চীনের সাম্প্রতিক নৌ-অস্ত্র কৌশল আবারও আলোচনায়। বিশেষ করে বাণিজ্যিক জাহাজকে সম্ভাব্য অস্ত্রবাহী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহারের ধারণা দিয়ে চীন সবাইকে চমকে দিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ওয়াইজে-১৮সি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের ভূমিকা যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এই কৌশল সরাসরি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংসের চেয়ে প্রতিপক্ষের সামগ্রিক যুদ্ধব্যবস্থাকে অকার্যকর করার দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
এই ধারণার মূল কথা হলো, আধুনিক যুদ্ধে আলাদা আলাদা জাহাজ বা ইউনিট নয় বরং পুরো অপারেশনাল সিস্টেমই আসল লক্ষ্য। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সেই সিস্টেম দাঁড়িয়ে আছে কমান্ড ও কন্ট্রোল নেটওয়ার্ক, গোয়েন্দা ও নজরদারি ব্যবস্থা, লজিস্টিক সাপ্লাই চেইন, এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার ওপর। চীনের সামরিক পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, এই সংযোগস্থলগুলোতে আঘাত হানতে পারলে শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ অক্ষত থাকলেও পুরো বাহিনী কার্যত অচল হয়ে পড়তে পারে।
মার্চ ২০২৩ সালে প্রকাশিত র্যান্ড করপোরেশনের এক প্রতিবেদনে গবেষক মার্ক কোজাড ও তার সহলেখকরা এই কৌশলের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। তাঁদের মতে, চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) প্রতিপক্ষকে প্যারালাইজ বা অচল করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। অর্থাৎ, সরাসরি বড় যুদ্ধ জেতার বদলে শত্রুপক্ষের যোগাযোগ, লজিস্টিক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে ভেঙে ফেলা। তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য কোনো সংকটে এই কৌশল বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে ওয়াইজে-১৮সি ক্ষেপণাস্ত্রকে দেখা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে। এটি মূলত ভারী সুরক্ষিত এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ধ্বংসের জন্য নয় বরং লজিস্টিক জাহাজ, সাপ্লাই শিপ, রিফুয়েলিং প্ল্যাটফর্ম এবং পিছনের সারির সামুদ্রিক চলাচল ব্যাহত করার জন্য উপযোগী। ক্ষেপণাস্ত্রটির দীর্ঘ পাল্লা, তুলনামূলক কম খরচে উৎপাদনের সম্ভাবনা এবং সাবসনিক হলেও স্টেলথ বৈশিষ্ট্যের কারণে স্যাচুরেশন অ্যাটাকের (সমন্বিত) জন্য এটি বেশ কার্যকর। একসঙ্গে অনেক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হলে প্রতিপক্ষের সেন্সর, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়।
আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো সম্ভাব্য উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্মের বৈচিত্র্য। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে কনটেইনারাইজড লঞ্চ সিস্টেম বা বাণিজ্যিক জাহাজের আড়ালে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের ধারণা বাস্তবে রূপ নিতে পারে। এতে যুদ্ধের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাণিজ্যিক নৌযান ও সামরিক হুমকির মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়বে।
তবে এই কৌশলের সীমাবদ্ধতাও আছে। জানুয়ারি ২০২৬ সালে প্রকাশিত হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন বড় পরিসরে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে সক্ষম হলেও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে সেই সক্ষমতা টিকিয়ে রাখা কঠিন হতে পারে। গাইডেন্স সিস্টেম, ওয়ারহেড অ্যাসেম্বলি এবং শক্তিশালী বিস্ফোরক উপাদান তৈরির কারখানাগুলো বেশিরভাগই কেন্দ্রীভূত এবং বিকল্পহীন। ফলে আঘাত পেলে এগুলো দ্রুত পুনর্গঠন করা কঠিন। পাশাপাশি উন্নত সেমিকন্ডাক্টরের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের ওপর নির্ভরশীলতাও বড় ঝুঁকি।
সূত্র: এশিয়া টাইমস
বিডি প্রতিদিন/নাজম