সময়টা ১৯৭২ সাল। জহিরুল হকের ‘রংবাজ’ সিনেমার শুটিং চলছে। বেশ স্বাস্থ্যবান এক যুবক শুটিং দেখছেন। তিনি একপর্যায়ে নায়ক রাজ্জাক আর পরিচালক জহিরুল হককে বললেন, সিনেমার মারপিটের দৃশ্যগুলো ঠিকঠাক হচ্ছে না। দেখেই বোঝা যাচ্ছে বানানো, বাস্তবসম্মত মনে হচ্ছে না। জহিরুল হক আগ্রহী হলেন। জানতে পারলেন যুবকের নাম আবুল খায়ের জসিম উদ্দিন। ডাকনাম জসিম। বাড়ি ঢাকার নবাবপুরে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তিনি, বীর গেরিলা যোদ্ধা। যুদ্ধ থেকে ফিরে এখনো কোনো কাজে তেমনভাবে যুক্ত হননি। কেবল অভিনেতা-নির্মাতা আজিমের ‘দেবর’ ছবিতে ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন। জহিরুল হক তাঁকেই দায়িত্ব দিলেন সিনেমার অ্যাকশন দৃশ্যগুলো পরিচালনা করতে। জসিম নির্দেশনাও দিলেন ঠিকঠাক। জহিরুল হকের পছন্দ হলো। এভাবেই জসিমের হাত ধরে ঢাকাই চলচ্চিত্রে অ্যাকশন দৃশ্যের পদার্পণ। তাঁর শুরুটা হয়েছিল ফিল্ম এক্সট্রা আর অ্যাকশন ডিরেক্টর হিসেবে। ছিল তাদের পাঁচ বন্ধুর সম্মিলিত ‘জ্যাম্বস’ গ্রুপ। এই গ্রুপই পরিচালনা করত চলচ্চিত্রে মারপিটের দৃশ্যগুলো। জসিমের নিখুঁত অ্যাকশন দৃশ্য পরিচালনার কারণে অ্যাকশন ঘরানার চলচ্চিত্র দেখতে এ দেশের দর্শক আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এর আগে ১৯৫৬ সালে ‘মুখ ও মুখোশ’ ছবির মাধ্যমে এ দেশে সবাক চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হলে পঞ্চাশ থেকে সত্তর দশকের প্রথম পর্যন্ত সামাজিক, পারিবারিক ও লোকগাথা গল্পের ছবিই এ দেশে একটানা নির্মিত হতে থাকে এবং এই ঘরানার চলচ্চিত্র দেখতেই দর্শক অভ্যস্ত ছিল। কিন্তু ১৯৭২ সালে জহিরুল হক অ্যাকশন গল্পের ‘রংবাজ’ চলচ্চিত্র পরিচালনা করলেন। কিন্তু বিপত্তি ঘটল, কারণ তখন এ দেশে অ্যাকশন দৃশ্য পরিচালনার মতো কেউ ছিলেন না। আর এ চলচ্চিত্রের শুটিং দেখতে এসে অ্যাকশন দৃশ্য পরিচালনায় প্রশিক্ষিত একজন আবুল খায়ের জসিম উদ্দিন যখন দেখলেন অ্যাকশন দৃশ্যগুলো ঠিকঠাকভাবে ধারণ হচ্ছে না, তখনই তিনি ‘রংবাজ’র এই ধাঁচের দৃশ্য পরিচালনা ও অভিনয়ে সম্পৃক্ত হলেন। এ দেশের প্রথম অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্র ‘রংবাজ’ মুক্তি পেয়ে ব্যাপক সাড়া জাগালে নির্মাতারও আগ্রহী হয়ে ওঠেন অ্যাকশন গল্পের চলচ্চিত্র নির্মাণে। আর এসব চলচ্চিত্রে অ্যাকশন দৃশ্য পরিচালনা ও খলনায়ক হিসেবে অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠেন জসিম। এই ধারার চলচ্চিত্র ছাড়াও পারিবারিক গল্পের চলচ্চিত্রেও মারপিট পরিচালনার কাজে জসিমের কোনো বিকল্প ছিল না। বড়পর্দায় চলচ্চিত্র প্রদর্শন শুরু হলে টাইটেলে নাম লেখা থাকত অ্যাকশন দৃশ্য পরিচালনায় ‘জ্যাম্বস গ্রুপ’। মানে জসিম প্রতিষ্ঠিত অ্যাকশন দৃশ্য পরিচালনার সংগঠন ছিল এই ‘জ্যাম্বস গ্রুপ’। তখন থেকে বলতে গেলে নব্বইয়ের দশকের প্রথম পর্যন্ত চলচ্চিত্রে অ্যাকশন দৃশ্য পরিচালনায় জসিমের জ্যাম্বস গ্রুপের সমকক্ষ আর কোনো সংগঠন ছিল না। জসিম এরপর অভিনয়ে নিয়মিত হলেন। তখন তিনি খলঅভিনেতা। দেওয়ান নজরুলের ‘দোস্ত দুশমন’ (১৯৭৭) সিনেমাটি তাঁকে খ্যাতির চূড়ায় নিয়ে যায়। এটি ছিল বলিউডের রমেশ সিপ্পির ‘শোলে’ সিনেমার বাংলা রিমেক। ডাকাত সর্দার ‘গাফফার’ চরিত্রে জসিমের অভিনয় দারুণ প্রশংসিত হয়। যে চরিত্রটি ‘গাব্বার’ নামে বলিউডের ‘শোলে’ চলচ্চিত্রে রূপায়ণ করেছিলেন প্রখ্যাত অভিনেতা আমজাদ খান। জসিমের অ্যাকশনধর্মী আরেকটি স্মরণীয় অভিনয় ছিল দেওয়ান নজরুলের ‘বারুদ’ (১৯৭৮) চলচ্চিত্রে। এটি ছিল হলিউডের ‘দি গডফাদার’ অনুসরণে নির্মিত ছবি। এখানেও দেশীয় মেজাজে জসিমের অনবদ্য অ্যাকশন ঘরানার অভিনয়ের প্রমাণ মেলে। এরকমই আরেকটি স্মরণীয় খলঅভিনয় ছিল ইবনে মিজান পরিচালিত ‘লাইলি মজনু’ (১৯৮৩) চলচ্চিত্রে। রাজ্জাকের সঙ্গে সিকোয়েন্সে তিনি যেভাবে স্ক্রিন ডমিনেট করেছেন তা তাঁর অভিনয়ের শক্তিমত্তার প্রমাণ। এ ছাড়া ইবনে মিজানের ‘এক মুঠো ভাত’ ও ‘জিঘাংসা’ চলচ্চিত্রে অ্যাকশন খলনায়ক জসিমের ভয়ংকর অভিনয় আর অ্যাকশন দৃশ্য পরিচালনার কোনো জুড়ি ছিল না।
একসময় তাঁর সঙ্গে জ্যাম্বস গ্রুপে যুক্ত হন অভিনেতা রুহুল আমিন বাবুল, মাহবুব গুই, জাম্বুসহ অনেকে। তবে একটি সময় থেকে জসিম খলচরিত্রের বাইরে ইতিবাচক চরিত্রেও অভিনয়ের চেষ্টা করছিলেন। এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সাফল্য আসে জহিরুল হকের ‘সারেন্ডার’ (১৯৮৭) সিনেমা দিয়ে। সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখা মেধাবী এক শিক্ষার্থী কীভাবে জড়িয়ে যায় অপরাধ জগতের সঙ্গে, তা এখানে দক্ষতার সঙ্গে তুলে এনেছেন পরিচালক জহিরুল হক। এ সিনেমায় কলম ফেলে দিয়ে হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়ার দৃশ্যে জসিম ছিলেন অনবদ্য। নব্বইয়ের দশকে জসিমের সিনেমাগুলোর ভিতর সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পায় ‘কালিয়া।’ এ সিনেমায় আহমেদ শরীফের সঙ্গে তাঁর দ্বৈরথ জমজমাট হয়ে উঠেছিল। গাঙ্গুয়াকে শায়েস্তা করার দৃশ্যে যে দুর্দান্ত অ্যাকশন তিনি দেখিয়েছিলেন, তা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম সেরা অ্যাকশন সিকোয়েন্স। এ ছাড়াও আশি-নব্বইয়ের দশকে জনপ্রিয় অনেক সিনেমাতেই অভিনয় করেছেন তিনি। জসিম মার্শাল আর্টনির্ভর অ্যাকশন করতেন না। তাঁর মারামারির ধরনটা ছিল তীব্র ও হাতে হাতে। একেবারেই ন্যাচারাল ধাঁচে মারামারি। কিন্তু সেই মারামারিটাই এত জীবন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য হতো যে, মনে হতো যেন সত্যি সত্যিই এটা ঘটছে। সহজ কথায়, জসিমের অ্যাকশন ছিল একেবারেই ‘অর্গানিক’ অ্যাকশন। তিনি যখন ভিলেনদের শায়েস্তা করতেন, তখন পর্দায় তা দেখে আপামর জনতা পেত অত্যাচার, নিপীড়ন থেকে মুক্তির স্বাদ। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অ্যাকশন ধারার প্রবর্তন, খলঅভিনয় ও চরিত্রাভিনয়ে অবদান জসিমকে স্মরণীয় করে রেখেছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা থেকে ঢালিউডের ‘অ্যাকশন কিং’ হয়ে ওঠেন নায়ক জসিম। বাংলা চলচ্চিত্রের অ্যাকশনের পথপ্রদর্শক মনে করা হয় ঢাকাই সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেতা জসিমকে। সিনেমায় ‘খলনায়ক’র অভিনয় করে ক্যারিয়ার শুরু করলেও অ্যাকশন সিনেমায় দুর্দান্ত অভিনয় করে ‘নায়ক’ হয়ে ওঠেন তিনি। তিনি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে ২ নম্বর সেক্টরে মেজর হায়দারের নেতৃত্বে তিনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেন। দেশ স্বাধীন করে ঢাকাই সিনেমার আরেক জনপ্রিয় নায়ক সোহেল রানার মতোই পা বাড়ান চলচ্চিত্র জগতে। প্রখ্যাত অভিনেতা আজিমের হাত ধরে সিনেমা জগতে পা রাখেন জসিম। ১৯৭২ সালে ‘দেবর’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় তাঁর। নিয়মিতই সিনেমায় অভিনয় করতেন ‘খলনায়ক’ চরিত্রে। এর পরই আসে তাঁর চলচ্চিত্র ‘রংবাজ’ অধ্যায়। দর্শক নজরে পড়েন ‘রংবাজ’ সিনেমায় অভিনয় করে। তারপর জসিমের অ্যাকশন কিং হিসেবে চলচ্চিত্র জীবনের ইতিহাস সবারই জানা।