শেহজাদ আকবর সোবহান শুধু বাংলাদেশ নয়, আন্তর্জাতিক টি-২০ ক্রিকেটের একজন পরিচিত মুখ। গ্লোবাল টি-২০ সুপার লিগ ও বিপিএল চ্যাম্পিয়ন রংপুর রাইডার্সের টিম ডিরেক্টর। মেধা, প্রজ্ঞা, সাহসী, দক্ষ, বিচক্ষণ এবং ক্ষুরধার মস্তিষ্কের শেহজাদ সর্বকনিষ্ঠ টিম ডিরেক্টর হিসেবে বিপিএলের নিলামে অংশ নেন। তাঁর বিচক্ষণতায় এবার শক্তিশালী দল গঠন করেছে রংপুর। শেহজাদ নিজে উপস্থিত থেকে দলের অনুশীলন উপভোগ করেন এবং কোচিং স্টাফ ও ক্রিকেটারদের খোঁজখবর নেন। ক্রিকেট ভালোবাসেন। নিজে ক্রিকেটার। দলকে নেতৃত্ব দেন। ক্রিকেট খেলে নিজেকে শক্তিশালী মানসিকতার একজন হিসেবে তৈরি করছেন। রংপুর রাইডার্সের হয়ে দুই বছর ধরে দল গঠনে অংশ নিয়েছেন। গত আসরে এলিমিনেটর পর্ব খেললেও রংপুরের এবারের টার্গেট শিরোপা। দলটি ২০১৭ সালে শিরোপা জিতেছিল। এরপর শিরোপা না জিতলেও রংপুর রাইডার্সকে একটি দল মনে করেন শেহজাদ আকবর সোবহান, ‘২০১৭ সালে (রংপুর রাইডার্স) যখন চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম তখন থেকেই আমরা একটি পরিবার হিসেবে পথ চলা শুরু করি। আমরা রংপুরকে শুধু একটি দল হিসেবে দেখি না, একটি পরিবার মনে করি। আমরা সবকিছু একসঙ্গে করি। সিদ্ধান্তগুলোও একসঙ্গে নিই। ম্যানেজমেন্ট এবং সবাই মিলে সব পছন্দ করি। ব্যক্তিগতভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিই না।’
বিপিএলের গত আসরের প্লেয়ার্স ড্রাফটে যখন অংশ নিয়েছিলেন শেহজাদ, উপস্থিত মিডিয়া কর্মীসহ ফ্র্যাঞ্চাইজিরা বিস্মিত হয়েছিলেন। শুধু বিপিএল নয়, ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বিশ্বের যে কোনো টি-২০ টুর্নামেন্টের সর্বকনিষ্ঠ ডিরেক্টর হয়ে গর্ববোধ করেন। শেহজাদ চলতি আসরের নিলামেও অংশ নেন। সর্বকনিষ্ঠ ডিরেক্টর হয়ে ক্রিকেটার বাছাইয়ে অংশ নিতে পেরে গর্ববোধ করেন, ‘সর্বকনিষ্ঠ টিম ডিরেক্টরের বিষয়টি আমি জানি। এটি নিয়ে সত্যিই গর্বিত। এটি আমার জন্য একটি বড় সুযোগ। আমার খুব ভালো লাগে। কারণ খুব কম মানুষই এমন সুযোগ পায়। আমি খুব খুশি এবং কৃতজ্ঞ। প্লেয়ার্স ড্রাফট কিংবা নিলামে অংশ নিয়ে অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। আরও অভিজ্ঞ হয়ে ভবিষ্যতে ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারব। অল্প বয়সে একটি দল চালানো আমার জন্য অনেক বড় শিক্ষার বিষয়।’ এবার নিলামের টেবিলে বসে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দল গড়েছেন বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সি টিম ডিরেক্টর শেহজাদ। নিলামের টেবিলে বসে দল গড়া উপভোগ করেছেন, ‘গত বছরের ড্রাফট ছিল আমার প্রথম। একটি নতুন অভিজ্ঞতাও ছিল। এ বছরের নিলাম আমার বেশি ভালো লেগেছে। কারণ এটি অনেক বেশি উত্তেজনাপূর্ণ। এবারের নিলাম থেকে অনেক কিছু শিখেছি। শিখেছি কীভাবে খেলোয়াড়দের জন্য বিড করতে হয়, দলের কম্বিনেশন তৈরি করতে হয়।’.jpg)
নিজে একজন অ্যামেচার ক্রিকেটার। নিজের মেধার ব্যবহারে শক্তিশালী দল গড়েছেন। শুধু বিপিএল কিংবা দেশের ক্রিকেট সম্পর্কেই খোঁজখবর রাখেন তেমন নয়, তিনি বিগ ব্যাশ, আইপিএল, আইএলটি-২০’র খেলা গভীর মনোযোগ নিয়ে দেখেন। তিনি মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের সমর্থক। খেলা দেখেছেন অ্যাসেজের, ‘আমি ক্রিকেট দেখি। এ মুহূর্তে আমি বিগ ব্যাশ দেখছি। সেখানে আমাদের বাংলাদেশের রিশাদ খেলছে। এ ছাড়া আমি অ্যাশেজ, বিশ্বকাপ, বিপিএল, আইপিএল সবই ফলো করি।’ শেহজাদ শুধু খেলা দেখেন এমন নয়। গভীর মনোযোগে খেলা দেখে পরবর্তী সময়ের জন্য ক্রিকেটার স্কাউটিং করেন। সেজন্য নোটবুকে লিখে রাখেন পছন্দের ক্রিকেটারের নাম, ‘আমি নোট নিই এবং ট্র্যাক রাখি। এই আইএলটি-২০তে আমি একটি ম্যাচ দেখেছিলাম, যেখানে একজন নির্দিষ্ট খেলোয়াড় অসাধারণ খেলেছিলেন। তাই আমি আগামী বছরের জন্য খেলোয়াড় স্কাউটিং করছিলাম, যেন তাকে আমার দলের কাছে সুপারিশ করতে পারি।’
শেহজাদ এখনো পড়াশোনা করেন। একদিকে পড়াশোনা, অন্যদিকে দল গঠন খুবই কঠিন কাজ। সব চাপ সামাল দিয়ে পছন্দের দল গড়েন, ‘দল চালানোর ক্ষেত্রে টাইম ম্যানেজমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনাকে পড়াশোনা করতে হবে, ভালো গ্রেড পেতে হবে এবং একই সঙ্গে দলও চালাতে হবে। নিঃসন্দেহে অনেক পরিশ্রমের কাজ। যেহেতু এটি আমার প্যাশন, তাই বিষয়টিকে সহজভাবেই নিই। প্যাশন হওয়ায় বিষয়টিকে কঠোর পরিশ্রম মনে না করে হালকাভাবে নিই। যাতে উপভোগ করতে পারি।’ গত আসরে টানা আট জয়ের পর রংপুর রাইডার্স হঠাৎ ছন্দ হারিয়ে ফেলে। কয়েকটি ম্যাচ হেরে চাপে পরে গিয়েছিল দল। সেই চাপ তিনি সামাল দিয়েছিলেন ঠান্ডা মাথায়, ‘গত বছর আমরা টানা আটটি ম্যাচ জেতার পর শেষের দিকে যখন ৪-৫টি ম্যাচ হারলাম, আমাদের জন্য বিষয়টা ছিল কষ্টের। ভালো করতে আমরা অবশ্যই চেষ্টা করছিলাম। আমার নিজের ওপর অনেক চাপ তৈরি হয়েছিল। কারণ টানা জেতার পর টানা চারটি ম্যাচ হারায় খারাপ লেগেছিল। এটা খেলারই অংশ। আমরা চেষ্টা করেও হেরে গিয়েছি।’ হারের পর অন্য দলগুলো যখন খেলোয়াড় বা ম্যানেজমেন্টকে দোষারোপ করে, রংপুর রাইডার্স সে পথে না হেঁটে টিম ম্যানেজমেন্ট বা কোনো ক্রিকেটারকে দোষারোপ করে না। রংপুরের টিম ডিরেক্টর শেহজাদ মনে করেন দলকে উদ্দীপ্ত করার এটাই মূলমন্ত্র, ‘আমরা কখনোই কোনো এক ব্যক্তিকে আলাদা করে বলি না যে, তোমার কারণে আমরা ম্যাচটি হেরেছি। আমরা সবসময় একটি দল হিসেবে দায়িত্ব নিই। আমরা একসঙ্গে দোষ স্বীকার করি, সেখান থেকে শিখি এবং পরবর্তী ম্যাচে আরও ভালো করার চেষ্টা করি।’
গ্লোবাল টি-২০ সুপার লিগে দুবার ফাইনাল খেলেছে। প্রথম আসরে চ্যাম্পিয়ন। পরের আসরে রানার্সআপ। বিপিএলে চ্যাম্পিয়ন ২০১৭ সালে। এরপর আর শিরোপা উৎসব করা হয়নি। এবার মুস্তাফিজুর রহমান, লিটন দাস, তাওহিদ হৃদয়, নাহিদ রানাদের মতো ক্রিকেটার দলভুক্ত করেছেন। টার্গেট শিরোপা। দল নিয়ে তাই টিম ডিরেক্টর আত্মবিশ্বাসী, ‘এ বছর আমি অনেক আত্মবিশ্বাসী। আমাদের ব্যাটিং লাইনআপ খুব পছন্দ হয়েছে। আমাদের বিদেশি খেলোয়াড়দের লাইনআপও খুবই শক্তিশালী। লিটন কুমার দাস একজন ক্লাসিক্যাল খেলোয়াড়। তাওহিদ হৃদয় অত্যন্ত মেধাবী। এ দুজন যদি একসঙ্গে ক্লিক করেন, তবে আমাদের জন্য রান তোলা সহজ হবে। আমাদের বিদেশি খেলোয়াড়রাও চমৎকার। দলে একঝাঁক প্রতিভাবান পেসার এবং দক্ষ লেগ স্পিনার রয়েছে।’ বিপিএলের চলতি আসরে রংপুরের কোনো চ্যালেঞ্জ দেখছেন না শেহজাদ, ‘আমি কোনো চ্যালেঞ্জ দেখছি না। আমরা দীর্ঘ সময় একসঙ্গে খেলছি। আমি ইতিবাচক দিকে মনোযোগ দিচ্ছি। দল মাঠে জ্বলে উঠুক।’
রংপুরকে দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন নুরুল হাসান সোহান। সোহানের ওপর আস্থার কারণও ব্যাখ্যা করেন তিনি, ‘সোহান গত বছর আমাদের জন্য খুব ভালো অধিনায়কত্ব করেছেন। টানা আটটি ম্যাচ জিতেছিলেন। এরপর যখন আমরা কিছু ম্যাচ হারলাম, সেটি পুরো দলের ব্যর্থতা ছিল, কোনো একক ব্যক্তির নয়। মাঝে মধ্যে দল ব্যর্থ হবে। সেখানে আমাদের কিছু করার থাকে না। অধিনায়ক হিসেবে সোহান তার সেরাটা দিয়েছেন। ২০২৬ সালের জন্য আমাদের অধিনায়ক হিসেবে তার ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে।’ বোলিং বিভাগে দলের মূল আস্থা মুস্তাফিজুর রহমান। আইপিএলে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে মুস্তাফিজকে দলভুক্ত করেছে কলকাতা নাইট রাইডার্স। বাঁ-হাতি পেসার রয়েছেন এবার ছন্দে। তার ওপর অনেক প্রত্যাশা দলের বলেন শেহজাদ, ‘অবশ্যই অনেক প্রত্যাশা। মুস্তাফিজ আইএলটি-২০তে খুব ভালো বোলিং করেছেন। আমি স্টেডিয়ামে বসে সেই ম্যাচ দেখেছি। তিনি এক ওভারে ৩টি উইকেট নিয়েছিলেন। আমার মনে হয় বাংলাদেশে যত ডেথ ওভার বোলার আছে, মুস্তাফিজ তাদের মধ্যে অন্যতম সেরা।’ পড়াশোনা করেন বলে হয়তো দলের সঙ্গে পুরোটা সময় থাকতে পারবেন না। তারপরও খেলা দেখবেন টিম ডিরেক্টর, ‘আমি এক দিন দলের সঙ্গে থাকব, তারপর সিলেটে গিয়ে খেলা দেখব।’
বিপিএলের ছয় দলের মধ্যে একমাত্র রংপুরের নিজস্ব ভেন্যু আছে। বসুন্ধরা স্পোর্টস সিটিতে অনুশীলনের সব ধরনের সুবিধা রয়েছে। যা একটি দল ও ক্রিকেটারদের জন্য স্বপ্নের। নিজস্ব ভেন্যু থাকা রংপুরের জন্য বাড়তি সুবিধা বলেই মনে করেন টিম ডিরেক্টর, ‘এ মাঠ থাকাটা রংপুর রাইডার্সের জন্য অনেক ভালো। আমাদের নিজস্ব হোম গ্রাউন্ড আছে। নিজস্ব পরিবেশে খেলোয়াড়রা খুব স্বাচ্ছন্দ্যে খেলছেন। কোনো কোনো মাঠে দুটি দলকে অনুশীলন করতে দেখা যায়। অথচ রংপুর রাইডার্স কোনোরকম দুশ্চিন্তা ছাড়াই নিজেদের মতো করে অনুশীলন করে।’