সমুদ্রের ডাক, নতুন ভাবনার সূচনা
সমুদ্রের দিকে তাকালে এক অদ্ভুত শক্তির অনুভূতি জাগে-অসীম, উদার, আবার কখনো কঠোর। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার আমন্ত্রণে একটি আন্তর্জাতিক কর্মশালায় অংশগ্রহণ উপলক্ষে জাকার্তা ও বালি সফর আমার কাছে শুধু একটি আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নয়-এটি হচ্ছে ইতিহাস, অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের এক সমন্বিত পাঠ। জাকার্তার ব্যস্ত নগরজীবন এবং বালির নান্দনিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভিতর দিয়ে আমি যেন প্রত্যক্ষ করলাম কীভাবে একটি দেশ তার অতীতের ঔপনিবেশিক ইতিহাসকে অতিক্রম করে সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতির শক্তিতে নতুন পরিচয় গড়ে তুলছে। ইন্দোনেশিয়া আজ যে ‘ব্লু ইকোনমি’ বা নীল অর্থনীতির পথে এগোচ্ছে, তা আমাদের বাংলাদেশের জন্যও এক মূল্যবান দিকনির্দেশনা হতে পারে।
ঔপনিবেশিক অতীত থেকে আত্মনির্ভরতার শিক্ষা
ইন্দোনেশিয়ার ইতিহাস বহুস্তরবিশিষ্ট। শতাব্দীর পর শতাব্দী এটি ছিল বিভিন্ন সালতানাত ও সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্রের সমাহার। কিন্তু ১৭ শতাব্দী থেকে ডাচ্ উপনিবেশবাদীরা ‘ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ’ নামে এই অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণে আনে। তাদের ‘কাল্টিভেশন সিস্টেম’ (Cultivation System) কৃষকদের বাধ্য করত নগদ ফসল উৎপাদনে, যা ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানি হতো। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশদের স্বল্পমেয়াদি শাসন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি দখল-সব মিলিয়ে ইন্দোনেশিয়ার সমাজ ও অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। ১৯৪৫ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা এবং ১৯৪৯ সালে আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে দেশটি নতুন যাত্রা শুরু করে। এই দীর্ঘ ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা ইন্দোনেশিয়াকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। নিজস্ব সম্পদ, বিশেষ করে সামুদ্রিক সম্পদের ওপর সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
জাকার্তা : নীতিনির্ধারণ ও বিনিয়োগের কেন্দ্র
জাকার্তায় পৌঁছে প্রথমেই চোখে পড়ে এক কর্মচঞ্চল মহানগরী, যেখানে নীতিনির্ধারণ, গবেষণা ও বিনিয়োগের সমন্বয়ে সামুদ্রিক সম্পদকে ঘিরে গড়ে উঠছে নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো। জাকার্তায় লক্ষ্য করেছি কীভাবে সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাত একত্রে কাজ করছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা এবং বেসরকারি খাত-সবাই একসঙ্গে কাজ করছে একটি টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যে। সামুদ্রিক খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, লাইসেন্সিং সহজীকরণ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তারা একটি আধুনিক মেরিটাইম অর্থনীতি গড়ে তুলছে। ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে সামুদ্রিক ও মৎস্য খাতে ইন্দোনেশীয় রুপিতে বিনিয়োগ প্রায় ২ দশমিক ৩৮ ট্রিলিয়নে পৌঁছেছে। যা এই খাতের দ্রুত বিকাশের প্রমাণ। এখানে ‘ব্লু ইকোনমি’ শুধু একটি ধারণা নয়, বরং বাস্তবায়িত একটি কৌশল।
বালি : পরিবেশ ও অর্থনীতির সমন্বয়
অন্যদিকে বালি যেন প্রকৃতি ও অর্থনীতির এক নিখুঁত সংমিশ্রণ। পর্যটন, মৎস্য, প্রবাল প্রাচীর সংরক্ষণ, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সবকিছু মিলিয়ে এক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের উদাহরণ, যেখানে সমুদ্র শুধু অর্থনীতির উৎস নয়, বরং সংস্কৃতি ও পরিবেশের অংশ। প্রবাল প্রাচীর সংরক্ষণ, টেকসই পর্যটন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ-সব মিলিয়ে বালি একটি সফল ব্লু ইকোনমি মডেল। বালির উপকূলীয় এলাকায় দেখা যায় কীভাবে স্থানীয় জনগণ পরিবেশ রক্ষা করেই জীবিকা নির্বাহ করছে। এখানে সমুদ্র শুধু আয়ের উৎস নয়, বরং সংস্কৃতি ও জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখানে ‘উন্নয়ন বনাম পরিবেশ’ নয়, বরং ‘উন্নয়নসহ পরিবেশ’-এই ধারণাটিই কার্যকর।
নীল অর্থনীতি : এক সুতোয় বাঁধা দুই জগৎ
একদিকে কর্মচঞ্চল রাজধানী, অন্যদিকে প্রকৃতির কোলে গড়ে ওঠা শান্ত দ্বীপ্ত এই দুই ভিন্ন জগৎ এক সুতোয় বাঁধা, আর সেই সুতোটির নাম ‘নীল অর্থনীতি’। ইন্দোনেশিয়ার নীল অর্থনীতির মূল শক্তি তিনটি স্তম্ভে দাঁড়িয়ে আছে-সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার, উদ্ভাবনী প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং শক্তিশালী নীতিনির্ধারণ। বিশেষ করে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনায় তারা যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করছে, তা প্রশংসনীয়। মাছের প্রজনন মৌসুমে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ মাছ ধরার বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা এবং আধুনিক মনিটরিং সিস্টেম-সব মিলিয়ে তারা একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার দিগন্ত
বাংলাদেশের জন্য এখানেই রয়েছে বড় শিক্ষা। বঙ্গোপসাগর আমাদের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দ্বার খুলে রেখেছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে আমাদেরও প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন। ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, সঠিক নীতিমালা ও বিনিয়োগ থাকলে সমুদ্র অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে মৎস্য খাতে বাংলাদেশ ইন্দোনেশিয়ার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে। যেমন স্টক মূল্যায়ন, কোটা নির্ধারণ এবং ট্রেসেবিলিটি সিস্টেম চালু করা। এতে করে একদিকে যেমন উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগও বৃদ্ধি পাবে।
পর্যটন খাতেও রয়েছে বিশাল সম্ভাবনা। বালির মতো যদি আমরা আমাদের কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন বা সুন্দরবনকে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের মাধ্যমে উন্নয়ন করতে পারি, তাহলে তা দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে পারে। তবে এজন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা।
বিনিয়োগ, অংশীদারত্ব ও টেকসই উন্নয়ন
ইন্দোনেশিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP)। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করে তারা বড় বড় বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশেও এই মডেলটি আরও শক্তিশালীভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে, বিশেষ করে সামুদ্রিক অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি এবং রপ্তানি খাতে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-নীল অর্থনীতি মানে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, বরং টেকসই উন্নয়ন। পরিবেশ রক্ষা ছাড়া এই উন্নয়ন কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। ইন্দোনেশিয়া এই বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করেছে এবং তাদের প্রতিটি উদ্যোগে সেই প্রতিফলন দেখা যায়।
সমুদ্রের ঢেউয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন
এই সফরে এসে আমার মনে হয়েছে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু আমাদের নদী বা ভূমিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর একটি বড় অংশ লুকিয়ে আছে আমাদের সমুদ্রে। যদি আমরা সঠিক পরিকল্পনা, শক্তিশালী নীতি এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারি, তবে নীল অর্থনীতি আমাদের উন্নয়নের এক নতুন অধ্যায় রচনা করতে পারে। সমুদ্রের ঢেউ যেমন কখনো থেমে থাকে না, তেমনি সম্ভাবনার পথও কখনো থেমে থাকে না। দরকার শুধু সেই ঢেউয়ের ছন্দ বুঝে এগিয়ে যাওয়ার সাহস, আর সেই সাহসই আমাদের আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারে। ইন্দোনেশিয়ার ইতিহাস আমাদের শেখায়, ঔপনিবেশিক শোষণের শিকার একটি দেশও যদি সঠিক নীতি, পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব পায়, তবে সে তার প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে। যদি আমরা ইন্দোনেশিয়ার মতো নীল অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিই, তবে বাংলাদেশও একদিন দক্ষিণ এশিয়ার একটি শক্তিশালী সামুদ্রিক অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে-যেখানে উন্নয়ন হবে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ভবিষ্যৎমুখী।
♦ লেখক : সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট (ফিশারিজ); সার্ক কৃষি কেন্দ্র, ফার্মগেট, ঢাকা, বাংলাদেশ