ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো ধরনের ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ চোখে পড়েনি বলে জানিয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস।
গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। প্রতিবেদনে এই নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এবং আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ভবিষ্যৎ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে ১৯টি সুপারিশ করেছে ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সংগতি রেখে এসব সুপারিশের মধ্যে ছয়টিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে ইভার্স ইজাবস বলেন, নির্বাচনে কোনো ধরনের ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ আমাদের চোখে পড়েনি। যদি কোনো রাজনৈতিক দলের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে অভিযোগ থাকে, তাহলে তারা আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে পারে। তিনি বলেন, ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশে এমন বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ওপর জনগণের আস্থা ফিরে আসছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনকালীন নিরাপত্তাব্যবস্থা যথেষ্ট ছিল। ফলাফল প্রাথমিক ও চূড়ান্তভাবে প্রকাশনা নিয়ে কোনো অস্বচ্ছতার অভিযোগ ছিল না। প্রার্থীরা স্বচ্ছভাবে প্রচার চালাতে পেরেছেন। যেকোনো রাজনৈতিক সংকট নিয়ে সংলাপের যথেষ্ট সুযোগ ছিল। নির্বাচনকালীন যখনই কোনো অভিযোগ এসেছে বা সংকট তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে সমাধান করা হয়েছে।
ইভার্স ইজাবস বলেন, নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত সীমিত। মোট প্রার্থীর মাত্র ৪ শতাংশেরও কম ছিলেন নারী, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পাশাপাশি নারীদের বিরুদ্ধে অনলাইন ও অফলাইন সহিংসতার বিষয়টিও দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোটকেন্দ্রে যাতায়াত এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্তত ২৩টি অপপ্রচারের ঘটনা চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রচারণার অর্থায়নের নিয়মগুলোও সেকেলে এবং অকার্যকর বলে পরিলক্ষিত হয়েছে, যার সংস্কার প্রয়োজন।
লিখিত বক্তব্যে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান বলেন, বিশ্বাসযোগ্য ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত এই নির্বাচন গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এবং আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা সব অংশীজনের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি একটি যৌথ অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে। যদিও নির্বাচন জনআস্থা বৃদ্ধি করেছে। তবে আইনগত ও প্রক্রিয়াগত ঘাটতি রয়ে গেছে, যা জুলাই জাতীয় সনদ এবং এর পরবর্তী সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংস্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দেয়।
স্বচ্ছতা-বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিতে ১৯ সুপারিশ : তবে বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচনগুলো আন্তর্জাতিক মানে করতে এবং স্বচ্ছতা-বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ১৯টি সুপারিশ করেছে ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন। এর মধ্যে ছয়টি সুপারিশে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সুপারিশগুলো হলো সংসদীয় নির্বাচন পরিচালনাকারী আইনি কাঠামো সংশোধন করা, যাতে অসংগতি ও ফাঁকফোকর দূর করা, বিভাজন হ্রাস, আইনি নিশ্চয়তা জোরদার এবং গণতান্ত্রিক নির্বাচনের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে আরও নিবিড় সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা যায়; উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ভোট গণনার সময় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডেটা এন্ট্রি স্ক্রিনে প্রদর্শন এবং দ্রুত প্রাথমিক ও চূড়ান্ত ফলাফল অনলাইনে প্রকাশের ব্যবস্থা করা; নির্বাচনি প্রচারণার অর্থায়নসংক্রান্ত বিধানগুলো পর্যালোচনা ও শক্তিশালী করা, যাতে ব্যয়ের সীমা ও প্রতিবেদন দাখিলের বাধ্যবাধকতাগুলো বাস্তবসম্মতভাবে প্রয়োগ করা যায় এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) মাধ্যমে প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি আদর্শ ফরম্যাটে নিরীক্ষিত নির্বাচনি ব্যয়ের হিসাব জমা দিতে বাধ্য করা; ২০৩০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য নিশ্চিত করা এবং জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে এক-তৃতীয়াংশ নারী প্রার্থী মনোনীত করার বিষয়টি বিবেচনা করা; তথ্যগত ও নির্বাচনি সততা রক্ষার লক্ষ্যে ডিজিটাল ক্ষেত্রকে নিরাপদ ও স্বচ্ছ করতে সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ সংশোধন করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা; এবং যেসব ভোটার নির্বাচনের দিনে সশরীরে ভোট দিতে পারেন না (যেমন প্রতিবন্ধী, বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি, অভিবাসী শ্রমিক ও শিক্ষার্থী), তাদের জন্য ডাকযোগে ভোট দেওয়ার (পোস্টাল ভোটিং) সুযোগ বাড়ানো এবং প্রয়োজনে আগাম ভোটের ব্যবস্থা করা। এ ছাড়াও অন্য সুপারিশগুলো হলো রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের জন্য পক্ষপাতহীনতা ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার মানদণ্ড অন্তর্ভুক্ত করা; রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের শর্ত পুনর্বিবেচনা করা; স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রার্থী মনোনয়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা; নির্বাচনে প্রচারে অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ পরিহার করে তদারকি সংস্থার মাধ্যমে প্রচারণা নিয়ন্ত্রণ কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা; গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের শারীরিক ও ডিজিটাল হয়রানি থেকে সুরক্ষা নিশ্চিতে আইনি ও কার্যনির্বাহী কাঠামো তৈরি করা, যার মাধ্যমে সাংবাদিকদের ওপর সহিংস কর্মকাণ্ডের দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা যায়; স্বাধীন গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
উচ্চকক্ষে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং প্রতিবন্ধীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতের ব্যবস্থা করা; মনোনয়নসংক্রান্ত আবেদনপত্র নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত ও বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণে আরপিও সংশোধন করা; নির্বাচনের ফলাফলে স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতা বজায় রাখতে ভোট গণনা প্রক্রিয়ায় পুনর্মূল্যায়ন ও শুদ্ধতা নিশ্চিতের ব্যবস্থা করা।
ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন জানিয়েছে, দুই মাস দেশব্যাপী পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে এই পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এতে সম্পূর্ণ নির্বাচনি প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে। গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৪ মার্চ পর্যন্ত পর্যবেক্ষকরা বাংলাদেশে উপস্থিত ছিলেন। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব সদস্য রাষ্ট্র, কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ড থেকে আগত মোট ২২৩ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যারা বাংলাদেশের ৬৪টি প্রশাসনিক জেলায় মোতায়েন ছিলেন।
বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের বৈঠক : ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ইলেকশন অবজারভেশন মিশনের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে বৈঠক করেছে। বৈঠকে গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সব অংশীজনের ইতিবাচক ভূমিকার প্রশংসা করেন ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা।
গতকাল রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে বৈঠক হয়। বিকাল ৪টা ২৫ মিনিট থেকে শুরু হয়ে বৈঠকটি শেষ হয় ৬টার দিকে। আর দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের কার্যালয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ইলেকশন অবজারভেশন মিশনের প্রধান ইভারস আইজবসের নেতৃত্বে এই প্রতিনিধিদলে তার সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি হেড অব ডেলিগেশন বাইবা জারিনা, ডেপুটি চিফ অবজারভার ইন্টা লেইস, লিগাল এনালিস্ট ইরিনি মারিয়া গোওনারি এবং রায়ান ইসলাম।
বিএনপির পক্ষে বৈঠকে অংশ নেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, যুগ্ম মহাসচিব ও রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন।
আর জামায়াতের সঙ্গে বৈঠকে বিরোধীদলীয় নেতার পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ও ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আহমদ বিন কাসেম আরমান ও বিরোধীদলীয় নেতার পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা টিমের সদস্য আলী আহমাদ মাবরুর উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় বাংলাদেশের সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং এ বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইলেকশন অবজারভেশন মিশনের একটি পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানকে হস্তান্তর করা হয়। সফররত ইইউ মিশন জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কেও বিরোধীদলীয় নেতার কাছে সর্বশেষ তথ্য জানতে চান।
বিরোধীদলীয় নেতা প্রতিক্রিয়ায় জানান, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে বিএনপি বিভিন্ন সংস্কারের বিষয়ে একমত হলেও পরবর্তীতে এগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে টালবাহানা করছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ব্যাপারে জনগণ আস্থা হারিয়ে ফেলতে পারে।
বিরোধীদলীয় নেতা তার আলোচনায় দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের সহিংসতা, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নৈরাজ্য এবং একাধিক স্থানে জামায়াতের সংসদ সদস্য আক্রমণের শিকার হওয়ার ঘটনা তুলে ধরে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে, সফররত ইইউ ইলেকশন অবজারভেশন মিশনের সদস্যরা বাংলাদেশের গণতন্ত্র শক্তিশালী করা, রাজনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য বেশ কিছু সুপারিশমালা সম্পর্কেও বিরোধীদলীয় নেতাকে অবহিত করেন।