ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী দাবদাহের কবলে পড়েছে ফ্রান্সসহ বেশ কয়েকটি দেশ। তীব্র গরমের এই চরম পরিস্থিতিতে ফ্রান্সে আবহাওয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণতম দিন রেকর্ড করা হয়েছে। একই সাথে তীব্র গরম থেকে বাঁচতে গিয়ে গত কয়েক দিনে দেশটির বিভিন্ন অনিরাপদ স্থানে সাঁতার কাটতে গিয়ে অন্তত ৪০ জনের ডুবে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু একে একটি 'মারাত্মক বিপর্যয়' হিসেবে আখ্যায়িত করে জানিয়েছেন, মৃতদের মধ্যে বেশির ভাগই তরুণ। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফরাসি সরকার জরুরি মন্ত্রিসভা বৈঠকের ডাক দিয়েছে।
ফ্রান্সের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা মেতেও-ফ্রান্স জানিয়েছে, ১৯৪৭ সালে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আবহাওয়ার রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর থেকে এবারের দিনটিই ছিল সবচেয়ে উত্তপ্ত। দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় পিসোস এলাকায় তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৪৪.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে গিয়ে ঠেকেছে এবং বোর্দোর মতো বড় শহরগুলোতে তাপমাত্রা রেকর্ড ৪২.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস স্পর্শ করেছে। দেশের প্রায় অর্ধেক এলাকা জুড়ে চরম ও ক্লান্তিকর আবহাওয়া বিরাজ করায় অর্ধেকেরও বেশি বিভাগে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। এমনকি রাতের তাপমাত্রাও আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
তীব্র এই গরমের কারণে ফ্রান্সের ঐতিহ্যবাহী ও বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্রগুলোর পরিচালন কার্যক্রমে পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ল্যুভর মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় এবং বিকেলের দিকে দর্শনার্থীদের ভিড়ে তাপমাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় তারা তাদের দৈনিক কর্মঘণ্টা দুই ঘণ্টা কমিয়ে এনেছে। অন্যদিকে আইফেল টাওয়ার কর্তৃপক্ষও নির্ধারিত সময়ের আট ঘণ্টা আগেই তাদের স্মৃতিস্তম্ভটি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
দেশটির পরিবহন ও জ্বালানি খাতেও এই দাবদাহের বড় প্রভাব পড়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় রেললাইনগুলো অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে রয়েছে, যার কারণে প্যারিস অঞ্চলের বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনীয় রেলভ্রমণ পরিহার করতে এবং সম্ভব হলে বাসা থেকে অফিসের কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া গোলফেচ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি চুল্লি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, কারণ চুল্লি ঠান্ডা করার জন্য নদী থেকে নেওয়া পানির তাপমাত্রা নিরাপদ সীমার চেয়ে অনেক ওপরে চলে গিয়েছিল। চলমান এই তাপপ্রবাহের কারণে ইতিমধ্যে প্রায় ১,৩৫০টি স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং গাড়ির ভেতর আটকে থেকে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের মতে, উত্তর আফ্রিকা ও সাহারা মরুভূমি থেকে ধেয়ে আসা বাতাস এবং বায়ুপ্রবাহ থমকে যাওয়ার কারণেই পুরো ইউরোপজুড়ে এই স্থবির ও দমবন্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
ফ্রান্সের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, ইতালি, জার্মানি এবং স্পেনও এই তীব্র দাবদাহে বিপর্যস্ত। লন্ডনে তীব্র গরমের কারণে রেড অ্যালার্ট জারি করে বেশ কিছু স্কুল আগেভাগেই ছুটি দেওয়া হয়েছে। লন্ডনে চলমান জলবায়ু সপ্তাহের এক অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে বলেছেন যে জীবাশ্ম জ্বালানির অতিব্যবহারের কারণেই বিশ্ব আজ এই ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি। এদিকে ইতালির মিলান ও রোমসহ ১৫টি শহরে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারের কারণে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে। জার্মানিতেও সপ্তাহান্তে সাঁতার কাটতে গিয়ে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। স্পেনের কর্ডোবা ও বিলবাওসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে 'অস্বাভাবিক বিপদের' সতর্কতা জারি করা হয়েছে, যেখানে আলমেরিয়া প্রদেশে টানা তিন রাত ধরে তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামেনি, যা স্থানীয় জনজীবনকে পুরোপুরি স্থবির করে দিয়েছে।
বিডি প্রতিদিন/এনএইচ