Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা
আপলোড : ৮ নভেম্বর, ২০১৬ ২৩:১৭

মহামারী রূপ নিচ্ছে হৃদরোগ

♦ হঠাৎ মারা যাচ্ছেন রোগীরা ♦ আক্রান্ত হচ্ছেন সব বয়সীরাই ♦ চিকিৎসারও নেই সুব্যবস্থা

বিশেষ প্রতিনিধি

মহামারী রূপ নিচ্ছে হৃদরোগ

দেশে হূদরোগ বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। বিভিন্ন বয়সের মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে হূদরোগে। শ্রমবিমুখ জীবনযাপন, ভেজাল খাবার ও দূষণ কবলিত ভুল জীবনাচারের কারণে হূদরোগে ভোগে মারা যাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। সরকারি পর্যায়ে হূদরোগ চিকিৎসার সুযোগ না বাড়ায় হূদরোগে আক্রান্তরা সীমাহীন দুর্গতি ভোগ করে মারা যাচ্ছে।   

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে প্রায় দুই কোটি হূদরোগীর জন্য ৪১৪ শয্যার একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে। এ ছাড়া সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে হূদরোগ বিভাগ থাকলেও চিকিৎসক, জনবল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে সেখানে হূদরোগ চিকিৎসার কোনো সুযোগ নেই। এজন্য রাজধানীর বাইরের হূদরোগে আক্রান্তরা ন্যূনতম চিকিৎসাসেবাও পাচ্ছেন না। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোতে উচ্চ চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে সাধারণ মানুষ সেগুলোর সেবা নিতে পারেন না। ঢাকার বাইরের গরিব রোগীরা চিকিৎসা সেবার বাইরে থেকে মারা যাচ্ছেন। রাজধানীর জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউটে রোগী ধারণক্ষমতা ৪১৪ জন। সেখানে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে সাতশ’ রোগী ভর্তি থাকে। বাড়তি চাপের কারণে রোগীদের থাকতে হয় হাসপাতালের বারান্দা ও ওয়ার্ডের মেঝেতে।

সরকারের স্বাস্থ্য অধিদফতরের স্বাস্থ্য বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় হূদরোগে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, রাজধানীর মহাখালীর আন্তর্জাতিক উদারাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআরবি) ও জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউটের এক যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের ২০ শতাংশ বয়স্ক মানুষ বিভিন্ন ধরনের হূদরোগে আক্রান্ত। ১৯৮৬ সালে প্রতি লাখে ১৬ জন মানুষ হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেও ২০০৬ সালে তা বেড়ে ৪৮৩-তে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে নারীদের মৃত্যু হার সাতজন থেকে বেড়ে ৩৩০-এ দাঁড়িয়েছে। এ নিয়ে বর্তমানে কোনো গবেষণা না থাকলেও চিকিৎকদের মতে, সাম্প্রতিক কয়েক বছরে হূদরোগে মৃত্যুর হার অনেক বেড়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে হূদরোগ চিকিৎসার অন্যতম প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপ, ১০ শতাংশ করোনারি হূদরোগ, ১ দশমিক ২ শতাংশ বাতজ্বরজনিত হূদরোগে ভুগছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বে এখন হূদরোগে অনেক বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। প্রতিবছর ১৭ দশমিক ২ মিলিয়ন মানুষ হূদরোগে মারা যাচ্ছে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হূদরোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। চলতি নভেম্বরে প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে যেভাবে দূষণের মাত্রা বাড়ছে তাতে শিশু থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ সবা?ই শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছেন। এতে বাড়ছে হার্টের অসুখ। এদিকে দেশব্যাপী হূদরোগী বাড়লেও চিকিৎসাসেবার সুযোগ বাড়ছে না। দেশের সরকারি হাসপাতালে মারা যাওয়া রোগীদের মধ্যে গত চার বছরে সবচেয়ে বেশি মারা গেছে হূদরোগে আক্রান্তরা। এর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা দায়ী করছেন খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রসার, বায়ু ও ধুলা দূষণ, মানসিক চাপ ও সড়ক দুর্ঘটনাকে। জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০০৯ সালে এই হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ লাখ ৬০ হাজার ৮ জন, সেখানে ২০১৫ সালে বহির্বিভাগ থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন ২ লাখ ৫৩৩ জন। একই সময়ে এখানে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে অনেক। স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালিত জরিপ মতে, ৬-৭ বছর আগেও দেশে রোগীর মৃত্যুর তৃতীয় ও চতুর্থ কারণ ছিল হূদরোগ। অথচ কয়েক বছর ধরে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা। সরকারি হাসপাতালে মৃত্যুর প্রথম ১০টি রোগের মধ্যে টানা চার বছর ধরে শীর্ষে রয়েছে হূদরোগ। নারী-পুরুষের পাশাপাশি দেশে বিভিন্ন ধরনের হূদরোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যাও প্রতিদিন বাড়ছে। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, প্রতি হাজারে একজন নবজাতক জন্মগত হূদরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। দেশে শিশুদের জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থাও অপ্রতুল। হূদরোগে আক্রান্ত শিশু রোগীদের অস্ত্রোপচার বেশ জটিল হওয়ায় সরকারি সব হাসপাতালগুলোতে এই অস্ত্রোপচার সম্ভব হচ্ছে না। হূদরোগ বৃদ্ধির বড় কারণ হিসেবে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান, স্থূলতা, খাদ্যাভ্যাসসহ জীবনযাত্রা বিষয়ক ঝুঁকি ও শারীরিক পরিশ্রম না করা ইত্যাদি কারণকেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। রোগীর তুলনায় পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকায় বাড়ছে রোগটিতে আক্রান্ত মৃতের সংখ্যা। কোয়ান্টাম হার্ট ক্লাবের পরিচালক ডা. মনিরুজ্জামান বলেন, ভেজাল খাবার, শ্রমবিমুখ জীবনযাপন ও দূষণের মধ্যে বসবাসের কারণে দেশে হূদরোগের প্রকোপ বাড়ছে। তিনি বলেন, শ্রমনির্ভর জীবনযাপন, ভেজালমুক্ত খাবার ও মেডিটেশন চর্চার মধ্য দিয়ে হূদরোগের ভয়াবহতা থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা এবং জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা. আবদুল মালিক বলেন, দেশে হূদরোগীর সংখ্যা যে হারে বাড়ছে, চিকিৎসা ব্যবস্থা সে তুলনায় সীমিত। অসংক্রামক ব্যাধির মধ্যে হূদরোগে সর্বাধিক মৃত্যু হয়। তিনি বলেন, প্রতিদিন শারীরিক ব্যায়াম হূদরোগের ঝুঁকি কমাতে পারে এবং রক্ত চলাচলে সহায়তা করতে পারে। মানুষ হূদরোগে ভোগে তাদের অনিয়মিত জীবনযাপনের জন্য। হূদরোগ এড়াতে হলে ফাস্টফুড খাবার পরিহার এবং কায়িক পরিশ্রম বাড়াতে হবে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর