Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:১৭

ভারতের আধ্যাত্মিক জগতের সম্রাটরা

ভারতীয় উপমহাদেশে সুফি সাধক পীর আউলিয়ার মাধ্যমেই ইসলামের প্রচার ও প্রসার হয়েছে। এই উপমহাদেশে কত মুজাদ্দিদ, আউলিয়া-মাশায়েখ, ফিকহ, ইমাম ওলামায়ে কেরামের জন্ম হয়েছে তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই কারও কাছে। তবে অনেক আউলিয়া মাশায়েখ শত শত বছর ভক্তকুলের কাছে ঠিক একই রকম অবস্থান ধরে রেখেছেন। শত শত বছর পেরিয়ে গেলেও এসব পীর-আউলিয়া জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছেন। ভারতের কয়েকজন পীর-আউলিয়াকে নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন

মুহাম্মদ সেলিম, ভারত থেকে ফিরে

ভারতের আধ্যাত্মিক জগতের সম্রাটরা

খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি (রহ.)

দক্ষিণ এশিয়ার বিখ্যাত সুফি-সাধকের একজন খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি (রহ.)। যিনি খাজা বাবা নামেই অধিক পরিচিত। যাকে ‘সুলতান-উল হিন্দ’ নামেও অভিহিত হয়। খাজা মঈনুদ্দীন (রহ.) ভারতীয় উপমহাদেশে চিশতিয়া ধারা প্রতিষ্ঠিত এবং পরিচিত করেন। ভারতে চিশতিয়া ধারার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক ধারা পরবর্তীতে তার খলিফা কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকি, নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.), বাবা ফরিদসহ অন্যান্য খলিফা এ ধারাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি (রহ.) মধ্যে এশিয়া খোরাসানের সানজার নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সৈয়দ খাজা গিয়াস উদ্দিন এবং মাতার নাম সৈয়দা উম্মুল ওয়ারা মাহেনূর। তিনি পিতার দিক দিয়ে হজরত আলী (রা.) এবং মাতার দিক দিয়ে হজরত ফাতেমা জোহরা (রা.) বংশধর। তিনি বংশে হাসানী-হোসাইনী আওলাদে রসুলের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অশেষ সৌভাগ্যের অধিকারী।

খাজা গরিবে নেওয়াজ পিতার কাছ থেকে   প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। মাত্র নয় বছর বয়সে তর্জমাসহ পবিত্র কোরআন শরিফ হেফজ করেন। পিতার সার্বিক তত্ত্বাবধানে কোরআন, হাদিস, ফিকহ, উসুল, তাফসির, আরবি সাহিত্য-ব্যাকরণ, মানতিক, হিকমত দর্শন ইত্যাদি বিষয়ে অসামান্য জ্ঞান অর্জন করেন। সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য পাওয়ার জন্য তিনি অজানা উদ্দেশ্যে বের হন। আল্লাহর ধ্যানে ব্যাকুল হয়ে তিনি দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। বুখারা, ইরাক, নিশাপুর প্রভৃতি জায়গায় যেখানে অলি বুজুর্গ, দরবেশের সন্ধান পান, সেখানেই অবস্থান নিয়ে ইলমে মারেফত অর্জনে সফর অব্যাহত রাখেন। এক সময় বোখারা থেকে নিশাপুরে চলে আসেন। সেখানে যুগশ্রেষ্ঠ অলি হজরত ওসমান হারুনী (রহ.) তাকে খিলাফত প্রদান করেন। তখন থেকেই তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনার শুরু। তাঁর জীবনীগ্রন্থ থেকে জানা যায়, প্রায় বিশ বছর তিনি পীরের খেদমত করে নিজের আধ্যাত্মিকতার উৎকর্ষ সাধন করেন।

এক সময় খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি (রহ.) ভারতের আজমীরে আসেন ইসলাম প্রচার করতে। তাদের কাফেলা অবস্থান নেয় ‘আনা সাগর’ নামে একটি বিশাল হ্রদের পাশে। আনা সাগরের পাশেই ছিল অসংখ্য মন্দির। আনা সাগরের পানি শুধু উচ্চ বর্ণের হিন্দু ও পুরোহিতগণ ব্যবহার করতে পারতেন। একদিন মঈনুদ্দিন চিশতির (রহ.) শিষ্য মোহাম্মদ সাদি আনা সাগরে অজু করতে যান। এ সময় পুরোহিতরা তাকে অপমান করেন। পরে ওই শিষ্য সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলেন খাজা মইনুদ্দীন চিশতির (রহ.) কাছে। তখন তিনি হজরত খাজা মোহাম্মদ সাদীকে আনা সাগর থেকে একঘটি পানি আনার নির্দেশ দিলেন। নির্দেশ মতো মোহাম্মদ সাদী আনা সাগর থেকে একঘটি পানি আনতেই দেখা গেল সব পানি উধাও। পরে এ ঘটনার জন্য বাধ্য হয়ে রাজা পৃথ্বীরাজ ও তার অনুসারীরা ক্ষমা চাইলে আনা সাগরের পানি আগের পরিস্থিতি ফিরে আসে। এরকম হাজারো কেরামত রয়েছে যুগ শ্রেষ্ঠ অলি মঈনুদ্দীন চিশতি (রহ.)।

৬৩৩ হিজরির ৫ রজব দিবাগত রাতে হজরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি (রহ.) ইন্তেকাল করেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর। ওফাতের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পবিত্র কপাল শরিফে স্পষ্টভাবে স্বর্ণোজ্জ্বল আরবিতে লেখা ওঠে। যার বাংলা অর্থ- ইনি আল্লাহর বন্ধু আল্লাহর মুহব্বতেই তিনি রিছালত লাভ করেছেন।’

 

মুজাদ্দিদে আলফেসানি (রহ.)

যখন সমাজ কুসংস্কার ও অন্ধকারে পতিত হয় তখন একজন মুজাদ্দিদের আবির্ভাব ঘটে। যারা সমাজ সংস্কারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। এমন একজন মুজাদ্দিদ হচ্ছেন ইমামে রাব্বানি মুজাদ্দিদে আলফেসানি (রহ.)। যার আসল নাম হচ্ছে শায়খ আহমেদ। ৯৭১ হিজরিতে ভারতের পাঞ্জাবের শেরহিন্দে (রহ.) জন্মগ্রহণ করেন। মুজাদ্দিদে আলফেসানির জন্মের কথা ছয়শ বছর আগেই ওই এলাকার প্রখ্যাত অলি হজরত সৈয়দ মোহাম্মদ ইসমাইল বন্দেগি (রহ.) জেনেছিলেন। তখন তিনি সৃষ্টিকর্তার কাছে মুজাদ্দিদ আলফেসানি (রহ.) সঙ্গে সাক্ষাৎ করার আগ্রহ প্রকাশ করে দীর্ঘ হায়াত দিতে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করে সাড়ে ছয়শ বছরের হায়াত দেন। ১০৭৭ হিজরিতে আলফেসানির (রহ.) সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ইন্তেকাল করেন ইসমাইল বন্দেগি (রহ.)।

মুজাদ্দিদে আলফেসানি (রহ.) শিশু বয়সেই কোরআন হেফজ করেন। শেরহিন্দের বিখ্যাত আলেমদের কাছ থেকে ধর্মীয় শিক্ষা নেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি জাহেরি (প্রকাশ্য) ও বাতেনি (অপ্রকাশ্য) জ্ঞানের ভা-ারে পরিণত হন। এরপর দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার কাছে নিয়োজিত করেন নিজেকে। তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা নিতে হাজির হন হাজার হাজার ভক্ত। মুজাদ্দিদে আলফেসানির (রহ.) পূর্ব পুরুষগণ ছিলেন মারিফাতপন্থি। তাই ইলমে মারিফত অর্জনের বিষয়টা ছিল বংশগতভাবে প্রাপ্ত। তিনি কাদেরিয়া তরিকার শ্রেষ্ঠ অলি হজরত শাহ সিকান্দারের (রহ.) কাছে খিলাফত লাভ করেন। সে সময় ‘কুবারিয়া’ তরিকা খুবই প্রসিদ্ধ ও প্রসার ছিল। হজরত মাওলানা ইয়াকুব (রহ.) ছিলেন ওই তরিকার বিখ্যাত অলি। মুজাদ্দিদ আলফেসানি (রহ.) তাঁর কাছ থেকেও খিলাফাত লাভ করেন। মুজাদ্দিদ আলফেসানি (রহ.)-এর পিতা শায়খ আবদুল আহাদের মৃত্যুর আগে পুত্রকে বাতেনি শক্তি দান করে তার স্থলাভিষিক্ত করে যান। সে সময় প্রচলিত সমস্ত তরিকার কামালিয়াত হাসিন করেন। পিতার নির্দেশমতো নকশাবন্দিয়া তরিকার পরবর্তীকালে কামালিয়াত হাসিল করে ইলমে মারিফাতের মহাসাগরে পরিণত হন। 

প্রচলন রয়েছে মুজাদ্দিদ আলফেসানি (রহ.) হজ ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রওজা জিয়ারত করার ইচ্ছা শোষণ করেন। কিন্তু নানান কারণে তাঁর মনোবাসনা পূরণ হয়নি। এ সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তখন আল্লাহর নির্দেশে পবিত্র কাবা শেরহিন্দ শরিফে চলে আসে। তখন আলফেসানি (রহ.)-এর খানকা শরিফের কূপগুলো জমজমের পানিতে ভরে যায়। তার খানকা শরিফের জমিকে বেহেশতি জমির মর্যাদা দেওয়া হয়। এখনো শেরহিন্দ শরিফের মসজিদের জমজমের পানির উৎস্য বিদ্যমান রয়েছে। এ ছাড়া কথিত আছে আলফেসানির (রহ.) দরবারে মদিনা মনওয়ারার রসুল পাক (সা.)-এর রওজা শরিফের কিছু মাটি আছে যে মাটি নুহ (আ.)-এর তুফানের সময় মদিনা মুনওয়ারা থেকে এ শেরহিন্দ শরিফে আসে।

 

হজরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)

হজরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.) ছিলেন ভারতের সর্বশ্রদ্ধেয় আউলিয়াদের একজন। যাঁকে সবাই সুলতানুল মশায়েখ এবং মাহবুবে ইলাহি নামে ডাকতেন। তিনি চিশতিয়া তরিকার মহান সুফি সাধকদের একজন ছিলেন। তার পূর্বসূরিদের মধ্যে হজরত ফরিদ গাঞ্জশাকার, হজরত বখতিয়ার কাকি এবং গরিবে নেওয়াজ হজরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি (রহ.)-এর ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের চিশতিয়া তরিকায় আধ্যাত্মিক সিলসিলা। দানশীলতা, অতিথি পরায়ণতা, ধর্মপরায়ণতা এবং সরলতায় তিনি ভারতের অন্য সব সুফি সাধককে ছাড়িয়ে গেছেন। তাঁর অনেক শিষ্য ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ, বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ধর্ম প্রচার করেছেন। বেঁচে থাকা অবস্থায় হাজার হাজার ভক্ত হজরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)-এর দরবারে আসত মনোবাসনা পূরণের আশায়। এখনো প্রতি বছর লাখো অনুসারী লাখো ভক্তের আগমন ঘটে নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)-এর মাজারে। মুসলিম ছাড়া, হিন্দু, শিখ ধর্মের অনুসারীরা বার্ষিক ওরশে অংশগ্রহণ করেন। সমবেত ভক্তরা মাজারে ফুল এবং মাজার চত্বরে কাউয়ালি গেয়ে নিজেদের মনোবাসনা পূরণের আর্জি দেন। নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)-এর ৬০০-এর বেশি খলিফা ছিলেন। যাদের বিশ্বজুড়েই সুপরিচিতি রয়েছে। তাঁর বিখ্যাত খলিফাগণের মধ্যে রয়েছেন নাসিরুদ্দিন চিরাগ দেহলভি, আমির খসরু, রোরহানুদ্দিন গরিব, আখি সিরাজ আয়নায়ে হিন্দ, জালালুদ্দিন ভান্ডারী, সৈয়দ মাহমুদ কাশকিনাকার, আজান ফকির অন্যতম। নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.) শিশুকালেই বাবাকে হারান। তিনি ও তাঁর মাতা অভাব অনটনের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করতেন। তাই মাসের বেশির ভাগ সময় তাঁদের পরিবারে অভুক্ত হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো। যে দিন তাদের ঘরে কোনো কিছু থাকত না তখন মাতা বিবি জুলায়খা সন্তান নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)-কে বলতেন, ‘আজ আমরা আল্লাহর মেহমান।’ এ কথা নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)-এর খুবই পছন্দ হতো। যখন ঘরে নিয়মিত রান্না হতো তখন নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.) মাকে জিজ্ঞাসা করতে আমরা কখন আল্লাহর মেহেমান হব। হজরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)-এর কেরামত ছোঁকাল থেকেই প্রকাশ পেতে থাকে। ছোট বেলায় নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.) খাজা কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকীর (রহ.) মাজার জেয়ারত করতে যান। মাজারে তিনি এক মজজুব ব্যক্তির সাক্ষাৎ পান। তিনি দেখেই নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)-এর কাছে দোয়া চাইলেন। যাতে তিনি কাজির পদ লাভ করেন। তখন ওই ব্যক্তি বলেন, হে নিজামুদ্দীন তুমি কি কাজি হতে ইচ্ছা কর? আমি তোমাকে দেখছি, তুমি ধর্ম বিশারদ এক বাদশা। তুমি এমন স্তরে পৌঁছে যাবে, যেখান থেকে বিশ্ববাসী তোমার কাছ থেকে ফয়েজ লাভ করে ধন্য হবে।

 

হজরত আমির খসরু (রহ.)

ভারতের সুফি সাধকের অন্যতম ছিলেন হজরত আমির খসরু (রহ.)। যার আসল নাম ছিল আবুল হাসান ইয়ামিন আল-দিন মাহমুদ। ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগীতজ্ঞ ছিলেন তিনি। একাধারে ছিলেন কবি, দার্শনিক এবং গায়ক। এ সুফি সাধককে ‘তুত-ই হিন্দ’ বা ভারতের তোতাপাখি হিসেবে ডাকা হয়। তাঁর হাত ধরেই ভারতীয় উপমহাদেশে গজল সংগীত ও কাব্যের প্রচার ও প্রসার হয়।

সংগীত সম্রাট আমির খসরু (রহ.) ছিলেন বিখ্যাত অলি ও দরবেশ হজরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)-এর অন্যতম শিষ্য। মৃত্যুর আগে নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.) ভক্তদের প্রতি নির্দেশ নিয়ে যান আমির খসরুকে যেন তাঁর পাশের কবর দেওয়া হয়। ১৩২৫ খ্রিস্টাব্দে হজরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.) যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন মাজারের পাশে গিয়ে বিলাপ করতে থাকেন আমির খসরু (রহ.)। এভাবে টানা ছয় মাস কান্না করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। পরে নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)-এর পাশের কবরে শায়িত করা হয় প্রিয় শিষ্য আমির খসরু (রহ.)-কে। মাত্র আট বছর বয়সে মায়ের সঙ্গে নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)-এর দরবারে যান বালক আমির খসরু। কিন্তু তিনি দরবারের ভিতর প্রবেশ না করে বাইরে অপেক্ষা করতে থাকেন। তখন বালক আমির খসরু গুনগুন করে একটি কবিতা আবৃত্তি করছিলেন। আধ্যাত্মিক শক্তির মাধ্যমে কবিতা শুনতে পেয়ে নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.) পাল্টা কবিতা পাঠ আবৃত্তি বালক আমির খসরুকে অভিবাদন জানাতে দরজায় এগিয়ে আসেন। তখন বালক আমির খসরু বুঝতে পারেন তিনি সঠিক জায়গায় এসেছেন। এরপর আমির খসরু নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)-এর প্রিয় শিষ্যে পরিণত হন। নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)-এর দরবারে কাউয়ালি গজল গাইতেন আমির খসরু। ভারতের অন্যতম এ সুফি সাধক অসংখ্য কিতাব রচনা করেন। তাঁর লেখা কিতাবের মধ্যে রয়েছে- খাজিনাউল ফুতুহ, ওয়াসতুল হায়াত, ঘুররাতুল কামাল, খামসা-ই-খসরু, সাকিনা, দুভাল রানি, বাকিয়া নাকিয়া, নুহ সিপার, ইজাজ-ই-খসরু, আফজাল উল-ফাওয়াইদ, তুঘলক নামা, নিহায়াত উল-কালাম অন্যতম। হজরত আমির খসরু (রহ.) ভারতীয়, আরবি এবং ইরানি সংগীতকে সমন্বয় করে নতুন সংগীত ধারা সৃষ্টি করেন। যা সংগীতজগতে উত্তর ভারতীয় উচ্চাঙ্গসংগীত হিসেবে খ্যাতি পায়। আর কাউয়াল হচ্ছে আমির খসরু (রহ.) উদ্ভাবিত সংগীত ধারা। তাই তাকে কাউয়ালির জনক বলা হয়। ‘তারানা’ সংগীত ধারা আমির খসরু (রহ.)-এর নিজস্ব আবিষ্কার। এটি হলো এক প্রকার শ্রুতিমধুর এবং দ্রুতগতির উচ্চাঙ্গসংগীত। তিনি অসংখ্য নতুন রাগ, তাল ও সংগীত যন্ত্র আবিষ্কার করেন।

 

হজরত খাজা বু-আলি শাহ কালান্দার (রহ.)

ভারতীয় উপমহাদেশে যে কয়জন সুফি সাধক ইসলাম প্রচার করেছেন তাদের একজন হচ্ছে হজরত খাজা বু-আলি শাহ কালান্দার (রহ.)। তিনি ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর বংশধর ছিলেন। তাঁর আসল নাম ছিল আলাউদ্দিন। রূপক নাম আবু আলি। তবে তিনি সবার কাছে বু-আলি কালান্দার (রহ.) নামে পরিচিত ও প্রসিদ্ধ ছিলেন। জন্মের পর থেকে খাজা বু-আলি শাহ কালান্দার (রহ.)-এর মধ্যে স্রষ্টার প্রতি প্রেম ও সুফি চেতনা প্রকাশ হতে থাকে। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের জন্য তাঁকে পানিপথ শহরে পাঠান পরিবার। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ শেষে তিনি চলে যান দিল্লি। ওখানে তৎকালীন সময়ের শ্রেষ্ঠ অলি শাহ কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকির খলিফা হজরত শাহ শায়েখ শাহাবউদ্দিন, ইমাম ফখরউদ্দিন রাজি শাগরেদ মাওলানা নিজামুদ্দীন মুশকি, মাওলানা রোকনউদ্দীন সামনির কাছে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি সারা জীবন নিয়োজিত ছিলেন ইসলামের প্রচার এবং প্রসারে। আজীবন প্রচার করেছেন ইসলামের মর্মবাণী। তিনি হজরত আলি (রা.)-এর কাছ থেকে ইলমে লাদুনির মাধ্যমে জ্ঞানার্জন করতেন বলেই বু-আলি (রহ.) নামে পরিচিত ছিল। বু-আলি নামের অর্থ হচ্ছে আলীর সুগন্ধ। তার অনুসারীরা চিশতিয়া কালান্দরিয়া (রহ.) নামে পরিচিত। তিনি লিখেছেন অসংখ্য কিতাব। তাঁর লিখা কিতাবসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে রিসালায়ে ইসরারে আশেকিন, রিসালায়ে সির ইশক, রিসালায়ে সুলুক, রিসালায়ে ইশকিয়াহ, রিসালায়ে হুকুমানহ, রিসালায়ে হাক্কাকে কলমায় তাইয়্যেবা, দিওয়ানে খাজা বু-আলি শাহ কালান্দার, গুলে বুলবুল, আরেফে শাহে কামাল অন্যতম। হজরত খাজা বু-আলি শাহ কালান্দর (রহ.) ১৩২৪ সালে করনালে ইন্তেকাল করেন। এরপর তাঁকে ওখানে দাফন করা হয়। কিন্তু ভক্ত ও শিষ্যরা মাজার পানিপথে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেয়। উদ্যোগের অংশ হিসেবে কবর খুঁড়লে তাঁর লাশ অক্ষত ও জীবন্ত মানুষের মতো দেখতে পান। তখন তাঁর কাফনের কাপড়ে কোনো প্রকার মাটির চিহ্ন ছিল না। যা দেখে আশ্চর্য হন ভক্তরা। এরপর তাঁর লাশ উত্তোলন করে হরিয়ানার পানিপথে নিয়ে আসা হয়। মহান এ সাধককে নিয়ে অনেক উপাখ্যান প্রচলিত রয়েছে। যার মধ্যে একটি হচ্ছে- তিনি ৩৬ বছর কার্নাল নদীর পানিতে দাঁড়িয়ে সাধনা করেন। এক সময় হজরত মুহাম্মদ (সা.) এসে তাঁকে বু-আলি উপাধি দান করেন। এ উপাধি পাওয়ার পর অনেক সুফি সাধক তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন।

 

হজরত আহমদ রেজা খান বেরলভি (রহ.)

ভারতীয় উপমহাদেশে জনপ্রিয় সুফিদের মধ্যে একজন হজরত আহমদ রেজা খান বেরলভি (রহ.)। যিনি আ’লা হজরত নামেই অধিক পরিচিত। অনুসারীরা তাঁকে চতুর্দশ হিজরির মুজাদ্দিদ মনে করেন। তিনি আইন, ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর লিখেছেন। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে সহস্রাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। আ’লা হজরতের জন্ম ১৮৫৬ সালে ভারতের বেরেলিতে। জন্মের সময় তাঁর নাম রাখা হয় মুহাম্মদ। মাত্র ১৪ বছরের মধ্যে তিনি কোরআন, হাদিস, তাফসির, আরবিসহ যাবতীয় শিক্ষায় পা-িত্য অর্জন করেন। আল্লামা ইকবাল তাঁকে দ্বিতীয় ইমাম আবু হানিফা হিসেবে উপাধি দেন। ৬৮ বছরের জীবনে আলা হজরত (রহ.) ৫৫ শাখায় দেড় হাজারের ওপরে গ্রন্থ রচনা করেন। গবেষক ড. মাসউদ আহমদের মতে, আলা হজরত শুধু হাদিসের ব্যাখ্যার ওপর গ্রন্থ রচনা করেছেন ৪৬টি। তাঁর করা কোরআনের অনুবাদ ‘কানজুল ইমান’ সর্বাধিক পঠিত কোরআনের অনুবাদ হিসেবে মনে করা হয়। কানজুল ইমান গ্রন্থটি বাংলা, উর্দু, ইংরেজি, হিন্দি, ডাচ, তুর্কি, গুজরাটি, পশতুসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাঁর লেখা ‘ফতোয়া-ই রেজভিয়া’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে মনে করা হয়। ৩০ খন্ডের গ্রন্থটি বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। এ ছাড়া তার লেখা সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে হাদায়েকে বখশিশ, হুসাসামুল হারামাঈন, আল মো’তামাদ ওয়াল মোশতানা, আল কাউকাবাতুল সাহাবিয়া, আল ইশতিমাদ, আল ফুয়জুল মাক্কিয়া। তাঁর লেখা অসংখ্য বই বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে। তাঁর বাংলা অনুবাদ করা জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে। বাংলায় অনূদিত বইগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে তাফসিরে খাজাইনুল ইরফান ও তরজুমায়ে কানজুল ইমান, তাফসিরে নুরুল ইরফান, ইরফারে শরিয়ত, খতমে নবুওয়াত, আহকামে শরিয়ত, নিদানকালে আশীর্বাদ অন্যতম।


আপনার মন্তব্য