Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১৩:০৬ অনলাইন ভার্সন
আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১৩:১২
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে 'তৃতীয় মাত্রা'য় যা বললেন মাহফুজ আনাম
অনলাইন ডেস্ক
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে 'তৃতীয় মাত্রা'য় যা বললেন মাহফুজ আনাম

সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম সম্প্রতি পাশ হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সম্পর্কে বলেছেন, 'সংবিধানে আমাদের যে অধিকার দেয়া হয়েছে মিডিয়াকে জেনারেলি এবং মতপ্রকাশের জন্য অর্থ্যাৎ অনুচ্ছেদ ৩৯.২ এর 'এ' এবং 'বি'তে যৌক্তিক সীমার মধ্যে আমাদের বিরাট স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। এ আইন একেবারেই তার পরিপন্থী। দ্বিতীয়ত, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের যে মূল আদর্শ- তার মধ্যে স্বাধীনতার, মতপ্রকাশের, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মূলমন্ত্র ছিল। এ আইন সাধারণভাবে গণতান্ত্রিক যে কাঠামো, গণতান্ত্রিক যে চর্চা- সেটার পরিপন্থী। সাংবাদিকতার মূল নীতি, স্তম্ভের যে জায়গাগুলো সেগুলোও সম্পূর্ণভাবে এ আইনের পরিপন্থী। এসব কারণে সম্পাদক পরিষদ থেকে এ আইনটি প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হয়েছি।' বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে চ্যানেল আইয়ের 'তৃতীয় মাত্রা' অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে মাহফুজ আনাম এসব কথা বলেন। 

তিনি আরও বলেন, এ আইনের বিষয়ে সরকারের উদ্দেশ্য মহৎ- আমি সে প্রেক্ষাপট থেকে কথা শুরু করতে চাই। সে দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বলি, ওনারা ডিজিটাল জগতে নিরাপত্তা নিয়ে খুব চিন্তিত এবং আইনটির নামই হচ্ছে 'ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ। ডিজিটাল মাধ্যমে সংগঠিত অপরাধ সনাক্তকরণ, প্রতিরোধ, দমন, বিচার'- এসব ব্যাপার। ডিজিটাল জগত নিয়ে ওনারা আইনটা করেছেন। আমি সরকারের ভালো উদ্দেশ্য ধরে নিয়েই বলছি যেখানে ওনারা ভুলটা করেছেন: এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মটা শুধু ডিজিটাল জগতে ব্যবহৃত হয় না। অর্থ্যাৎ মানি ট্রান্সফার, ব্যাংকিং, স্বাস্থ্য, তারপর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পুলিশের তথ্য সংগ্রহ- এসব ক্ষেত্রে তার বিরাট ব্যবহার আছে। কিন্তু মিডিয়া, গণমাধ্যম যার মূল হচ্ছে স্বাধীনতা, মুক্ত চিন্তা, তারাও কিন্তু এ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের গণমাধ্যম ডিজিটালাইজ হয়ে গেছে। এখন ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন করতে গিয়ে তারা যে স্বাধীন সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করছেন এ জায়গাটা ওনারা যথেষ্ঠ গুরুত্ব নিয়ে দেখেননি, দেখছেন না। আমরা যখন সংসদীয় কমিটিতে গিয়ে এতবার অনুনয় বিনয় করলাম, যুক্তি দিলাম, ওনারাও এ জিনিসটাতে একেবারেই এ জিনিসটা গুরুত্ব সহকারে দেখেননি।

মাহফুজ আনাম বলেন, আমি তিনটা উদারহরণ দিই। আমার একটা মূল প্রস্তাব ছিল ওনারা যখন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করতেই বদ্ধপরিকর, এবং বারবার আমাদের বলা হচ্ছে এটা সাংবাদিকতায় কোনো রকমভাবেই ব্যবহার হবে না, সাংবাদিকদের স্বাধীনতা খর্ব হবে না তখন আমি বলেছিলাম আইনে কোথাও ডিসক্লেইমার দেয়া যায় কি না- যে এ আইনে যা আছে তা সাংবাদিকতায় প্রযোজ্য হবে না, মিডিয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। এ ধরনের একটা ক্লজ থাকলেই তো আমাদের সমস্ত দুশ্চিন্তা চলে যায়।- এটা আমার প্রস্তাব ছিল। একাত্তর টিভির মোজাম্মেল বাবু (একাত্তর টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক)- ওনার একটা প্রস্তাব ছিল যদি এটা যদি মাহফুজ ভাইয়ের প্রস্তাবটা গ্রহণ করতে না পারেন তাহলে আপনারা এটা রাখেন যে- সংবাদ/মিডিয়া সংশ্লিষ্ট যা-ই আসবে এটা প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে আসবে। তাহলে তবু একটা ফিল্টারিংয়ের জায়গা হলো।-এটা মোজাম্মেল বাবুর প্রস্তাব ছিল। তারপর আমাদের মনজুরুল আহসান বুলবুলের (একুশে টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা) বলেছেন- এটা তো তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। এতে অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্ট কীভাবে আসতে পারে যেটা এরইমধ্যে তথ্য অধিকার আইন  থেকে চলে গেছে। আমি তো এই তিনটা উদাহরণ দিলাম। আমরা বলতে পারেন সেকশন বাই সেকশন, অধ্যায় দিয়ে আমরা উনাদের সাথে কথা বলেছি। ব্যাখা দিয়ে দেখিয়েছি এ ক্লজ কীভাবে সাংবাদিকদের স্বাধীন সাংবাদিকতার স্বাধীন মতপ্রকাশের সাথে সাংঘর্ষিক। ওনারা শুনেছেন। দুই দিন দুইটা সেশন করেছেন এবং এখন মন্ত্রী বলছেন, 'আমাদের সব ব্যাপার উনি মেনে নিয়েছেন' আর আমার স্মৃতিতে সেটা একেবারেই মিলছে না। হয়তো আমার স্মৃতিভ্রম ঘটছে, আর তো আমি কিছু বলতে পারি না। আমিতো বলতে পারি না মন্ত্রী... (হাসি)

মিডিয়া বলতে কী বোঝাচ্ছেন উপস্থাপকের এমন প্রশ্নে মাহফুজ আনাম বলেন, টেলিভিশন, সংবাদপত্র, রেডিও, এবং অনলাইন মিডিয়াও। এখন অনলাইন মিডিয়া নিয়ে একটুখানি অস্পষ্টতার জায়গা আছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং অনলাইন মিডিয়া খুব কাছাকাছি। কিন্তু বাস্তবতা হল এই যে টেলিভিশন- এটার মূল প্ল্যাটফর্মই হল ডিজিটাল। সংবাদপত্র ডেইলি স্টার ২৪ ঘণ্টায় একবার প্রিন্ট করি, কিন্তু সারাদিন তো অনলাইনে আছে, এবং অনলাইনে পাঠক সংখ্যা প্রিন্টের চাইতে অনেক বেশি। আগামীতে এটা আরও বাড়বে। তো, ডিজিটাল তো বিশ্বই এবং সেখানে আপনি... একটা উপমা দিই জানি না এটা সঠিক হচ্ছে কী না... 'আপনার ঘরে অনেক পোকামাকড় আছে, তো পোকামাকড় মারতে আপনি এমন স্প্রে দিলেন যে আপনার নিজের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেল। শ্বাস রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।' এটা অনেকটা তাই।  আপনি একটা দিকে নজর দিতে গিয়ে অন্য যে আপনার এত বড় অর্জন 'গণতন্ত্র', 'স্বাধীন সাংবাদিকতা', সেগুলোকে আমরা গুরুতরভাবে ব্যাহত করতে যাচ্ছি।

বিডি প্রতিদিন/ফারজানা

আপনার মন্তব্য

up-arrow