Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:২৯
ব্যক্তিগত উদ্যোগে দুর্লভ সংগ্রহশালা
তুহিন ওয়াদুদ
ব্যক্তিগত উদ্যোগে দুর্লভ সংগ্রহশালা

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকটবর্তী অক্ট্রয় মোড়ে অবস্থিত দুর্লভ এবং বিশাল এক সংগ্রশালা ‘হেরিটেজ আর্কাইভস’। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান একক প্রচেষ্টায় মাত্র কয়েক বছরেই এটি গড়ে তুলেছেন।

ব্যক্তিগত উদ্যোগে তিনি ২০০২ সালে নিজ বাসায় ‘হেরিটেজ আর্কাইভস’ নামে একটি সংগ্রহশালার কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে সংগৃহীত উপাত্ত বৃদ্ধি পেলে তিনি বৃহৎ পরিসরে কাজ করার জন্য ২০০৭ সালে ‘হেরিটেজ আর্কাইভস ট্রাস্ট’ গঠন করেন। হেরিটেজ আর্কাইভসটি পরিকল্পিতভাবে সাজানো। নিজের স্বপ্ন একদিন বাড়ির মধ্যে একটি কক্ষে বাস্তবে রূপ লাভ করেছিল। অল্পদিনের মধ্যে তা বিকশিত হয়ে ওঠে। সেই বিকশিত স্বপ্নের পথ ধরে তিনি হেঁটে চলেছেন। এখন তার ধ্যান-জ্ঞান হচ্ছে এই আর্কাইভস। মেধা-সময়-শ্রম-অর্থ সবকিছু বিনিয়ায়োগ করে তিনি ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষাকেই এখন জীবনের সাধনা হিসেবে বিবেচনা করছেন।

সম্প্রতি এক সন্ধ্যায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বন্ধুপ্রতিম রহমান রাজু নিয়ে যান হেরিটেজ আর্কাইভসে। প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক মাহবুবর রহমান স্যার নিজেই ঘুরে ঘুরে দেখান তার অসামান্য সংগ্রহশালা। যতই দেখছিলাম ততই মনে হচ্ছিল একটি ভবনের কয়েকটি কক্ষে হেঁটে বেড়াচ্ছি না, অতীত সময়ের এক বিশাল পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। একক চেষ্টার বিশাল সংগ্রহ যতই দেখছিলাম ততই বিস্মিত হচ্ছিলাম। যখন হেরিটেজ আর্কাইভস থেকে বেরিয়ে আসি, তখন মনে হচ্ছিল একটি ভবনের ভিতরের এক বিপুল তথ্যভাণ্ডার থেকে বেরিয়ে আসছি।

বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার ইতিহাস-পত্র-পত্রিকা-সাময়িকী রাখার জন্য সেলফে আলাদা আলাদা ব্যবস্থা আছে। যে কেউ এই আর্কাইভসে বসে দেশের সব জেলার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। এমনি পরিকল্পিতভাবে সাজানো সবকিছুই যে যার যা প্রয়োজন তিনি সেটা সহজেই বিষয় ধরে খুঁজে পাবেন। কোনোরূপ বেগ পেতে হবে না।

আর্কাইভসে শুধু লিফলেট আছে সাড়ে তিন হাজার। এই লিফলেটের প্রায় সাতশটি তিনি সংগ্রহ করেছেন নেদারল্যান্ডসের ‘নেদারল্যান্ডস ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল হিস্ট্রি’ থেকে। অধ্যাপক মাহবুবর রহমান বলছিলেন ‘আমরা দেশের তথ্য সংগ্রহ না করলেও বিদেশের প্রতিষ্ঠান সংগ্রহ করছি। ’ রাজনৈতিক সংগঠন, সামাজিক সংগঠন, ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনসহ বিভিন্ন ধরনের ইস্যুতে এসব লিফলেটেও আছে ইতিহাসের নানা উপাত্ত। বিভন্ন দাবিতে কিংবা বিভিন্ন প্রচারণার পোস্টার আছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার। এসবের মধ্য থেকে বেশ কিছু পোস্টার বাঁধাই করেও রাখা আছে। এই পোস্টারগুলোও কালের সাক্ষী।

১৯৯৮ সাল থেকে ‘সংবাদ’ এবং ‘একতা’ পত্রিকার সব প্রকাশনাই সংগৃহীত আছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভ্যানগার্ড যতগুলো প্রকাশিত হয়েছে তার প্রায় সবই রয়েছে। ২৫০০ শিরোনামের কয়েক হাজার সাময়িক পত্রিকা আছে। ‘বেগম’ পত্রিকার প্রায় সংখ্যাই এখানে পাওয়া যাচ্ছে। ১৯৬২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত ‘দেশ’ পত্রিকার প্রায় সব সংখ্যাই রয়েছে। দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে যে ক্রোড়পত্রগুলো প্রকাশিত হয়, সেগুলোর সংগ্রহ রয়েছে সেখানে। এ ছাড়াও সেখানে ইস্যুভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করা আছে। যেমন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে বিভিন্ন পত্রিকার বিশেষ রচনাগুলো একসঙ্গে করে পেপার ক্লিপিং করা আছে। পরিবেশ, গণজাগরণ মঞ্চসহ বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক ৫০ প্রকার পেপার ক্লিপিং আছে সেখানে। যেগুলো বিষয়ভিত্তিক তথ্য এবং জ্ঞান বিস্তারে ভূমিকা রাখছে।

পার্বত্য এলাকা এবং আদিবাসীদের নিয়ে প্রায় একশ গ্রন্থ রয়েছে। লিটল ম্যাগাজিন আছে ১২শ। খ্যাতিমান অধ্যাপক ও লেখক হাসান আজিজুল হক, কবি আবু বকর সিদ্দিক, অধ্যাপক মুনতাসির মামুন, কবি সাজ্জাদ কাদির নিজেদের অনেক সংগ্রহ জমা দিয়েছেন এ আর্কাইভসে।

শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয়ের আড়াইশ থিসিস সংগ্রহ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ পরীক্ষকদের কাছ থেকে এগুলো সংগ্রহ করা। শুধু মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গ্রন্থেরও বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। ব্রিটিশদের লিখিত ১৭৭০ থেকে ৯০ দশক পর্যন্ত ঢাকা, কুমিল্লা এবং চট্টগ্রামের কয়েক হাজার চিঠিপত্র সংগৃহীত আছে হেরিটেজ আর্কাইভসে।

পাঁচতলা একটি ভবনের তিনটি ফ্লোরে সাড়ে চার হাজার বর্গফুটজুড়ে রয়েছে এই আর্কাইভস। মূলত উদ্যোক্তা অধ্যাপক মাহবুবর রহমানের বাড়ি এটি। ভবনটির চতুর্থ এবং পঞ্চম তলা এখন তার নিজের। প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় তলা আর্কাইভসের নামে দেওয়া।

বিভিন্ন সময়ে আর্কাইভসে কিছু আর্থিক পুঁজি জমা হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকাকালীন অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছেন। সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী দিয়েছেন প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা। স্থানীয় সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশাহ দিয়েছেন পাঁচ লাখ টাকা। ভবন সম্প্রসারণের জন্য বড় অনুদান দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান দিয়েছেন এক লাখ টাকা। অনুদান কখনো কারও কাছ থেকে চেয়ে নেওয়া হয় না। স্বেচ্ছায় এ অনুদান কেউ প্রদান করলে তবেই নেওয়া হয়।

হেরিটেজ আর্কাইভস গবেষণার জন্য এক ভিন্ন মাত্রার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। গবেষকরা যাতে সেখানে রাতযাপন করে গবেষণার কাজ করতে পারেন সে জন্য ভবনেই দুটি কক্ষ রাখা আছে। দূর থেকে এসে সেখানে থেকেই করতে পারবেন গবেষণার কাজ। একটি ফটোকপি মেশিনও রাখা হয়েছে। হেরিটেজ আর্কাইভস থেকে ‘স্থানীয় ইতিহাস’ নামে একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ করা হয়। এ পর্যন্ত তার ১৫টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। এ ম্যাগাজিনটিও ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণে অনেক বড় ভূমিকা পালন করছে। অধ্যাপক মাহবুবর রহমান এ ম্যাগাজিনটিরও প্রাণপুরুষ।

‘পারিবারিক আর্কাইভস’ নামে একটি কর্নার রাখা হয়েছে। এই কর্নারে লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন উপকরণ সন্নিবেশিত হয়েছে। আমাদের লোকজীবনের বিলুপ্ত কিংবা বিলুপ্তির পথে এমন উপকরণ স্থান পাচ্ছে সেখানে। হারিয়ে যাওয়া ৬৮ প্রকার ধানের সংগ্রহ আছে সেখানে।

দেশে সংগ্রহশালা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে অধ্যাপক মাহবুবর রহমান উদ্যোগ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক শরিফ উদ্দীন আহমেদসহ ‘বাংলাদেশ আর্কাইভস অ্যান্ড রেকর্ডস ম্যানেজমেন্ট সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। মাহবুবর রহমান বলেন, ‘প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আর্কাইভস থাকা প্রয়োজন। ’

আর্কাইভস পরিচালনায় অধ্যাপক মাহবুবর রহমান থাকলেও তাকে সহযোগিতা করেন তার দুই ছাত্র। বিনা পারিশ্রমিকে কায়সারুজ্জামান এবং সোনাউল হক প্রতিদিন কাজ করেন। দুজনই দুর্গাপুর উপজেলায় দুটি বেসরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। কায়সারুজ্জামান জানালেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ ছুটির দিন ছাড়া শুক্রবারসহ বছরের প্রতিটি দিন আমরা বিকাল সাড়ে চারটা থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত আর্কাইভস খোলা রাখি। ’ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো রুটিন করে বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অন্তত একবার করে পরিদর্শন করতে পারে এ তথ্যভাণ্ডার। যারা রাজশাহীতে যে কোনো কাজে যান তারাও একবার ঘুরে যেতে পারেন আর্কাইভসটি।  

বাংলাদেশে ন্যাশনাল আর্কাইভস অব বাংলাদেশ, জেলা কালেক্টরেটে কিছু কিছু তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। এ ছাড়াও জেলা জজ আদালতেও কিছু কিছু তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু এ ছাড়া সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য কোনো সংগ্রহশালা নেই। যতদূর জানা যায় বেসরকারি পর্যায়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংগ্রহশালা ‘হেরিটেজ আর্কাইভস’। এখন অধ্যাপক মাহবুবর রহমান স্বপ্ন দেখেন দেশের সব জেলায় একটি করে হেরিটেজ আর্কাইভস হবে।

গবেষকদের জন্য একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় দুর্লভ প্রতিষ্ঠান এখন এ আর্কাইভস। একক প্রচেষ্টায় গড়ে উঠা এ প্রতিষ্ঠান এখন একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সরকার কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে যে কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তি মাহবুবর রহমানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে জেলায় জেলায় একটি করে হেরিটেজ আর্কাইভস গড়ে তুলতে পারে।

সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে গবেষক পর্যন্ত সবার চাহিদা পূরণ করছে ‘হেরিটেজ আর্কাইভস’। ব্যক্তিচেষ্টায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। তার এ অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত যদি জেলায় জেলায় ন্যূনতম একজন করেও গ্রহণ করেন তাহলে আমাদের দেশের অনেক কিছুই দীর্ঘস্থায়ী রূপ    লাভ করবে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow