শিরোনাম
প্রকাশ : ১৯ মে, ২০২০ ২১:৫৭

গত বছর বোধকরি এই সময়টাতেই ভিক্ষা করেছিলাম

আমিনুল ইসলাম

গত বছর বোধকরি এই সময়টাতেই ভিক্ষা করেছিলাম
আমিনুল ইসলাম

এক দশকেরও বেশি আগে যখন ইউরোপে পড়তে আসি, রাস্তায় বের হলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। কি চমৎকার ভায়োলিন বাজিয়ে কেউ ভিক্ষা করছে। কেউ গীটার বাজিয়ে কিংবা বাঁশি বাজিয়ে ভিক্ষা করছে।

আমার সব সময়ই মনে হতো-আমার কি ভিক্ষা করার যোগ্যতা আছে? এইসব দেশে ভিক্ষা করতে হলেও তো কিছু পারতে হয়। এরা তো সরাসরি হাত পাতে না। কিছু একটা করে ভিক্ষা করে। সেই থেকেই আমার মনে ইচ্ছে-আমিও একদিন ভিক্ষা করবো।

নানান সব সঙ্কীর্ণতা এবং সঙ্কোচের কারণে করা হয়ে উঠেনি। শেষমেশ এক সকালে গীটার হাতে বের হয়ে পড়েছি! ঘণ্টা কয়েক গীটার বাজিয়ে ভিক্ষা করেছি। বেশ কিছু পয়সাও পেয়েছি। ভিক্ষা করতে গিয়েও বেশ কিছু জিনিস আমি শিখেছি। এর মাঝে একটা বিষয় না বললেই না! যারা ভিক্ষা দিচ্ছে, এদের মাঝে অনেকেই পয়সার থলেতে পয়সা টুকু স্রেফ ছুড়ে ফেলে দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। আবার কিছু মানুষ নিচু হয়ে খুব সুন্দর ভাবে পয়সা টুকু রেখে চলে যাচ্ছে।

অবাক হয়ে আবিষ্কার করেছি-আমাকে হয়ত ভিক্ষা দিচ্ছে, কিন্তু এভাবে ছুড়ে ফেলে দ্রুত চলে যাচ্ছে বলে আমার মোটেই ভালো লাগেনি। মনে হয়েছে-এভাবে কেন দিচ্ছে? আস্তে করে দিলেও তো পারে! অথচ এক জীবনে আমিই হয়ত এভাবে ছুড়ে ছুড়ে ভিক্ষা দিয়েছি অনেক বার। কখনো মনে হয়নি-যে মানুষটা ভিক্ষা করছে, তার হয়ত খারাপ লাগতে পারে।

এরপর থেকে কোনো দিন আমি ভিক্ষা দেবার সময় এভাবে ছুড়ে পয়সা দেইনি। খুব আস্তে পয়সা টুকু জায়গায় রেখে ভিক্ষুকের সাথে চোখের বিনিময় টুকুও করেছি। যাতে তার মাঝে ভালো লাগা বোধ কাজ করে। 

আজ সকালে আমার এখানকার এক বাংলাদেশি ছাত্র ফোন করেছে। ও অবশ্য পাশ করে বের হয়ে গিয়েছে। আমি ওর মাস্টার্স থিসিসের সুপারভাইজারও ছিলাম। মাস্টার্স পাশ করে বেশ ভালো একটা চাকরি করছিল। চমৎকার ছেলে। আদর্শ ছাত্র হিসেবে যা যা গুণ থাকা দরকার সব কিছুই ওর মাঝে বিদ্যমান। সব কিছু সহজে বুঝে ফেলে। খুব বেশি বর্ণনা করার দরকার হয় না ইত্যাদি।

বছর দুয়েক আগে ছেলেটা বেশ মানসিক অস্থিরতার মাঝে দিয়ে যাচ্ছিল। তখনও এখানে সেই অর্থে সেটেল হয়নি। একদিন আমাকে মেইল করে বলেছে-আমাকে কি ইউনিভার্সিটির বাইরে খানিক সময় দেয়া যাবে? আমি সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দিয়ে বলেছি-নিশ্চয়। তুমি সময় মতো চলে এসো। এরপর না হয় কোথাও কোনো কফি শপে বসে কথা বলা যাবে।

নানান সব মানসিক অস্থিরতার মাঝে দিয়ে যাচ্ছিল। এছাড়া প্রথম প্রথম বিদেশে আসলে যে সব বাস্তবতা গুলোর মাঝ দিয়ে সবাইকে যেতে হয়, ওকেও যেতে হচ্ছিল। আমি ছেলেটাকে কোন রকম উপদেশ না দিয়ে স্রেফ আমার নিজের জীবনের কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেছি-আমি যদি পারি, তুমিও পারবে। তুমি বরং আমার চাইতে ভালো কিছু পারবে। স্রেফ একটা নিয়মের মাঝে চেষ্টা করে যাও। দেখবে পড়াশুনা করা অবস্থাতেই ভালো কাজ জুটে যাবে। হয়ে ছিলও তাই। পড়াশুনা করার অবস্থাতেই ও ভালো একটা চাকরি পেয়ে গিয়েছিল।

আজ সকালে ফোন করে জানিয়েছে-এর চাইতেও ভালো একটা জায়গায় জয়েন করতে যাচ্ছে সে।
এই ছেলেটাকে আমি বেশ পছন্দ করি। আমি যে তাকে পছন্দ করি, সেটা অবশ্য আজ অবদি তাকে বুঝতে দেইনি। উল্টো বরং এমন একটা ভাব করেছি-যাতে ওর মনে হতে বাধ্য, আমি ওকে খুব একটা পছন্দ করি না। এর অবশ্য একটা কারণও আছে। আমার সব সময়ই মনে হয়েছে আমার ছাত্র-ছাত্রীদের বেশিরভাগই লেখাপড়া শিখে গাড়ি-বাড়ি করার স্বপ্ন দেখে।

ঠিক যেমনটা আমরা ছোট-বেলায় পড়ে এসছি-"লেখাপড়া করে যে, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে!" লেখাপড়া শিখে ভালো একটা চাকরি করতে হবে, গাড়ি-বাড়ি কিংবা এই ধরনের বৈষয়িক অর্জন করতে হবে ইত্যাদি।

আমি জানি না কেন; তবে আমি কোনে দিন কোনো মানুষকে তার পেশাগত পরিচয় দিয়ে বিবেচনা করিনি। এটি হয়ত একান্তই আমার নিজের দর্শন।

আমার কখনোই মনে হয় না-মানুষকে তার পেশাগত পরিচয় দিয়ে যাচাই করা উচিত। বিশেষ করে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বন্ধু-বান্ধব কিংবা ভালোলাগা-ভালোবাসার মানুষের ক্ষেত্রে তো নয়ই।
আমি বরাবরই খেয়াল করে দেখেছি সমাজে যারা প্রতিষ্ঠিত, যারা ভালো একটা চাকরি করে কিংবা ব্যবসা করে ভালো একটা অবস্থানে আছে; তাদের সাথে আমার কখনো মেলেনি। আমি নির্বিবাদী মানুষ। মেলেনি মানে এই না-তাদের সঙ্গে আমার ঝগড়া! মেলেনি বলতে আমি বুঝাতে চাইছি-আমার হয়ত তাদের সঙ্গে কথা বলতে, আড্ডা দিতে ভালো লাগে না। কিংবা তাদের সঙ্গে আমি যে কোন কারনেই হোক মিশতে পারি না।

এর একটা কারণ হতে পারে-সমাজে একটু প্রতিষ্ঠিত হবার পরই আমাদের মাঝে একটা রাশ ভারি ব্যাপার চলে আসে। এরপর আমরা সুন্দর একটা ড্রইং রুমে বসে মেপে মেপে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা দেই, কথা বলি। আমার কাছে এই পুরো ব্যাপারটাকেই মনে হয়-কৃত্রিম! স্বতঃস্ফূর্ততার কোন স্থান সেখানে নেই। এই জন্য'ই হয়ত প্রতিষ্ঠিত মানুষজনদের সঙ্গে আমার কখনোই মেলেনি।
যেখানে সম্পর্ক গুলোর মাঝে কোন আবেগ নেই, স্বতঃস্ফূর্ততা নেই; আছে কেবল-নিজদের জাহির করে বেড়ানোর প্রতিযোগিতা আর কৃত্রিমতার ছড়াছড়ি! এই সম্পর্ক গুলো আমাকে কখনোই টানেনি। 
আজ আমার এই ছাত্রটি বেশ চমৎকার একটা কথা বলেছে আমাকে। সে বলেছে-আজকাল আর কোন অর্জনকেই বড় কিছু মনে হয় না। নিজেকেও বড় মনে হয় না। বেঁচে থাকার জন্য একটা কিছু করতে হবে, এই তো...

শুনে আমার বেশ ভালো লেগেছে। একটা ভালো লাগার রেশ থেকেই এই লেখার অবতারণা। এমনটাই আসলে হওয়া উচিত। বেঁচে থাকার জন্য আমরা যে যার যোগ্যতা অনুযায়ী নিজদের পেশা হয়ত খুঁজে নিবো। এটি কেবলই আমাদের পেশাগত পরিচয়।

নিজেদের ব্যক্তি জীবনে আমাদের পরিচয় হচ্ছে-আমরা কারো সন্তান, কারো ভাই, কারো বোন, কারো বন্ধু-বান্ধব, স্বামী-স্ত্রী কিংবা ভালোবাসার মানুষ। সেখানে যেন পেশাগত পরিচয় এসে ভর না করে! রাস্তায় যে মানুষটি দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করছে, সেও আমাদের বন্ধু হতে পারে। তার সাথে কথা বলে যদি মনে হয় স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে কথা বলা যাচ্ছে, কথা বলতে ভালো লাগছে, নিজেরা নিজদের মাঝে কথা ভাগাভাগি করতে পারছি; তাহলে সেও আমাদের বন্ধু হতে পারে। আমাদের পেশাগত পরিচয় যেন আমাদের মানুষ পরিচয়টিকে ছাপিয়ে না যায়।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

বিডি-প্রতিদিন/বাজিত হোসেন


আপনার মন্তব্য