শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৯ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৮ মার্চ, ২০১৯ ২৩:১৫

নারী প্রতিদ্বন্দ্বী নয় পরিপূরক

নারী দিবসে বাংলাদেশ প্রতিদিনের গোলটেবিলে বক্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক

নারী প্রতিদ্বন্দ্বী নয় পরিপূরক
Google News

নারীর অগ্রযাত্রাকে বেগবান করতে মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, নিরাপত্তার অধিকার এবং সামাজিক সচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে। নারীকে পুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং পরিপূরক হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। নারীর এগিয়ে যাওয়ার লড়াই হবে পুরুষ নয় পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে। গতকাল আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ প্রতিদিন আয়োজিত ‘নারী অধিকার ও বাংলাদেশে বাস্তবতা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ইডব্লিউএমজি কনফারেন্স হলে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠক সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক এবং নিউজ টোয়েন্টিফোর টিভির হেড অব কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স সামিয়া রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক পীর হাবিবুর রহমান। গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দেন, সাবেক নারী ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবং সংসদীয় কমিটির সভাপতি মেহের আফরোজ চুমকি এমপি, মুন্সীগঞ্জ-২ আসনের এমপি সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি, কালের কণ্ঠ সম্পাদক বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন, নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আলী শিকদার, মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবানা হক, মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সালমা আলী, বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা, বিআইডিএস’র সিনিয়র গবেষক ড. নাজনীন আহমেদ, বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, সাবেক এমপি নিলুফার চৌধুরী মনি ও নূরজাহান বেগম মুক্তা, অভিনেত্রী বন্যা মির্জা, সংগীত শিল্পী অনিমা রায় এবং ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি লাকী আক্তার।

স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক পীর হাবিবুর রহমান বলেন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে ভেঙে দিয়ে সংবিধান ও আইনের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থাকে শিক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের চরম বিকাশ না ঘটালে নারীর অধিকার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ধর্মান্ধতা, অশিক্ষা, কুসংস্কার ও কলুষিত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে। তিনি আরও বলেন, নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন যোগ্যতায় মেধায় লড়াইয়ের তীব্র গতি নিয়ে। সংসদীয় গণতন্ত্র যেমন সাইকেলের দুই চাকার মতো সরকার ও বিরোধী দল নির্ভর তেমনি সমাজ, সংসার, দেশ, রাষ্ট্র ও আলোকিত পৃথিবীর জন্য সভ্যতার ও মানবিকতার চূড়ান্ত বিকাশে নারী-পুরুষকে সাইকেলের দুই চাকার মতোই একযোগে লড়াই করতে হবে। মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, প্রত্যেকটি পেশাতেই নারীকে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে হয়। রাজনীতিতে তো জীবন নিয়েই ঝুঁকি থাকে। তারপরও রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। এখনো সিদ্ধান্তের জায়গায় পৌঁছাতে পারা নারীর সংখ্যা কম। সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি বলেন, নারীকে ঘরে বাইরে সমানভাবে লড়তে হয়। পুরুষের চেয়ে নারীকে কয়েকগুণ বেশি প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হয়। দেশে নারী সহিংসতা প্রতিরোধে অনেক ভালো আইন আছে। কিন্তু অনেক সময় দেশে প্রচলিত রীতিনীতি প্রাতিষ্ঠানিক আইনকে বাধাগ্রস্ত করে। ইমদাদুল হক মিলন বলেন, পুরুষের মানসিকতা পাল্টাতে না পারলে অবস্থা পরিবর্তন হবে না। নারীরা এখন যোগ্যতা দক্ষতার গুণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে। এই দেশের নারীদের পিছিয়ে থাকার কোনো সুযোগ নেই। ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, পরিবর্তন শুধু দৃষ্টিভঙ্গিতে নয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন। পারিবারিক শিক্ষার ওপর মানুষের আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে। তাই পরিবার থেকে মেয়েকে আত্মপ্রত্যয়ী হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। নারীকে এগিয়ে নিতে শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। মোহাম্মদ আলী শিকদার বলেন, জেন্ডারভিত্তিক বিবেচনা না করে মানুষ হিসেবে, রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে নারী-পুরুষকে ভাবতে হবে। নাগরিকের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এসব কিছুর বিধান করবে রাষ্ট্র। তাই কোনো বৈষম্য নয় নারীকে তার অধিকার বুঝে নিতে হবে এবং সমাজকে সেই জায়গা বুঝিয়ে দিতে হবে। রুবানা হক বলেন, নারীর নিজেকে ক্ষমতায়িত হতে হবে। একজন নারী সহকর্মীকে দেখে আরেক নারী ঈর্ষায় জ্বলে ঝরে পড়তে পারে। নারীকে নারীর পাশে দাঁড়াতে হবে। আমরা জেন্ডারভিত্তিক কার্ড খেলতে চাই না। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নারীর সংগ্রামী ইতিহাস। সালমা আলী বলেন, শ্রেণিকক্ষ থেকে গৃহ প্রতিটি জায়গায় মেয়েরা বৈষম্যের শিকার হয়। প্রতিটি ক্ষেত্রে হেনস্তার শিকার নারী। দেশে কার্যকরী অনেক আইন আছে কিন্তু আইনের প্রয়োগে সমস্যা আছে। এলিনা খান বলেন, নারীর নিরাপত্তায় জোর দিতে হবে। কর্মজীবী নারী রাস্তায় বেরিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। নরমভাবে কথা বললে মানুষ দুর্বলতা ভাবে। এসব দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানো জরুরি। ড. জিনাত হুদা বলেন, নারীর অবস্থার পরিবর্তনে মনস্তাত্ত্বিক ঝড় প্রয়োজন। সম্পত্তিতে নারীর উত্তরাধিকার এবং শিক্ষার ব্যাপারে জোর দিতে হবে। নারী-পুরুষ উভয়ের সামাজিকীকরণে সচেতন হতে হবে। ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, মেয়েদের চাকরির বাজারে সমঅধিকার এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মবণ্টন করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে সবাইকে সমান সুযোগ দিতে হবে। তুরিন আফরোজ বলেন, নারীর বিরুদ্ধে নারীই আগে দাঁড়ায়। এটাই পুরুষতন্ত্র। নারী পুরুষ পরষ্পরের প্রতিবন্ধী নয় পরিপূরক। রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, শিক্ষা হচ্ছে নারীর এগিয়ে যাওয়ার অস্ত্র। এজন্য প্রথম আঘাত আসে নারীর শিক্ষার ওপর। নারীকে সম্পত্তির সমান অধিকার দিতে হবে, শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, মৌলবাদ ও ধর্মান্ধ শক্তিকে প্রতিহত করতে হবে, পরিবার ও বিদ্যালয়কে জেন্ডার সংবেদনশীল করতে হবে। কর্মজীবী নারীর হোস্টেলের সংখ্যা বৃদ্ধি, গণপরিবহন নারীবান্ধব করতে হবে, কর্মস্থলে নারীর প্রতি যৌন হয়রানি এবং মজুরি বৈষম্য বন্ধ করতে হবে। নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, নারী অধিকারে মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। রাজনীতির মাঠে একটা মেয়ে দিনভর রোদ বৃষ্টিতে পুড়ে কাজ করে। কিন্তু মনোনয়নের সময় নারী হিসেবে বিবেচনা করার মানসিকতা পাল্টাতে হবে। নূরজাহান বেগম মুক্তা বলেন, পুরুষকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় বাঘের সঙ্গে আর নারীকে হরিণের সঙ্গে। এসব অসম তুলনা বন্ধ করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্য বন্ধ করতে হবে। বন্যা মির্জা বলেন, শ্রমিকের বৈষম্য ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আজকের নারী দিবস। কিন্তু এখনো সে সমস্যার নিষ্পত্তি হয়নি। নারীকে পণ্য হিসেবে দেখার চিত্র বদলাতে হবে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। অনিমা রায় বলেন, পরিবারে সন্তানকে আত্মবিশ্বাসী এবং পরমতসহিঞ্চু করে গড়ে তুলতে হবে। আমার ছেলে যেন কোনো নারীকে হেয় না করে সেই শিক্ষা আমাকেই দিতে হবে। লাকী আক্তার বলেন, কর্মক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা বাড়ছে কিন্তু শুধু সংখ্যা বাড়লে অবস্থার বদল হয় না। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে আইনের কার্যকর প্রয়োগ হচ্ছে না। রাষ্ট্র করতে পারছে না।