১. নির্বাচন ও নীরবতা
এই দেশে নির্বাচন নিয়ে কথা হলেই শব্দ বাড়ে, কিন্তু অর্থ কমে যায়। দলগুলো বলছে, সরকার বলছে, বিশ্লেষকরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ চিৎকার করছে। অথচ এই বিপুল শব্দের ভিড়ে সবচেয়ে যেটা চোখে পড়ে, সেটা হলো নীরবতা, জনগণের নীরবতা। এবার নির্বাচন শুধু ‘আসছে’ নয়, তারিখও ঠিক। নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছে, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে, একই দিনে জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে গণভোটও হবে। ভোটের সময়ও নির্দিষ্ট, সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত। মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ, যাচাইবাছাই, প্রত্যাহার-সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সূচিও দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু কাগজকলমে সূচি থাকলেই কি মানুষের ভিতরে উৎসব আসে? আসে না। কারণ মানুষ এখন নির্বাচনকে আর এক দিনের ঘটনা হিসেবে দেখে না। মানুষ দেখে নির্বাচনের আগে কী হয়, নির্বাচন চলাকালীন কী হয়, আর নির্বাচনের পরে কী হয়। এই তিনটি সময়েই যদি নিরাপত্তাহীনতা থাকে, যদি সহিংসতার শঙ্কা থাকে, যদি ন্যায়বিচারের অনিশ্চয়তা থাকে, তাহলে ব্যালট বাক্সের কাছে যাওয়া মানুষের কাছে ‘উৎসব’ নয়, ‘ঝুঁকি’ হয়ে দাঁড়ায়।
এই নীরবতা উদাসীনতা নয়। এটা অভিজ্ঞতার নীরবতা। বহু বছর ধরে মানুষ দেখেছে, ভোটের ভাষা বদলালেও জীবনের ভাষা সব সময় বদলায় না। বাজারে গেলে চাল-ডালের দামে স্বস্তি আসে না, হাসপাতালে গেলে সেবা নিশ্চিত হয় না, থানায় গেলে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়-এমন নিশ্চয়তা তৈরি হয় না। ফলে নির্বাচন ধীরে ধীরে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাইরে সরে গেছে। মানুষ এখন চুপ করে দূরে দাঁড়িয়ে দেখে, যেন রাষ্ট্রের একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন চলছে, তার নিজের জীবন সেখানে গৌণ। কিন্তু নীরবতা সব সময় দুর্বলতা নয়। অনেক সময় নীরবতা হলো প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়ার আগের বিরতি। এই নীরবতার ভিতরে লুকিয়ে আছে একটি কঠিন দাবি, এই নির্বাচন আমার জীবনে কী বদলাবে?
২. প্রত্যাবর্তন, রাজনীতি ও জনমনের নতুন মানদণ্ড
এই নীরবতার ভিতরেই বড় রাজনৈতিক ঘটনা ঘটেছে, তারেক রহমান ফিরে এসেছেন। দীর্ঘ নির্বাসনের পরে, ১৭ বছর পর তাঁর দেশে ফেরার ঘটনাকে অনেকেই ‘রাজনীতির বাঁক’ হিসেবে দেখছেন। আন্তর্জাতিক
সংবাদমাধ্যমেও এটি বড় খবর, কারণ এই ফেরাটা হচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে এবং তাঁর দলকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার সমীকরণ বদলানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।
সমর্থকদের কাছে এটা আবেগের গল্প, প্রত্যাবর্তনের গল্প। বিরোধীদের কাছে এটা সন্দেহ আর স্মৃতির গল্প। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এটা আরেকটি অধ্যায়, যার বিচার হবে কথায় নয়, কাজে। কারণ মানুষের মানদণ্ড বদলে গেছে। মানুষ এখন বড় ভাষণ চায় না, প্রতিশ্রুতির তালিকা চায় না। মানুষ চায় দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা, বাজারের স্থিতি, জীবিকার সম্ভাবনা এবং সবচেয়ে বেশি-রাষ্ট্রের কাছ থেকে সম্মান।
তারেক রহমানের সামনে সুযোগ আছে, নীরব জনগোষ্ঠীর ভাষা শোনার। তিনি যদি রাজনীতিকে আবার জীবনের প্রশ্নে ফিরিয়ে আনতে পারেন, যদি সহিংসতা ও প্রতিহিংসার সংস্কৃতি থেকে দূরে থাকতে পারেন, যদি দলের ভিতর ও বাইরে সহনশীলতার বার্তা কার্যকরভাবে দিতে পারেন, তাহলে এই প্রত্যাবর্তন কেবল দলের জন্য নয়, দেশেও একটি মানসিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারে। কিন্তু ঝুঁকিও আছে। বাংলাদেশে রাজনীতি বারবার প্রমাণ করেছে, ক্ষমতার কাছে গেলে অনেকেই সংযম হারায়। সমর্থকরা যখন ‘জয়’ উদযাপন করতে গিয়ে অন্যের অধিকারকে তুচ্ছ করে, যখন প্রশাসনকে দলীয় রঙে দেখার প্রবণতা বাড়ে, যখন ভিন্নমতকে শত্রু বানিয়ে ফেলা হয়, তখন মানুষ আরও দ্রুত নীরব হয়ে যায়। আর এই নীরবতা বিপজ্জনক; কারণ তখন জনগণ ভোট দিতেও দ্বিধা করে, কথা বলতেও দ্বিধা করে, স্বপ্ন দেখতেও দ্বিধা করে। আজকের রাজনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাই একটাই, মানুষকে দর্শক থেকে নাগরিক হিসেবে ফিরিয়ে আনা। মানুষকে বিশ্বাস করানো, রাজনীতি মানে শুধু ক্ষমতার খেলা নয়; রাজনীতি মানে জীবনের নিশ্চয়তা।
৩. স্মৃতি, ভয় ও নাগরিক পরিসর
রাষ্ট্র সাধারণত ভবিষ্যতের কথা বলে, পরিকল্পনা, রোডম্যাপ, উন্নয়ন। কিন্তু রাষ্ট্র যতটা ভবিষ্যতের কথা বলতে ভালোবাসে, ততটা স্মৃতির দায় নিতে চায় না। অথচ স্মৃতি ছাড়া কোনো সমাজ টিকে থাকতে পারে না। স্মৃতি প্রশ্ন তোলে, অস্বস্তি তৈরি করে, দায় তৈরি করে। গত সপ্তাহগুলোতে যা ঘটেছে, সেগুলো শুধু কয়েকটি বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়, এগুলো নাগরিক পরিসরের ওপর আঘাত। ১৮ ডিসেম্বর রাতে প্রথম আলো কার্যালয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট, একই রাতে ডেইলি স্টার কার্যালয়েও হামলা-এই ঘটনাগুলো দেশের গণমাধ্যম-ইতিহাসে দাগ হয়ে থাকবে। বহু বিভাগ পুড়ে যাওয়ার, গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র হারানোর বিবরণ এসেছে।
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নূরুল কবীরকে (সম্পাদক, নিউ এজ; সভাপতি, এডিটরস কাউন্সিল) আক্রান্ত/হেনস্তার খবরও এসেছে-যখন তিনি হামলার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান। এখানে মূল প্রশ্ন ‘কে করল’ শুধু নয়। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কীভাবে এই স্মৃতিকে বহন করবে? রাষ্ট্র কি এটাকে ‘আরও একটা অঘটন’ হিসেবে ফাইলে তুলে রাখবে, নাকি দৃশ্যমান জবাবদিহি নিশ্চিত করবে? কারণ গণমাধ্যমে হামলা মানে শুধু কয়েকটি অফিস পুড়ে যাওয়া নয়; গণমাধ্যমে হামলা মানে জনগণের জানার অধিকারকে ভয় দেখানো। সাংস্কৃতিক পরিসরে হামলা মানে সমাজের আত্মবিশ্বাসকে খাটো করা।
এখানেই তরুণ সমাজের একটা বাস্তবতা সামনে আসে। আমাদের বড় এক প্রজন্ম রাজনীতির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেছে। তারা রাজনীতি দেখে মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে-সহিংসতার ভিডিও, কাদা ছোড়াছুড়ি, উসকানিমূলক বক্তব্য। রাজনীতি তাদের কাছে স্বপ্নের জায়গা নয়, ঝুঁকির জায়গা। তারা তাই চুপ থাকতে শেখে। প্রশ্ন না করতে শেখে। ‘নিরাপদ’ থাকার নামে নীরবতার অভ্যাস গড়ে তোলে। কিন্তু একটি গণতন্ত্র চুপচাপ নাগরিক দিয়ে টেকে না। গণতন্ত্র টিকে থাকে প্রশ্ন করা নাগরিক দিয়ে। আর প্রশ্ন করার জন্য দরকার নিরাপত্তা-মতপ্রকাশের নিরাপত্তা, পেশাগত নিরাপত্তা, সামাজিক নিরাপত্তা। এই নিরাপত্তা না থাকলে নির্বাচন কেবল একটি তারিখ হয়ে থাকে; একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি তৈরি হয় না।
৪. বৈশ্বিক অস্থিরতা ও আমাদের ঘরের ভিতরের প্রস্তুতি
পৃথিবী এই মুহূর্তে অস্থির। যুদ্ধ আছে, অর্থনীতির চাপ আছে, শক্তির প্রতিযোগিতা আছে। এই অস্থিরতা বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য কেবল দূরের খবর নয়, এর প্রভাব পড়ে বাজারে, রপ্তানিতে, কর্মসংস্থানে, অভিবাসী শ্রমিকের আয়েও। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামনে আরেকটি বড় বাস্তবতা-বিশ্বের কাছে আমরা শুধু উন্নয়নের গল্প শোনাই না, আমরা একটি বিশ্বাসযোগ্য রাষ্ট্রব্যবস্থারও প্রমাণ দিই। বিনিয়োগ, রপ্তানি বৈচিত্র্য, এলডিসি-উত্তরণ-এই সবকিছুর কেন্দ্রে আছে আস্থা। আর আস্থা শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে আসে না; আস্থা আসে রাষ্ট্রের আচরণ দিয়ে-আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সহনশীলতা, নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা।এখানেই রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার সবচেয়ে বড় ফাটলটা দেখা যায়, বিশ্বাসের সংকট। মানুষ দেখে আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ সবার জন্য সমান কি না, সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। অপরাধ হয়, কিন্তু দায়ী ব্যক্তির পরিচয় বা ছায়া থাকলে বিচার কতটা নিশ্চিত, এ নিয়েও অনিশ্চয়তা থাকে। ফলে রাষ্ট্র নাগরিকের চোখে ধীরে ধীরে দূরের একটি কাঠামোতে পরিণত হয়।
এই বিশ্বাসের সংকট দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলে। মানুষ ছোট অন্যায়েও আইনের আশ্রয় নিতে ভয় পায়। নির্বাচন এলে রাষ্ট্র ভোট চায়, কিন্তু নাগরিক মনে মনে প্রশ্ন করে-ভোটের বাইরে কি এই রাষ্ট্র আমার পাশে থাকবে?
নিরাপত্তা মানে শুধু বাহিনীর উপস্থিতি নয়। নিরাপত্তা মানে ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা, মতপ্রকাশের সাহস, ভিন্নমতকে সহ্য করার সংস্কৃতি। এই নিরাপত্তা ছাড়া উন্নয়ন, নির্বাচন বা সংস্কারের সব আলোচনা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। এর জন্য দরকার এক দিনের ঘোষণা নয়, দীর্ঘ ধারাবাহিকতা। দরকার দৃশ্যমান জবাবদিহি, নিয়মের সমতা এবং নাগরিক পরিসরের সম্মান। মানুষ কথা কম বিশ্বাস করে, কাজ বেশি দেখে।
এই বাস্তবতায় একটি বিষয় আলাদা করে মনে রাখা দরকার, নির্বাচন শুধু ক্ষমতা বদলের প্রক্রিয়া নয়, এটি রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণের মুহূর্তও। একটি নির্বাচন বলে দেয় রাষ্ট্র ভিন্নমতকে কীভাবে দেখে, নাগরিককে কতটা বিশ্বাস করে এবং ক্ষমতার ব্যবহার কতটা সংযত হতে পারে। এই পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে শুধু একটি সরকার নয়, পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ মানুষ তখন শেখে, রাষ্ট্র তার কথা শোনে না, শুধু তার ভোট চায়। এই শিক্ষাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কেননা রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক তখন অংশগ্রহণের নয়, কেবল আনুষ্ঠানিকতার হয়ে যায়। আর আনুষ্ঠানিক গণতন্ত্র দীর্ঘদিন টেকে না।
শেষ কথা
চতুর্মাত্রা মানে চারটি আলাদা বিষয় নয়। এটা চারটি দরজা, যেগুলো শেষ পর্যন্ত একই ঘরে খোলে। নির্বাচন, প্রত্যাবর্তন, নাগরিক পরিসরের ভয়, আর বৈশ্বিক অস্থিরতা-সবকিছুর কেন্দ্রে মানুষ। এই মানুষটাকে যদি রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনা না যায়, রাষ্ট্র যত শক্তিশালীই হোক, ভিতরে ফাঁপা থেকে যাবে। রাষ্ট্র কি মানুষকে ফিরিয়ে আনতে পারবে? শব্দ দিয়ে নয়, নিরাপত্তা দিয়ে। আশ্বাস দিয়ে নয়, জবাবদিহি দিয়ে। শাসন দেখিয়ে নয়, সহনশীলতা দিয়ে। কারণ নীরব মানুষ সবচেয়ে বড় সংকেত দেয় তখনই, যখন সে চিৎকার করে না, সে আশা করা বন্ধ করে দেয়। আর রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় হার তখনই, যখন নাগরিক চুপ করে যায়।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ