Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০১৫ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩০ অক্টোবর, ২০১৫ ০১:০৯

আমার প্রিয় ছবি

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

আমার প্রিয় ছবি
দ্য লাস্ট সাপার (১৪৯৮) কনভেন্ট অব স্টে. মারিয়া দেল গ্যরেজি, মিলান, ইতালি

কোনো একটি ছবিকে যদি আলাদা করতে বেছে নিতে হয়, তবে নেব লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির ‘দি লাস্ট সাপার’কে। শিল্পী হিসেবে দ্য ভিঞ্চি অসামান্য; তার ওই ছবিটি অতুলনীয়। বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত শিল্পকর্মগুলোর ভিতর ওটি একটি। তার অন্য একটি ছবি অবশ্য আরও বেশি পরিচিত, সেটি হলো ‘মোনালিসা’। মোনালিসাকে দেখার আগ্রহ ও তার সম্বন্ধে জানার কৌতূহল বিশ্বজনীন। ছবিটি রাখা আছে প্যারিসের লুভর মিউজিয়ামে। বছরে ওটি ৬০ লাখ লোক দেখে বলে হিসাব পাওয়া গেছে। ‘দি লাস্ট সাপার’ অতটা জনপ্রিয় নয়, তবে ‘মোনালিসা’র চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ, যে জন্য ওটিকেই আমি সবচেয়ে প্রিয় বলব।

‘মোনালিসা’র কথাই প্রথমে স্মরণ করা যাক। ওই ছবিতে শিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির সব গুণেরই পরিচয় পাওয়া যাবে। ওটি একটি মহিলার আবক্ষ প্রতিমূর্তি। মহিলা একজন ধনী ব্যবসায়ীর স্ত্রী। তার নাম লিসা। লিসার সঙ্গে মোনা অর্থাৎ মাদাম যুক্ত করে মোনালিসা। কিন্তু এটি কেবল একজন মহিলার বাস্তবিক প্রতিকৃতি নয়, বাস্তবতাকে ভিত্তি করে এবং তাকে ছাড়িয়ে গিয়ে ছবিটি একটি আদর্শায়িত মানুষের মুখ্যছবি হয়ে উঠেছে। স্থির মানুষটির জীবন্ত মানুষের চেয়েও জীবন্ত। মোনালিসা বিশেষভাবে বিখ্যাত তার মুখের হাসিটির জন্য। আলো-ছায়ার খেলাতে সে-মুখের প্রসন্ন হাসিটি অত্যন্ত রহস্যময়। চোখে ও ঠোঁটে এক অসাধারণ প্রসন্নতা। যে দেখে, যেভাবেই দেখে, যে কোণ থেকেই দেখে, মনে হয় তার দিকে তাকিয়েই হাসছে। স্মিত, কাছের অথচ অনেক দূরের; শরীরী তবু অশরীরী। পেছনে জনপদ ও প্রকৃতির আভাস রয়েছে। পটভূমিটি কিছুটা চঞ্চল, কিন্তু সামনের মানুষটি স্থির, যদিও অত্যন্ত জীবন্ত। কি ধরনের মানুষ ছিলেন ওই মানুষটি? সে নিয়েও নানা মত আছে। তিনি কি বধির? বিয়োগব্যথায় কাতর? অন্তঃসওা ছিলেন কি, যে জন্য অমন পূর্ণতা তার ভিতর? মূল কথাটা তার ব্যক্তিগত পরিচয় যা-ই হোক না কেন, তিনি রহস্যময়; কারণ শিল্পীর তুলিতে আঁকা।

মোনালিসার গুণগুলোর প্রায় সবকটিই লাস্ট সাপারে উপস্থিত। মোনালিসা পরের, লাস্ট সাপার আগের; তাই বলা যাবে যে পরেরটিতে আগেরটির বৈশিষ্ট্যগুলো আরও বিকশিত বটে, তবে আগেরটিতে পরেরটির সম্ভাবনাগুলো পুরোপুরি উপস্থিত। আলো-ছায়ার সঞ্চালন, ছন্দময়তা, পেছনের সজীব কিন্তু শান্ত পটভূমি সামনের মানুষটির চরিত্র অবলোকন এবং ছবিতে তা ফুটিয়ে তোলা উপস্থাপনার ত্রিমাত্রিকতা, বাস্তবিকতার সঙ্গে আদর্শায়নের সংমিলন-মোনালিসার এসব গুণ লাস্ট সাপারেও উপস্থিত রয়েছে। মোনালিসা আঁকতে সময় লেগেছিল চার বছর, লাস্ট সাপার সমাপ্ত হয় পাঁচ বছরে। তুলনায় মোনালিসার ক্যানভাসটি ছোট, দৈর্ঘ্যে ৩০ ইঞ্চি প্রস্থে ২১; লাস্ট সাপারের আয়তন দৈর্ঘ্যে ২৯ ফুট, প্রস্থে ১৫ ফুট। লাস্ট সাপারে চরিত্র একজন নয়, দুজনও নয়, ১৩ জন। এরা পরস্পরের পরিচিত, কেবল পরিচিত নন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। একেবারে কেন্দ্রে রয়েছেন যিশু, তার সঙ্গে দুই পাশে বসে আছেন ছয়জন করে ১২ জন বিশিষ্ট অনুসারী। একসঙ্গে তারা খেতে বসেছেন। উপলক্ষ একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান, ইহুদিরা যেটি পালন করে শরণার্থী হিসেবে মিসর থেকে উদ্ধার পাওয়ার ঘটনাকে স্মরণ করে। সান্ধ্যভোজটি আনন্দেরই হওয়ার কথা, কিন্তু এরই মধ্যে হঠাৎ করে যিশু বলে উঠলেন, তোমাদের মধ্য থেকে একজন আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে।

ঘোষণার আকস্মিকতা ও ভয়াবহতায় সঙ্গীরা একই সঙ্গে ভীষণ বিস্মিত ও অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। আসন্ন বিপদে কিংকর্তব্যবিমূঢ়তার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাসও দেখা দিয়েছে। কে সেই ব্যক্তি যে প্রভুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে? তাৎক্ষণিক ওই প্রতিক্রিয়াটিকেই লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ধারণ করেছেন তার ছবিতে। বিশেষ একটি মুহূর্তকে তিনি চিরকালের জন্য ধরে রেখেছেন। ইতিহাসের একটি ক্রান্তিবিন্দু সর্বকালের হাতে চলে গেছে। বাইবেলের ধর্মীয় কাহিনী ইহজাগতিক শিল্পকলায় রূপান্তরিত হয়েছে।

মোনালিসার ছবিতে যেভাবে একজন মানুষকে গভীর মনোযোগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে, লাস্ট সাপারের ১৩ জন মানুষই অতটা না হলেও কাছাকাছি মাত্রায় মনোযোগ পেয়েছেন। তারা প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র। ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় সেই স্বাতন্ত্র্য বিশেষভাবে উদ্ভাসিত। প্রধান ব্যক্তি যিশু নিজে।
শেষ সান্ধ্যভোজনের ওই দৃশ্যটি নিয়ে অন্য শিল্পীরাও ছবি এঁকেছেন। দ্য ভিঞ্চির সময়ে শিল্পীদের জন্য ওটি একটি আকর্ষণীয় বিষয় ছিল। ওই সব ছবিতে দেখা যাবে, টেবিলের দুই পাশে ১৩ জন বসে আছেন। দ্য ভিঞ্চির ছবিতে এরা দুই পাশে নয় একসারিতে বসা; ফলে দর্শক তাদের সবাইকে সামনাসামনি দেখতে পান। কোনো কোনো ছবিতে দেখা যাবে এদের সবার মাথাকে কেন্দ্র করে গোলাকার আলোকবৃত্ত রয়েছে, কেবল একজন ছাড়া। সে ব্যক্তি বিশ্বাসঘাতক জুডাস। টাকার বিনিময়ে যে প্রভু যিশুকে রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের হাতে ধরিয়ে দেবে। যিশুর চরিত্র একজন বিপ্লবীর; প্রচলিত ধর্মমতের তিনি বিরোধী, স্বৈরাচারী রাষ্ট্রীয় নীতির তিনি প্রতিপক্ষ; তাই ধর্মযাজক ও রাষ্ট্রের শাসক দুই পক্ষ এক হয়েছে এই বিপ্লবীকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য। তারা যিশুর সন্ধান পাচ্ছিল না। জুডাস তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। বলেছে, টাকা দিলে সে ধরিয়ে দেবে। ৩০টি রৌপ্যমুদ্রা পেয়েছে সে অগ্রিম হিসেবে। সেই থেকে জুডাস বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিমূর্তি বলে চিহ্নিত হয়ে আসছে। শেষ সান্ধ্যভোজের অন্য ছবিতে ঘৃণার্হ জুডাসকে আলাদা করে দেখানো হয়, সে এক কোণে বসে থাকে, নিজেকে কিছুটা আড়ালে রেখে। দ্য ভিঞ্চির ছবিতে সে বসে রয়েছে অন্য সবার সঙ্গেই। কারোর জন্যই অলৌকিক আলোকবৃত্তের ব্যবস্থা নেই। খাবার টেবিলে প্লেট, রুটি, গ্লাসÑ সব দেখা যাচ্ছে। এগুলো যতেœর সঙ্গে আঁকা। প্রতিটি ইতিহাসসম্মত। টেবিলের ওপরের ঢাকনার ব্যাপারটাও তাই।

তিনজন তিনজন করে চারটি দলে ভাগ হয়ে তারা বসেছেন। মাঝখানে যিশু। পেছনে তিনটি জানালা। জানালা দিয়ে বাইরের প্রকৃতি ও জনজীবনের আভাস পাওয়া যায়। ওই তিনেরও একটা তাৎপর্য রয়েছে। যিশু প্রচারিত খ্রিস্টধর্মে তিনে মিলে একটি একক গঠিত, তাতে আছেন পিতা, পুত্র, পবিত্র আত্না এই ত্রয়ী। সান্ধ্যভোজ শেষে যিশু একটি উদ্যানে যান এবং সেখানে মাটিতে নত হয়ে তিনবার প্রার্থনা করেন। গ্রেফতার করে তাকে রোমান গভর্নর পাইলেটের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, পাইলেট একবার নয়, তিনবার জানতে চান যিশুর অপরাধটি কি? যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয় বেলা ৩টায়, দুপুর ১২টা থেকে সেদিন তিন ঘণ্টা পৃথিবী অন্ধকারে ছিল। যিশুকে রক্ষা করার জন্য বিশেষভাবে তৎপর ছিলেন সন্ত পিটার। যিশু তাকে বলেছিলেন প্রত্যুষে মোরগডাকের আগেই তুমি তিনবার আমাকে অস্বীকার করবে। পিটার ঠিক তাই করেছেন। দ্য ভিঞ্চির ছবিতে দেখে খ্রিস্টান দর্শকদের বাইবেল বর্ণিত এসব অনুষঙ্গ মনে পড়ার কথা।

ছবিতে যিশুর নিজের অবস্থানকে দেখায় একটি ত্রিভুজের মতো। তার পা মাটিতে, টেবিলের ওপর তিনি হাত ছড়িয়ে রেখেছেন, ডান হাত এক টুকরো রুটিকে স্পর্শ করতে চাইছেন। সব মিলিয়ে প্রতিকৃতিটি একটি ত্রিভুজের আভাস দেয়। যিশু বলেছেন, তিনি ক্রুশবিদ্ধ হবেন ঠিকই, কিন্তু তিন দিন পরে কবর থেকে উঠে আসবেন। সে ঘটনাও ঘটেছে।

ছবিতে অন্য সবাই চিন্তিত, কাতর, অস্থির, বিচলিত। কেবল যিশুই স্থির ও নিশ্চিত। তিনি জানেন, এটিই তার শেষ আহার। যিশুর এই স্বতন্ত্র ভাবও চোখে-মুখে,  বসার ভঙ্গিতে জ্ঞান ও প্রতিক্রিয়া আঁকার ব্যাপারে দ্য ভিঞ্চিকে যথেষ্ট কষ্ট করতে হয়েছে। কঠিন ছিল যিশুর অবস্থানের ঠিক বিপরীতে রয়েছে যে বিশ্বাসঘাতক জুডাস তাকে অঙ্কন করা। জুডাসের জন্য যথোপযুক্ত একটি মুখাবয়বের সন্ধানে শিল্পীকে বহু মানুষকে পর্যবেক্ষণ করতে হয়েছে, মিলাননগরের কারাগারগুলোতে গিয়ে নিকৃষ্টতম দুর্বৃত্তদের মুখের ভিতর তার অন্বিষ্ট দুর্বৃত্তটির আদর্শ খুঁজেছেন। ছবিটি আঁকতে বিলম্ব হচ্ছে দেখে মঠের কর্তাব্যক্তিদের একজন দ্য ভিঞ্চিকে তাগাদা দিচ্ছিলেন; পরিহাস করে তিনি শাসিয়ে গিয়েছিলেন, যে জুডাসের জন্য উপযুক্ত দুর্বৃৃত্তের মুখের ছবিটির যদি সন্ধান না পান, তবে শেষমেশ ওই কর্তাটির মুখ্যছবিরই তিনি শরণাপন্ন হবেন।

দ্য ভিঞ্চির ছবিতে জুডাসের চিত্রায়ণটি লক্ষ্য করার মতো। যিশু সে সত্য ফাঁস করে দিয়েছেন তার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বাসঘাতকের প্রতিক্রিয়াটি অপর কারও মতোই হওয়ার নয়, হয়ওনি।  তার আতঙ্কটা অন্যদের থেকে আলাদা। সে ভাবছে, খবরটা কি করে ফাঁস হলো? ফাঁস যখন হয়েছেই তখন অন্যরা না আবার জেনে ফেলে। তবে তো ভয়ঙ্কর বিপদ। সে তাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। বাগানে গিয়ে যিশুকে চুম্বন করার মধ্য দিয়ে সে শত্র“পক্ষকে জানিয়ে দেবে যে ওই ব্যক্তিকেই তারা খুঁজছে। যিশুকে ওরা চিনত না। রাজপ্রহরীরা ও ধর্মযাজকরা আসবে মশাল হাতে, সেই আলোতে জুডাসের ইশারা অনুসরণ করে তারা চিনে ফেলবে যিশুকে এবং তাকে ধরে নিয়ে অর্পণ করবে রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের কাছে, এই ছিল আয়োজন।

 সে আয়োজনের জ্ঞান জুডাসের মনের মধ্যে ছায়া ফেলেছে, ছায়া ফেলেছে তার আচরণেও। দেখা যাচ্ছে অন্য সবার তুলনায় তার মাথাটা রয়েছে নিচুতে; অন্য কারও নয়, শুধু তার ডান হাতের কনুই-ই টেবিলের ওপর ভর করে আছে। ডান হাতে সে একটি টাকার থলি ধরে রেখেছে, বাম হাত এগিয়ে দিচ্ছে রুটির একটি টুকরো ধরবে বলে। ইতিমধ্যে তার বাম হাতে লেগে লবণের পাত্রটি উল্টে পড়ে গেছে টেবিলে। যেন সে স্বস্তি পাচ্ছে না, অস্থিরতার ভেতর রয়েছে। টাকার থলে ও লবণ দুটোই তাৎপর্যপূর্ণ। জুডাসের হাতে ছিল দলের টাকার ভার। বলা যায় সে ছিল কোষরক্ষক।

গরিবদের দেওয়ার জিনিসপত্র কেনার জন্য টাকা তার কাছেই থাকত। থলেটা তার হাতে থাকা অস্বাভাবিক নয়; ওই থলেতে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য প্রাপ্ত ৩০টি মুদ্রাও থাকতে পারে; সব মিলিয়ে টাকা যে গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝা যাচ্ছে। টাকার কাছে সে বশ হয়েছে এবং টাকাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। লবণেরও বিশেষ অনুষঙ্গ রয়েছে। লবণকে দেখা হতো আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে। লবণ ফেলে দেওয়াটাকে বিশ্বাসঘাতকতার ছায়াপাত মনে করা অন্যায্য নয়।   [ চলবে ]


আপনার মন্তব্য