থেকে সরে এসে শুল্কভিত্তিক নীতি অনুসরণ করছে। পাশাপাশি ২০২৫ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডির তহবিল বন্ধ করে বিলিয়ন ডলারের সহায়তা কমিয়ে দেয়। এতে আফ্রিকার বহু দেশ স্বাস্থ্য এবং মানবিক সহায়তায় সংকটে পড়েছে।
সব মিলিয়ে ভিসা নিষেধাজ্ঞা বাণিজ্যনীতি পরিবর্তন এবং নিরাপত্তা ইস্যু আফ্রিকা যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে নতুন করে উত্তেজনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সোর্স: রয়টার্স, বিবিসি, আল-জাজিরা
বিডি প্রতিদিন/আশিক