শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৫ এপ্রিল, ২০১৬ ২৩:৪৬

বিপজ্জনক সিলিন্ডার বোমা

শিমুল মাহমুদ

বিপজ্জনক সিলিন্ডার বোমা

যানবাহন ও গৃহস্থালি জ্বালানির গ্যাস সিলিন্ডার ক্রমশ বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। নিম্নমানের সিলিন্ডার ও কিটস ব্যবহার, পাঁচ বছর পরপর রিটেস্ট না করাসহ বিভিন্ন কারণে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও হতাহতের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সিএনজিচালিত তিন লাখ যানবাহনের সিলিন্ডারের মধ্যে রিটেস্ট করা হয়েছে মাত্র ৫০ হাজার। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সিএনজি সিলিন্ডারে প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে ৩২শ’ পাউন্ড চাপে যখন গ্যাস ভরা হয় তখন রাস্তায় এক একটি গাড়ি চলন্ত বোমা হয়ে ওঠে। এ জন্য এর সঠিক মান রক্ষা করা জরুরি। এদিকে গৃহস্থালি কাজে ব্যবহূত বেশকিছু এলপিজি সিলিন্ডারও বিস্ফোরিত হয়েছে। নিরাপদ রান্নাঘর হয়ে উঠেছে বিস্ফোরণের বিপজ্জনক জায়গা। 

সিএনজিচালিত গাড়ির পাঁচ বছরের বেশি পুরনো সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষার আইন কেউ মানছে না। রিটেস্টের মেয়াদোত্তীর্ণ প্রায় দুই লাখ গাড়ি বিপজ্জনক সিলিন্ডার নিয়ে রাস্তায় চলছে। এ অবস্থায় গত কয়েক বছরে রাস্তার ঝুঁকি অনেক বেড়ে গেছে। গত সোয়া দুই বছরে সিএনজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ১১৩টি ঘটনায় অর্ধশত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সরকার বর্তমানে সিএনজিচালিত যানবাহন নিরুৎসাহিত করলেও বিদ্যমান সিএনজি সিলিন্ডার নিয়ে উত্কণ্ঠা কাটছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। ঘন ঘন দুর্ঘটনার কারণে সিএনজি সিলিন্ডারের নিরাপত্তায় উদ্বিগ্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লি. (আরপিজিসিএল) মানহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ সিলিন্ডার অনুসন্ধানে বিশেষ জোর দিচ্ছে। বিস্ফোরক পরিদফতরও  অননুমোদিত কনভার্সন ওয়ার্কশপ নিয়ে বরাবরই উদ্বিগ্ন। গত ১৪ এপ্রিল সাভারের আশুলিয়ায় একটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নেওয়ার সময় প্রাইভেট কারের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দুজন নিহত হয়েছেন। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নয়ারহাট ডেলটা সিএনজি ফিলিং স্টেশনে এ ঘটনা ঘটে। ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার জামিরদিয়া স্কয়ার ফ্যাক্টরির সামনে পূর্বাশা সিএজি স্টেশনে ৬ জানুয়ারি বিকালে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে একজন নিহত ও ২ জন আহত হয়েছেন। সুপ্তি সোয়েটার্সের একটি পিকআপ ভ্যান গ্যাস রিফিল করার জন্য প্রস্তুত করার সময় গাড়িতে থাকা একটি এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। আরপিজিসিএল-এর হিসাব অনুযায়ী, গত জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে ২ লাখ ৮৮ হাজার ৩৮৯টি গাড়ি সিএনজিতে চলছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৬টি গাড়ি দেশে সিএনজিতে রূপান্তরিত হয়েছে। বাকি ৪০ হাজার ৩৮৯টি গাড়ি বিল্ড ইন সিএনজি অবস্থায় আমদানি হয়ে এসেছে। দূরপাল্লার বাণিজ্যিক যানবাহন বিশেষ করে বাস-ট্রাকের কোনো কোনোটিতে দুই থেকে ছয়টি সিলিন্ডার পর্যন্ত সংযোজন করা হয়। তবে গত কয়েক বছরে সিএনজিচালিত যানবাহন রূপান্তরের পরিমাণ অনেক কমে গেছে। বর্তমানে প্রায় তিন লাখ গ্যাস সিলিন্ডারের মধ্যে মাত্র ৫০ হাজার সিলিন্ডার রিটেস্ট করা হয়েছে বলে আরপিজিসিএল সূত্র জানায়। অন্যদিকে দুই লাখ সিলিন্ডারের পরীক্ষার মেয়াদ পেরিয়ে গেছে। আরপিজিসিএল ছাড়াও সিএনজি এসোসিয়েশন ও বেসরকারি অপারেটররা পাঁচ বছর বয়সী সিলিন্ডার রিটেস্টের জন্য ব্যবহারকারীদের বার বার তাগাদা দিয়ে আসছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে খুবই কম। সূত্র জানায়, এক সময় দেশজুড়ে ১২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান, প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং নাগরিক পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে ৫ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি সাশ্রয়ের এই খাত গত কয়েক বছরে সরকারের উপেক্ষার কেন্দ্রে চলে আসে। দৈনিক ১২০ ঘনফুট গ্যাস ব্যবহারের এই ক্ষেত্রটিকে সরকার সিএনজির দাম বাড়িয়ে নিরুৎসাহিত করতে থাকে। ফলে সিএনজি কনভার্সন নেমে আসে প্রায় শূন্যের কোঠায়। দেশজুড়ে ৫৬১টি সিএনজি স্টেশনের মধ্যে বেশকিছু স্টেশন বন্ধ হয়ে যায়। সিএনজি কনভার্সন ও গ্যাসের এক সময়ের রমরমা ব্যবসা কমে আসে। এই খাতের বড় উদ্যোক্তারা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়। তবে সবকিছু কমলেও বিদ্যমান সিএনজি সিলিন্ডারগুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। সিএনজি খাতের নিরাপত্তার জন্য সরকার ইতিপূর্বে একটি বিধিমালা জারি করে। সিএনজি বিধিমালায় নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতি পাঁচ বছর পর পর সিলিন্ডার রিটেস্টিং করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। এরপর আরপিজিসিএল, নাভানা, সাউদার্ন, ইন্ট্রাকোসহ ১১টি প্রতিষ্ঠান দেশে সিলিন্ডার টেস্টিং ইউনিট স্থাপন করে। কিন্তু গাড়ি মালিকরা সিলিন্ডার টেস্টিংয়ের ব্যাপারে তেমন কোন সাড়া দিচ্ছেন না। এদিকে সিএনজিচালিত যানবাহনের সিলিন্ডার দুর্ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। আরপিজিসিএল-এর হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর এ পর্যন্ত পাঁচটি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৪-১৫ সালে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়েছে ৫৮টি। এর আগের বছর বিস্ফোরণ হয়েছে ৫০টি সিলিন্ডার। সোয়া দুই বছরে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে অর্ধ শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন আরও অসংখ্য। সবচেয়ে উদ্বেগ-আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে, গত কয়েক বছরে বিপুলসংখ্যক ডিজেলচালিত বাস-ট্রাক সিএনজিতে কনভার্ট করা হয়েছে। এসব বাস-ট্রাকে দুই থেকে ছয়টি পর্যন্ত সিলিন্ডার সংযোজিত হয়েছে। সিলিন্ডার সংখ্যার কারণে এসব গাড়ির নিরাপত্তা ঝুঁকিও বেশি। অথচ রিটেস্টের ব্যাপারে দূরপাল্লার এসব গাড়ি মালিকদেরও আগ্রহ নেই। পাঁচ বছরের বেশি মেয়াদের সিলিন্ডারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে আরপিজিসিএল। জনবল সংকটের কারণে সিলিন্ডারের মান নিয়ন্ত্রণ, সিএনজি যন্ত্রপাতির ফিটনেস ইত্যাদি বিষয়ে তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। এ ব্যাপারে কারা দায়িত্ব পালন করবেন সে বিষয়টিও এখনো নির্ধারিত হয়নি। এটা সড়ক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা। সূত্র জানায়, সিএনজি সিলিন্ডারে প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে ৩২শ’ পাউন্ড চাপে যখন গ্যাস ভরা হয় তখন রাস্তায় চলাচলকারী এক একটি গাড়ি যেন চলন্ত বোমা হয়ে ওঠে। গ্যাস ভরার সময় সিলিন্ডার ও গ্যাস উত্তপ্ত অবস্থায় থাকে। সিলিন্ডার যথাযথ না হলে বড় রকমের অঘটন ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে। ইতিপূর্বে গ্যাস ভরার সময় সিএনজি স্টেশন এমন একাধিক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর বলেন, বিআরটিএ’তে একটি সিএনজি সেল স্থাপনের মধ্য দিয়ে ফিটনেস ও নবায়নের সুযোগ সৃষ্টির প্রস্তাব দীর্ঘদিনেও বাস্তবায়ন হয়নি। গাড়ির ফিটনেসের সময় সিলিন্ডার রিটেস্টের সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করা হলে সিলিন্ডার পরীক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হতো।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর